আপডেট : ২৪ মার্চ, ২০১৬ ১৫:১৭

''জালালের গল্প''

মুভি রিভিও
''জালালের গল্প''

খুবই চমৎকার একটা প্লট ধরে এগিয়ে গেছে ‘জালালের গল্প’। সিনেমাটিতে উঠে এসেছে বহু পুরাতন রীতি-নীতি, হিংসা, রাজনীতি, অন্যায়, ব্যাভিচার, ক্ষমতা আর কুসংস্কারের গল্প। জালাল নামের নদীতে ভেসে আসা এক ছেলে ও তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার গল্প। সিনেমায় জালালের তিনটা বয়সের অবস্থাকে ফ্রেমবন্দি করা হয়েছে নবজাতক, ৮/বছর আর ১৮/২০ বছরের জালাল। তিন সময়ের তিনটা আলাদা গল্প জালালকে ঘিরে গড়ে উঠেছে।

তিনটা সময়ের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রথম গল্পটা বেশি ভাল লেগেছে। এটার উপস্থাপনও ছিল চমৎকার। মজার ব্যাপার হচ্ছে পরের দুইটা গল্পের মত এটাতে তেমন কোন স্টারকাস্ট ছিল না, যারাই ছিলেন তারা পর্দায় পুরোটা সময় মাতিয়ে রেখেছেন। জালালের প্রথম পালক বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছে নূরে আলম নয়ন। অসাধারন পারফর্ম করেছেন, একবারের জন্যও মনে হয়নি তিনি অভিনয় করেছেন। উনার স্ত্রীর চরিত্রে ছিলেন মিতালি দাশ। উনার তিনিও চমৎকার অভিনয় করেছেন। এই ভদ্রমহিলাকে অভিনয়ে প্রথম দেখলাম, গ্রামের সাধারন গৃহবধুর চরিত্রে দারুণ মানিয়ে গেছেন আর নিজের সাবলীল অভিনয় দিয়ে আরো ভাল লাগা তৈরি করেছেন। মূলত এই গল্পে গ্রামীন কুসংস্কারগুলো সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন ডিরেক্টর আবু শাহেদ ইমন।

কুকুর, হাঁস, কবুতর, মুরগি, বিড়ালের মত প্রানী ছাড়াও পুরো প্রকৃতিকে সিনেমায় যেভাবে প্রতিকী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা ছিল সত্যিই চমৎকার। এই গল্পে জালালের দ্বিতীয় পালক বাবা মায়ের চরিত্রে ছিলেন তৌকির আহমেদ আর শর্মীমালা। সন্তান জন্ম দিতে না পেরে আগের দুই স্ত্রী মারা গেছে। এদিকে নিজের কোন সন্তান না হওয়াতে তৃতীয়বারের মত তৌকির আহমেদ বিয়ে করেন শর্মীমালাকে। শুরু হয় সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য নানা পদ্ধতি, ঝাড়ফুঁক আর কবিরাজের নোংরামি। গল্পে শর্মীমালা যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। ‘মৃত্বিকা মায়া’র জন্য কিছুদিন আগেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন শর্মীমালা। সারপ্রাইজ হিসেবে পর্দায় ছিলেন ফজলুল হক, তারেক মাসুদের। নয় বছরের জালাল চরিত্রে শিশুশিল্পী ইমনও অনেক ভাল করেছে। তাকে হাত পা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে দেয়ার সময় তার আহাজারি আর আর্তনাদে দর্শকেরও দম বন্ধ হয়ে আসে।

১৮/২০ বছরের জালাল চরিত্রে আরাফাত রহমান বেশ ভাল করেছে, মজার ব্যাপার হচ্ছে ওর সাথে নয় বছরের জালাল চরিত্রের ইমনের চেহারাতেও অনেক মিল। এই অংশের বড় আকর্ষন ছিল মোশারফ করিম, পরিচালক সিনেমায় তাঁকে খুব বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করেছেন। মোশারফ করিম এই সিনেমার মার্কেটিং এর জন্য অনেক বড় একটা দিক, সাধারন অনেক দর্শকই এই একটা কারণেই সিনেমাটি দেখতে চাইবে। তবে মোশারফ করিম ভাল করেছেন, যারা মোশারফ করিমের কাজ কম দেখেছেন তাদের কাছে খুব ভাল লাগবে। আর যারা নিয়মিত দেখেন তাদের কেউ বিরক্ত হতে পারেন কারণ একই ধরনের অভিনয় তার কাছ থেকে আমরা প্রায়াই দেখি থাকি। তবে জালালের

গল্পের এই চরিত্রে মোশারফ করিম সত্যিই অনেক ভাল পারফর্ম করেছেন, সমস্যাটা মনে হয়েছে শুধু একঘেঁয়েমিটাতেই। মোশারফ করিম ছাড়াও এই অংশে ছিলেন মৌসুমি হামিদ। এই প্রথম কোন সিনেমায় মৌসুমি হামিদকে ভাল লাগলো। প্রায় এক মাসের মধ্যে তার তিনটি সিনেমা রিলিজ পেয়েছে কিন্তু এটা ছাড়া কোনোটাতেই ডিরেক্টররা মৌসুমিকে ভালভাবে ব্যবহার করতে পারেনি। জালালের গল্পে নিজের সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে মৌসুমি নিজের সেরা টুকু দিতে চেষ্টা করেছেন।

সব কিছু মিলিয়ে জালালের গল্প একটা দারুণ সিনেমা। এই সিনেমায় কোন গান ব্যবহার করা হয়নি, কিন্তু পুরো সিনেমায় চিরকুট ব্যান্ডের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ছিল অসাধারন। সেতারা, বাঁশি সহ দেশিও বাদ্যযন্ত্রে এমন দূর্দান্ত ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর খুব কম সিনেমাতেই পেয়েছি।

সাউন্ড ডিজাইনার হিসেবে ছিলেন রিপন নাথ। জালালের গল্পের সিনেমাটোগ্রাফি ছিল অসাধারণ! এই সিনেমার পজেটিব দিকগুলোর কথা বলতে গেলে বলতে হয়, সিনেমাটির মিউজিক আর বরকত হোসেন সিনেমাটোগ্রাফি। সিনেমার কালার গ্রেডিং সাধারণ মানের হলেও চিত্রনাট্য, আর্ট ডিরেকশন, লোকেশন আর সেট ডেকোরেশন ছিল দারুন। এই সিনেমার সব কিছুই এত চমৎকারভাবে প্রেজেন্ট করার জন্য এর মূল কৃতিত্ব হচ্ছে সিনেমার পরিচালক আবু শাহেদ ইমনের। দক্ষতার সাথে খুব যত্ন করে বানিয়েছেন তার প্রথম সিনেমাটি। নিঃসন্দেহে বলা যায় গত বছরের সেরা চলচ্চিত্র জালালের গল্প।

উপরে