আপডেট : ২৩ মার্চ, ২০১৬ ১৮:০১

ঘরে ফিরতে চায় সিরিয়ান শিশুরা

বিডিটাইমস ডেস্ক
ঘরে ফিরতে চায় সিরিয়ান শিশুরা

একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশ। যেখানে আকাশ থেকে শেষ কবে বৃষ্টি হয়েছে জানিনা। তবে একের পর এক তীব্র বোমা বর্ষণ হয় সেখানে প্রতিনিয়ত। অনেকটা বৃষ্টির মতই। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে তাদের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। সেখানে শারীরিক ও মানসিক ক্ষত নিয়ে শিশুদের একটি নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি হয়েছে। এই মানসিক পীড়া সত্ত্বেও আলোর ঝলকানি সত্যিই পাওয়া যায় কিছু কিশোরের চোখে এখনও, যারা সক্ষম তাদের চারপাশের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে।

ইব্রাহীম। যাকে দেখেই মনে হয় সে একজন ভবিষৎ চলচিত্র তারকা। তারকার মতই জ্বলছিল ১২ বছর বয়েসী ইব্রাহীমের চোখ। সুন্দর কারুময় মুখ, একটি বিজয়ী হাসি এবং একটি যাদুময় ব্যাগ নিয়ে সে থাকছে জর্ডানের রাজধানী আম্মানের এক শহরতলীতে গড়া সৃষ্টিছাড়া এক ভবনে। যেখানে পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসাবেই আহত সিরিয়ানবাসীরা বসবাস করেন। ইব্রাহীম ভবনের বাইরে খেলার জন্য রিহার্সাল করছিল। একজন ব্রিটিশ সাংবাদিককে দেখে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই সে এগিয়ে এলো। যেন যে ক্রাচের ওপর ভর করে সে অনায়েসে হাঁটছে, সে তার বন্ধু। ইব্রাহীম হাত বাড়িয়ে দিলো সাংবাদিকের দিকে আর চোখে মুখে সেই আলোর ঝলকানি। ইব্রাহীম ব্রিটিশ সাংবাদিককে বলে, ‘আপনি বেশ সাহসী, আপনি এক পা কাঁটা একজন মানুষের সাথে দেখা করতে এসেছেন।’

সেই ভুবনভুলানো হাসি আবার বেজে উঠলো। ইব্রাহীম একটি বিমান হামলায় তার মা, দুই বোন, তিন ভাই, তার চাচা, চাচাতো ভাই এবং তার একটি পা হারায়। সে এমন একটি অকাল্পনিক উপায়ে তার মৃত আত্মীয়দের তালিকাবদ্ধ করে সাংবাদিককে বলতে থাকে, যেন যেকোন পরিবারের অর্ধেক সদস্যদের এভাবে হারিয়ে যাওয়া খুবই সাধারন ঘটনা। একদম স্বাভাবিক। ইব্রাহীম আর কিছুদিনের মধ্যেই কানাডা চলে যাচ্ছে তার পিতার সাথে। এ অবস্থায় ইব্রাহীমকে জিজ্ঞেস করা হল কি তোমার ভবিষৎ পরিকল্পনা? কি দারুন! তুমি কানাডা যাচ্ছো! তোমার এখন আর ভয় নেই। কেমন লাগছে বলো তো? ব্রিটিশ সাংবাদিককে অবাক করে দিয়ে ইব্রাহীম খুব দ্রুতই বলল, ‘একেবারেই না, ওটা খুব বেশী দূরে, দূরে.. অনেক দূরে..।’

ইব্রাহিম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার নিজ দেশ সিরিয়ায় ফিরে যেতে চায়। ইব্রাহীম হতে চায় একজন যুদ্ধ সাংবাদিক। ইব্রাহীম সাংবাদিককে চমকে দিয়ে আরো বললো, ‘বাইরের জগতের কেউই ওখানে (সিরিয়া) কি চলছে তার অর্ধেকও জানেন না।’

সিরিয়ার হাজার হাজার পরিবার আশ্রয়ের খোঁজে ইউরোপের দিকে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য, অকল্পনীয় বিভীষিকা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা, বেঁচে থাকার চেষ্টা। কিন্তু এই ব্রিটিশ সাংবাদিক বলছেন, ‘যে শিশুদের আমি জর্ডানে এবং লেবাননে দেখেছি, কথা বলেছি, তারা প্রায় সকলেই সর্বসম্মতিক্রমে শুধু বাড়ি যেতে চায়।’

রৌয়া, পাঁচ বছর বয়সী একজন পলকা শিশু। বলছে, ‘সে যদি আগামীকালকেই পারে ফিরে যেতে তার বাড়ি, তাহলে তার ঘরের একটি ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা পুতুলটি সে খুঁজে বের করে নিয়ে আসবে।’

২০১৩ সালে তার বাড়ির কাছাকাছি হওয়া রাসায়নিক হামলার পর তাদেরকেও পালিয়ে আসতে হয় নিজ দেশ সিরিয়া ছেড়ে।

রৌয়াসহ তার চার বছর বয়সী ছোট ভাই এবং তার বাবা-মা, এখন মাউন্ট লেবাননের একটি বর্ণহীন, এক ছোট্ট তাঁবুর মধ্যে জীর্ণ শিবিরে বাস করছে।

জর্ডানে আর একজন অল্প বয়স্ক ছেলে যে তার দুটো পা, এক চোখ এবং একটা হাত হারিয়েছে একটি স্থলমাইন বিস্ফোরণে। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল, ‘কি পরিবর্তন করতে চাও যদি তুমি পারো, এই গত পাঁচ বছর সম্পর্কে? সে শুধু বলল, ‘আমি কেবলই সামনে দেখতে চা্‌ই, পেছনে আর না।’

পৃথিবী্র হিংস্র এই হানাহানিতে যে চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে মানুষের জীবনে তাতে আর যাই হোক শিশুরা, আর বিপর্যস্ত মানসিকতা নিয়ে গড়ে ওঠা তরুনরা কাউকে অভিশাপ দিচ্ছেনা। ওরা নিষ্পাপ। ওরা শুধু নিজ দেশ সিরিয়ায় ফিরে যেতে চায়।

বিবিসি থেকে অনুবাদ করেছেন জাহিদ মিল্টন

বিডিটােইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে