আপডেট : ১২ মার্চ, ২০১৬ ১৪:২৩

‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’, স্থির নয়, জীবন্ত

হাসানুল হাসিব-আল-গালিব
‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’, স্থির নয়, জীবন্ত

হোসেনের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’। ছবিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্ত করবী’ নাটকের উপর ভিত্তি করে নির্মিত বললে ভুল বলা হবে তবে ‘রক্ত করবী’ নাটককে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটককে ভিত্তি করে অথবা কেন্দ্র করে বাংলা চলচ্চিত্র নির্মাণ একেবারে নতুন নয়। আমার জানা মতে এর আগে ঋতুপর্ন ঘোষের ‘চিত্রাঙ্গদা’, কৌশিক মুখার্জির ‘তাসের দেশ’ নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশে রুবাইয়াত হোসেন তৈরি করলেন ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’।

আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ চলচ্চিত্রের কাহিনী সংক্ষেপ অনেকটা এরকমঃ
রয়া একজন থিয়েটার কর্মী। বয়স ৩৩। বিবাহিত। স্বামী ভালো উপার্জন করে। উচ্চ মধ্যবিত্তের সংসার। রয়া আজ প্রায় ১২ বছর ধরে থিয়েটারে ‘রক্ত করবী’ নাটকে ‘নন্দিনী’ চরিত্রে অভিনয় করছে। কিন্তু এতদিন ধরে নন্দিনী চরিত্রটি করলেও রয়া নিজেই নন্দিনী সম্পর্কে সন্দিহান। নন্দিনী কে? যক্ষপুরিতে তার আগমনের উদ্দেশ্য কি? রূপকের আড়ালে ‘রক্ত করবী’ নাটকের আসল বক্তব্য কি? রয়া এসব ভাবনার কথা দল নির্দেশক রাসেল ভাইকে জানায়। রাসেল ভাই একজন অর্থোডক্স রবীন্দ্র নাট্য নির্দেশক। তিনি বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী রয়ার প্রশ্নের উত্তর দেন। কিন্তু সে উত্তর সন্তুষ্ট করতে পারে না রয়াকে। এদিকে ‘নন্দিনী’ চরিত্রের জন্য রয়ার বয়স বেড়ে যাওয়ায় কমবয়সী মেহজাবিন কে নন্দিনী চরিত্রের জন্য রয়ার স্থলাভিষিক্ত করেছেন রাসেল ভাই। এমন সময় রয়াদের থিয়েটার দলটির কাছে একটি সুযোগ আসে তাদের কাজকে ইউরোপীয় আঙিনায় উপস্থাপনের। ইমতিয়াজ একজন কিউরেটর। তার কাজ দেশীয় থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা। অন্যভাবে বললে প্রাচ্যকে পাশ্চাত্যের কাছে তুলে ধরতে তিনি একজন অনুঘটকের কাজ করেন। ইমতিয়াজের সাথে যোগাযোগ করে রয়াদের দলটি। ইমতিয়াজ যখন কথাবলার জন্য রয়াদের কাছে আসে তখন রাসেল ভাইয়ের সামনেই রয়া ‘রক্ত করবী’ নাটক কে নিয়ে তার নিজস্ব ভাবনার কথা জানায় ইমতিয়াজকে, বলে রক্ত করবীকে নতুনভাবে নির্মাণের কথা। রাসেল ভাই একমত না হলেও ইমতিয়াজ সাদরে গ্রহণ করে রয়ার আইডিয়াকে।

এবার আসা যাক রয়ার ব্যক্তিগত জীবনে। রয়ার স্বামী সামির ইদানীং রয়াকে ঘন ঘন তাগাদা দিচ্ছে সন্তান নেয়ার জন্য। কিন্তু রয়া এখনও প্রস্তুত নয়। থিয়েটারকে সে অগ্রাধিকার দেয় এ ব্যাপারে।

রয়ার মা একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ধার্মিক মহিলা। রয়ার থিয়েটারে অভিনয় করা তিনি একদমই পছন্দ করেন না। তিনিও রয়াকে চাপ দেন সন্তান নেয়ার জন্য, প্রথাগত অর্থে সংসারি হতে বলেন রয়াকে।

রয়ার বান্ধবী সাবাহ একুশ শতকের ঢাকা শহরের আধুনিক উচ্চশিক্ষিত কর্মজীবী নারীর প্রতিনিধি। স্বামী-সংসার-পড়াশোনা-কাজ সবকিছু সামলে নিয়েছে সে। কিভাবে সামলিয়েছে? পারিবারিক জীবন কে অগ্রাধিকার দিয়ে। এখানেই রয়ার সাথে তার পার্থক্য।

‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ চলচ্চিত্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ন চরিত্র ময়না, রয়ার বাসার গৃহকর্মী। সে ভালবেসে বিয়ে করে লিফটম্যান সবুজকে। তারপর তারা বস্তিতে গিয়ে ওঠে। ময়না কাজ নেয় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে। বস্তিতে গিয়ে ময়নার সাথে দেখা করার সময় বস্তির পরিবেশে অন্তঃসত্ত্বা ময়নার কষ্ট দেখে রাগের মাথায় ময়নাকে বাসা থেকে বের করে দেবার কথা ভুলে আবার তার কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানায় রয়া। কিন্তু ময়না তা চায় না। সে চায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করেই স্বাবলম্বী হতে, নিজের পায়ে দাড়াতে।

ময়নার সাথে কথা বলার পর ‘রক্ত করবী’র ‘নন্দিনী’ কে যেন নতুন করে আবিষ্কার করে রয়া। সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকা শহরের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির প্রেক্ষাপটে ‘রক্ত করবী’ নাটক নতুন করে নির্মাণের, যেখানে নন্দিনীর চরিত্রে সে নিজেই অভিনয় করবে এক অন্তঃসত্ত্বা গার্মেন্টস কর্মীরুপে; গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি হবে যক্ষপুরি আর গার্মেন্টস কর্মীরা হবে যক্ষপুরির শ্রমিক।

অনেকখানি কাহিনী বলে ফেলেছি। এর পরের কাহিনী আর বলতে চাইছি না। আগ্রহী দর্শকেরা হলে গিয়ে দেখবেন।

রুবাইয়াত হোসেনের ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ কয়েকটি বিষয়ে ভাবনাকে উস্কে দেয়। এগুলি নিয়ে অল্প কয়েকটি কথা না বললেই নয়ঃ

১. শিক্ষিত, স্বাধীন, স্বাবলম্বী নারী কেমন হবে? সে কি হবে রয়ার মত, যে পারিবারিক জীবনের চেয়ে কর্মজীবনকেই বেশি প্রাধান্য দিবে? নাকি সে হবে রয়ার বান্ধবী সাবাহ এর মত যে অগ্রাধিকার দেবে পারিবারিক জীবনকে? একুশ শতকের এই বাংলাদেশে স্বল্পশিক্ষিত, নিম্নবিত্ত নারী যদি স্বাবলম্বী হতে চায় তবে তাকে কি হতে হবে ময়নার মত গার্মেন্টস কর্মী? পুরুষকে যদি পেশাজীবন কে অগ্রাধিকার দিতে দেখা যায় তবে তাকে বলা হয় ক্যারিয়ার ওরিয়েন্টেড অথচ রয়ার মত কোন নারী যদি কর্মজীবন কে পারিবারিক জীবনের উপরে রাখতে চায় তবে তাকে কেন বলা হয় সেলফিশ?

২. রয়ার রুমে টিভিতে খবরে শোনা যায় পুলিশের উপর শিবির কর্মীদের হামলার সংবাদ। আরেকদিন টিভিতে রয়া দেখে সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসে পড়ার সংবাদ। এভাবে পরিচালক রুবাইয়াত এমন এক সমাজ, এমন এক ঢাকা শহরের কথা বলেন, যে সমাজের রাজনীতি অর্থনীতি এখনও আন্ডার কনস্ট্রাকশনে অর্থাৎ নির্মাণাধীন রয়েছে। আসলেই তো তাই, বর্তমান সময়ের আস্তিক-নাস্তিক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ-বিপক্ষ, ধর্ম নিরপেক্ষতা বনাম ইসলামপন্থা—এসব বাইনারি বিভাজন আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দেয় ভাংচুর, গড়াপেটা আর ট্রায়াল এন্ড এরর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠতে থাকা এক নির্মাণাধীন সমাজকে, যার কনস্ট্রাকশন শেষ হতে এখনও ঢের বাকি। আমরা জানি, রানা প্লাজা ভবন ধ্বংসের পর Accord, Alliance এর দৌড়-ঝাপ, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ, সরকারের আশ্বাসবাণী, রানা প্লাজাকে একটি কেস স্টাডি হিসেবে গ্রহণ করে এর থেকে বিভিন্ন শিক্ষা নেয়ার প্রয়াস—এ সব কিছুই যেন আমাদের অর্থনীতি কে একবাক্যে ব্যাখা করে। আর তা হলঃ আমাদের অর্থনীতি এখনও আন্ডার কনস্ট্রাকশন।

৩. রবীন্দ্রনাথের ‘রক্ত করবী’ নাটকে এমন এক যক্ষপুরীর কথা বলা হয়েছে যার মাটির নিচ থেকে খুঁড়ে খুঁড়ে তাল তাল সোনা বের করে আনে শ্রমিকেরা। যতদূর জানি, পশ্চিমা যন্ত্রসভ্যতা কে মাথায় রেখেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন রূপক আশ্রয়ী নাটক ‘রক্ত করবী’। এই একুশ শতকের পুঁজিবাদী আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প যখন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার, তখন এখানকার সস্তা শ্রমকে শোষণ করে গড়ে ওঠা ছোট-বড় অসংখ্য গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো একেকটা যক্ষপুরী ছাড়া আর কীইবা হতে পারে? তাই রয়া যখন ‘রক্ত করবী’র সেট হিসেবে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির পরিবেশ কে চিন্তা করে তখন রূপক আশ্রয়ী নাটক হিসেবে রক্ত করবী অন্য এক মাত্রা লাভ করে। পরিচালক রুবাইয়াত এখানে যক্ষপুরীর সাথে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির তুলনা করে অনন্য এক মেটাফোর সৃষ্টি করেছেন।

সবশেষে প্রশ্ন হতে পারে ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ কি একটি নারীবাদী চলচ্চিত্র? এর উত্তর আমি জানি না। তবে এটি হয়ত নারীর চোখে দেখা নারীর জীবন নিয়ে একটি চলচ্চিত্র। সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে রুবাইয়াত বলেছেন, “I make films on women and I want to be defined as a feminist filmmaker. …I want to create gender sensitivity through my films.”

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম

উপরে