আপডেট : ২ মার্চ, ২০১৬ ১৮:৪২

দ্য রেভেন্যান্ট

বিনোদন ডেস্ক
দ্য রেভেন্যান্ট

ছবিটা দেখতে বসলে কিন্তু বেশ কষ্ট হবে। মানে কষ্ট ব্যাপারটাকে যত রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তৈরি করা যায়, তার কোনওটাই বাদ রাখেননি পরিচালক আলিহান্দ্রো গনসালেস ইনিয়ারিতু! তাই ছবিটা দেখতে বসে কষ্ট তো হবেই। এবং দেখতে দেখতে দর্শক বুঝেও যাবেন, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও কতখানি ‘কষ্ট’ স্বীকার করেন একেকটা চরিত্রকে ফোটাতে। কষ্টটা অবশ্য এর আগে ‘দ্য উল্‌ফ অফ ওয়াল স্ট্রিটে’ও কম করেননি ভদ্রলোক। কিন্তু সেটা যে তিনি কোনও সম্মান, মনোনয়ন বা পুরস্কার জেতার জন্য করেন, তা ভাবার কারণ নেই। ‘দ্য রেভেন্যান্ট’এর জন্য অস্কার জিতে তিনি পুরস্কারটাকে যেভাবে পায়ের নীচে নামিয়ে রাখলেন, তাতে বোঝাই যায়— তাঁর কষ্ট করাটা অস্কার-কেন্দ্রিক নয়। পুরোটার কেন্দ্রে রয়েছে নিখুঁত অধ্যবসায় এবং দাপুটে অভিনয়ই। মাইকেল পুনকে’র ২০০২ সালে লেখা উপন্যাস ‘দ্য রেভেন্যান্ট: আ নভেল অফ রিভেঞ্জ’কে পরদায় কোন মাত্রায় নিয়ে যাওয়া যায় দেখিয়ে দিয়েছেন লিও। এবং অবশ্যই এই মুহূর্তের সেরা পরিচালক— ইনিয়ারিতু।

লিও কী চান না-চান, সেটা ছেড়ে দিন। অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের ভোটাররা বোধহয় অভিনেতাদের এই কষ্টটাই দেখতে চান! এবং ইনিয়ারিতুর উপর আপামর দর্শকের মতোই তাঁদের অঢেল ভরসা। ফলে যা হওয়ার তাই হল! লিও-ইনিয়ারিতু জুটিই সেরার মান্যতা পেল। ১৮২০’র দশকের দুঁদে শিকারি হিউ গ্লাসের ভূমিকাটা স্রেফ ভূমিকা রইল না লিও’র কেরিয়ারে। অভিনয়ের লক্ষ্যপূরণের নতুন মাত্রা তৈরি করে দিল সেই পরদা-রোল। সেটা (সিজিআই) ভাল্লুকের সঙ্গে রক্তারক্তি লড়াই বা মৃত জন্তুর শরীর থেকে মাংস-রক্ত বার করে তার লোমদেহে ঢুকে ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচা কিংবা বাইসনের কাঁচা লিভার খাওয়ার (সত্যি নয়) মধ্যেই সীমিত নয় কিন্তু। পরদায় লিও’র আপাদমস্তক লড়াইটা ছিল বেঁচে থাকার যুদ্ধ। মরতে মরতেও বেঁচে ফেরার জন্য যুদ্ধ। আক্ষরিক অর্থেই ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ হয়ে ওঠা। সেটা হতে গেলে যতটা মাথার মধ্যে ঝিমঝিম শব্দ তোলা অভিনয় করতে হয়, করেছেন লিও। অভিব্যক্তিতে, অনভিব্যক্তিতে, সংগ্রামে, আত্মসমর্পণে, হাঁসফাঁসে, নিশ্চিন্তিতে— তিনি হিউ গ্লাসের চরম অমানবিক বেঁচে ফেরার গল্পটাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের চরিত্রে।

ইনিয়ারিতু’র ছবিতে মৃত্যু নিজেই একটা চরিত্র। এই ছবির গোড়া থেকে সেই মাত্রাটা টানটান রেখেছেন পরিচালক। সেটা রেড ইন্ডিয়ানদের বর্শার আঘাতে আমেরিকান চোরাশিকারিদের বেঘোরে প্রাণ দেওয়া হোক বা চোরাশিকারিদের লোভের বশবর্তী হয়ে একে অপরের ভবলীলা সাঙ্গ করার মত্ততা— খুনের রাজনীতি যে মানুষের আদিতম ইতিহাস— এটা সম্ভবত ‘ফ্যাসিনেট’ করে পরিচালককে। সেটা তাঁর মাল্টিপ্‌ল ন্যারেটিভ ট্রিলজি ‘আমোরেস পেরোস’, ‘টোয়েন্টি ওয়ান গ্রাম্‌স’, ‘ব্যাবেল’এও যেমন দেখা যায়, প্রথম অস্কার জেতা ছবি ‘বার্ডম্যান’এও তেমনই। তাই তাঁর ‘দ্য রেভেন্যান্ট’ শুধু নিজে মৃত্যুর মুখে পড়ে না। মৃত্যুর নেতিবাচক ‘এনার্জি’ বাকি চরিত্রদেরও শেষ করে দেয় বইকী! সব মিলিয়ে মৃত্যু-প্রকৃতি-মানুষের সবচেয়ে কর্কশ, নৃশংস, ঋণাত্মক বিষয়গুলোকে পুঁজি করেছিলেন ইনিয়ারিতু। এবং অসম সাহসের সঙ্গে ছবির শেষে ‘ক্ষমা’র সংজ্ঞাও তৈরি করতে পেরেছেন— এত ‘নেগেটিভিটি’র সংক্রমণ থাকা সত্ত্বেও। একজন পরিচালকের তাঁর ক্রাফ্টের উপর কতখানি ভরসা থাকলে এটা করা যায়!

গল্পটার ঠিক সময় নির্ধারণ করতে গেলে, সেটা ১৮২৩-ই দাঁড়ায়। উত্তর আমেরিকার ডাকোটা তখন গভীর-বীভৎস অরণ্য। সেখানেই ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রু হেনরির নেতৃত্বে চোরাশিকারীর দল গিয়ে পৌঁছয় নিজেদের মতলব বুঝে নিতে। তাদের ‘গাইড’— হিউ গ্লাস। নেটিভ আমেরিকানদের ঘন ঘন আক্রমণ, অরণ্যের হিংস্র পশু, প্রবল শৈত্যের মধ্যে সে এক মরণ-বাঁচন লড়াই বটে! যে কোনও অ্যাডভেঞ্চার ক্লাসিক’কে হার মানাবে! জুল ভার্ন বা এইচ জি ওয়েল্‌স। তার উপর সব সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। এখানে কল্পনা যেটুকু যা, তার অস্তিত্ব ইনিয়ারিতুর ‘ফিল্মিক’ মনে। তাঁর সিনেমা-মননে। যাই হোক, রেড ইন্ডিয়ানদের কব্জা থেকে পালানোর পর পরই ভালুকের সঙ্গে সেই ‘মর্বিড’ লড়াইয়ে পড়ে যায় হিউ। প্রায় মরতেই বসেছিল সে। আর সেই সুযোগে চোরাশিকারীদের দলেরই একজন, জন ফিৎজেরাল্ড অন্যদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মরণাপন্ন হিউকে ফেলে পালায়। হিউয়ের ছেলেকে মেরে ফেলে সে। হিউয়ের ট্র্যাজেডি’টা এভাবে অক্ষরে অক্ষরে বোনা হয়েছে ছবিতে। দেখানো হয়েছে, কীভাবে তারও আগে ‘আমেরিকান কংকারার’রা তার স্ত্রীকে মেরে ফেলেছিল। ইনিয়ারিতু সম্ভবত এই জায়গাটা দাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন দর্শকের মনে, যে মৃত্যুর মুখ থেকে যে ফিরে আসে তার ছোঁয়াচেও মৃত্যুই! 

কিন্তু এই রিভিউ’র গল্পটুকু তো আর গোটা ছবিটাকে ধরে ফেলতে পারবে না! এই সত্যি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ম্যাজিক বুনেছেন ইনিয়ারিতু। মৃত মেয়ের বুকের কাছ থেকে নরম পাখির উড়ে যাওয়া কিংবা হিউ গ্রাসের স্বপ্ন দৃশ্যগুলো সাররিয়াল। ছবিটা আসার পর পর অনেকে বলছিলেন, টারকোভস্কির বিভিন্ন ছবির ইমেজারি ব্যবহার করেছেন ইনিয়ারিতু। কিন্তু তাঁর সিনেম্যাটোগ্রাফার ইমানুয়েল লুবেস্কির টেকনিক্যাল জাদুগরি’র কথা তাঁরা বলতে পারবেন না কিন্তু। একই শব্দ ব্যবহার করে যেমন কবিতা লিখতেন রবীন্দ্রনাথ এবং জীবনানন্দ— এবং প্রসাদগুণে দুইয়ের তাৎপর্যই ভিন্ন, সে রকমই ‘ইমেজারি’কে শুধু তার নামের মতো ব্যবহার করলে এই ছবির ক্ষেত্রে সেটা সুবিচার হয় না! ছবির জন্য ইমানুয়েলের তৃতীয় অস্কার, সেটাই প্রমাণ করে।
তবে অস্কারই এ ছবির একমাত্র সার্থকতা নয়। দর্শককে ছবির প্রতিটা পরতে ফিল্মটা তৈরি করার ‘কষ্ট’টাকে বোঝাতে পারাটা এখানে সার্থক। আর সে জন্যই ধন্যবাদ ইনিয়ারিতু-লিও-লুবেস্কির যোগসূত্রকে। 

 

উপরে