আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১৪:২৭

শীর্ষ ধনীরা কেন পত্রিকার মালিক হচ্ছেন?

অনলাইন ডেস্ক
শীর্ষ ধনীরা কেন পত্রিকার মালিক হচ্ছেন?

বেশ কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা নামকরা সংবাদপত্র বা সাময়িকী কিনে নেওয়ার দিকে ঝুঁকছেন। এক্ষেত্রে সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছেন মার্কিন ধনকুবের মার্ক বেনিওফ এবং তার স্ত্রী লিন বেনিওফ। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কিনে নিয়েছেন এই দম্পতি।

মার্ক বেনিওফ বিজনেস সফ্টওয়্যার কোম্পানি সেলসফোর্স ডট কমের মালিক। টাইম ম্যাগাজিন কিনতে তাঁর ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি মার্কিন ডলার। 

এর আগে ২০১৩ সালে আমাজনের মালিক জেফ বেজোস মার্কিন প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট কিনে নিয়েছিলেন। সেসময় তাঁর ব্যয় হয়েছিলো ২৫ কোটি ডলার। ওই বছরেই আরেক মার্কিন ধনকুবের জন হেনরি বোস্টন গ্লোব পত্রিকাটি কিনে নেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ধনকুবেরদের পত্রিকার মালিক হওয়ার আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত স্টিভ জবসের স্ত্রী লরেন পাওয়েল আটলান্টিক ম্যাগাজিনের অধিকাংশ শেয়ার কিনে নিয়েছেন। বায়োটেক বিলিওনিয়ার প্যাট্রিক সুন শিয়ং কিনেছেন লস এঞ্জেলেস টাইমসসহ যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট কোস্টের আরও কয়েকটি নামকরা পত্রিকা।

বিশ্লেষকরা বলেন, বিশ্বজুড়েই বড় বড় সংবাদপত্রগুলোর দুর্দিন চলছে। সংবাদপত্রের সার্কুলেশন কমছে। অনলাইনে বিজ্ঞাপনের জন্য তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হচ্ছে তারা। এমন অবস্থায় ধনকুবেররা যখন বিশাল অংকের টাকা নিয়ে এগিয়ে আসছে, তখন তাতে সাড়া না দিয়ে উপায় থাকছে না তাদের।

গণমাধ্যম বিশ্লেষক ডগলাস ম্যাকাবে বলেন, সংবাদপত্রগুলো বর্তমানে বিপুল চাপের মুখে রয়েছে। শুরুর দিকে তারা অনলাইন সংস্করণ ফ্রি করে দিয়ে ভুল করেছিল সেটা এখন প্রমাণিত। বর্তমানে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাবদ তারা যা আয় করছে তা প্রিন্ট সংস্করণের বিজ্ঞাপন আয়ের তুলনায় অনেক কম। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে সংবাদপত্র শিল্প এখন আর আগের মতো আকর্ষণীয় নয়। মূলত এ কারণেই পুরনো মালিকরা তাদের পত্রিকা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

শীর্ষ ধনীরা কেন সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করছে?

ম্যাকাবে বলেন, ‘অর্থ নয়, নামকরা সংবাদপত্রগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তির আকর্ষণেই এ খাতে বিনিয়োগ করছেন ধনকুবেররা।’

বোস্টনের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড্যান কেনেডির মতে শুধু প্রতিপত্তির আকর্ষণই শীর্ষ ধনীদের এ খাতে বিনিয়োগের একমাত্র কারণ নয়। সম্প্রতি সাংবাদিকতার এই অধ্যাপক ‘হাউ জেফ বেজোস অ্যান্ড জন হেনরি আর রিমেকিং নিউজপেপার্স ফর দ্য টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ নামে একটি বই প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘অহমিকা এবং ভালো কিছু করার সত্যিকারের বিশ্বাস থেকেই ধনীরা সংবাদপত্রে বিনিয়োগ করছেন।  তাঁরা মনে করছেন, বিখ্যাত পত্রিকাগুলোর আর্থিক ঘাটতি রয়েছে। যদি তাঁরা এগুলোর মালিক হতে পারে, তাহলে সংবাদপত্রগুলো আরও ভালো করবে।’

অন্যতম শীর্ষ ধনী প্যাট্রিক সুন শিয়ং বোস্টন গ্লোব পত্রিকা কিনে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলেছিলেন, এর পেছনে কাজ করেছে তাঁর দক্ষিণ আফ্রিকায় বেড়ে উঠার সময়কালের অভিজ্ঞতা। বর্ণবাদের যুগে সেখানে সংবাদপত্রের কোনো স্বাধীনতা ছিল না।

সংবাদপত্রের মালিক হওয়ার পর ভুয়া খবরের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সুন শিয়ং। তিনি বলেছিলেন, ‘মিথ্যা সংবাদ বর্তমান যুগের ক্যানসার।’ তাঁর পত্রিকা সততা এবং স্বাধীনতার দুর্গ হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

জেফ বেজোস যখন ওয়াশিংটন পোস্ট কেনেন, তখন তিনিও একই রকম কথাই বলেছিলেন।

বিত্তশালীদের বিনিয়োগ সংবাদশিল্পের জন্য সুফল বয়ে আনছে?

অধ্যাপক কেনেডি বলেন, ‘গত অর্ধ শতক ধরে আমরা দেখছি সংবাদপত্রগুলো মুনাফার জন্য তাদের কর্মীদের ছাঁটাই করে চলেছে। সেক্ষেত্রে এটা ভালো খবর যে জনকল্যাণের ব্রত নিয়ে বিত্তশালীরা এসব সংবাদপত্র কিনছে।’

জেফ বেজোস ওয়াশিংটন পোস্ট কিনে নেওয়ার পর এটা আগের থেকে ভালো করছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। বেজোস তাঁর আমাজনকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন পোস্টের গ্রাহক সংখ্যা বাড়িয়েছেন। এটি এখন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু সব শীর্ষ ধনীই যে তাদের মিডিয়া মিশনে সফল হয়েছেন, এমন নয়। ২০১২ সালে ফেসবুকের সহ প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস হিউজেস একশো বছরের পুরোনো ম্যাগাজিন ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’ কিনে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে দুই কোটি ডলার বিনিয়োগ করার পরও আশানুরূপ ফল পাননি তিনি। এরপর ক্রিস পত্রিকাটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।

বিশ্লেষকরা বলেন, সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়াটা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। টাইম ম্যাগাজিনের নতুন মালিক বেনিওফও হয়তো শুরুর কয়েকবছর এ খাতে লাভের মুখ দেখবেন না। কারণ গণমাধ্যম ব্যবসা এখন যে চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেখানে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া খুবই কঠিন। নতুন পথ খুঁজে পাওয়া না গেলে এ অবস্থার মধ্য দিয়েই চলতে হবে এর মালিকদের।

উপরে