আপডেট : ২২ জুলাই, ২০১৮ ০৯:৫২

মদ্যপানে সৃজনশীলতা বাড়ে!

অনলাইন ডেস্ক
মদ্যপানে সৃজনশীলতা বাড়ে!

দীর্ঘ সময় ধরে লেখছিলাম। কিন্তু পছন্দ হচ্ছিল না। শেষমেষ এক পেগ ভদকা খেলাম। সঙ্গে সঙ্গেই মাথাটা যেন খুলে গেল। বিখ্যাত কোনো লেখকের এমন স্বীকারোক্তি আমাদের কাছে একবারেই অপরিচিত নয়। অনেক লেখক-শিল্পী-সুরকাররা প্রায়ই দাবি করেন অ্যালকোহল তাঁদের সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। আসলেই কি তাই? মার্কিন গবেষকরা অবশ্য লেখক-শিল্পী-সুরকারদের পক্ষই নিয়েছেন।

সৃজনশীলতার সঙ্গে মধ্যপানের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর অ্যান্ড্রু জ্যারসজ ও তাঁর সহকর্মীরা ছোট্ট একটা পরীক্ষা চালান। এই উদ্দেশ্যে ২০ জন তরুণকে সৃজনশীল সমস্যার ১৫টি প্রশ্নের একটি সেট সমাধান করতে দেন তাঁরা। শব্দ বিষয়ক এই পরীক্ষাটি রিমোট এসোসিয়েট টেস্ট (র‍্যাট) নামে পরিচিত। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, অ্যালকোহল গ্রহণ না করা তরুণদের চেয়ে মাতাল তরুণেরাই সৃজনশীল সমস্যা সমাধানে অধিক দক্ষ!

এই গবেষণার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাগাজিন হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউর সাংবাদিক অ্যালিসন বিয়ার্ড প্রফেসর অ্যান্ড্রু জ্যারসজের একটি সাক্ষাৎকার নেন। এ সাক্ষাৎকারে গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন প্রফেসর জ্যারসজ।

প্রফেসর জ্যারসজ জানান, সৃজনশীল সমস্যা সমাধানে অ্যালকোহলের প্রভাব সংক্রান্ত এই গবেষণার জন্য ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী ২০ জন পুরুষকে বেছে নেওয়া হয়েছিল যাদের পানাভ্যাস ছিল প্রায় একই রকম। গবেষণার আগে তাঁদেরকে ২৪ ঘন্টার জন্য সব ধরনের অ্যালকোহল ও ড্রাগ এবং ৪ ঘন্টার জন্য খাবার ও ক্যাফেইন থেকে দূরে রাখা হয়। এরপর এক দলকে নির্দিষ্ট অনুপাতে অ্যালকোহল (ভদকা) পান করতে দেওয়া হয়, আরেকদল মদ্যপান থেকে বিরত থাকে। এই পর্যায়ে গিয়ে তরুণদেরকে শব্দ সংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করতে বলা হয়। গবেষণা শেষে ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মাতাল ব্যক্তিরা মদ্যপান না করা ব্যক্তিদের তুলনায় অন্তত দুটি থেকে তিনটি সমস্যার সমাধান বেশি করেছেন। সব মিলিয়ে অন্তত ১৩ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ বেশি সমস্যা সমাধান করেছেন তাঁরা। এমনকি বিস্ময়করভাবে তাঁরা সমস্যা সমাধানে সময়ও কম নিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে প্রফেসর জ্যারসজ বলেন, অ্যালকোহল গ্রহণের প্রভাবে মানুষ মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। আর সৃজনশীল সমস্যা সমাধান হচ্ছে এমন একটি বিষয় যেখানে মনোযোগ হারিয়ে ফেলাই দারুণ সহযোগিতা করে। র‍্যাটের মতো অনুশীলনগুলোতে নিজের অবধারণগত চিন্তা-ভাবনার ওপর অটল থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রকৃতপক্ষে, মাতাল অবস্থায় মানুষের মগজ ‘স্প্রেডিং অ্যাক্টিভেশন’ নামক একটি প্রক্রিয়ায় কাজ করে যা তাকে স্মৃতির অন্ধকার গলি হাতড়ে তথ্য বের করতেও সহায়তা করে। আর এই প্রক্রিয়াটি মদ্যপান না করা ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঘটে না।

ফলে আপনি যদি ভিন্নধর্মী বা আউট অব বক্স চিন্তা করতেন চান তবে হালকা মদ্যপান আপনাকে সহায়তা করতে পারে বলে জানান প্রফেসর জ্যারসজ। তবে কারও রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা .০৮ এর চেয়ে বেশি হয়ে গেলে তাঁর চিন্তাশক্তি আর ভালোভাবে কাজ করবে না বলে সতর্ক করেন এই প্রফেসর।

এই গবেষণাটি করার পরিকল্পনা কেন মাথায় এলো, বিয়ার্ডের করা এমন প্রশ্নের জবাবে জ্যারসজ বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের ’ইউরেকা’ সংক্রান্ত গল্পটির উল্লেখ করে বলেন, কোন জিনিসটি মানুষের অন্তর্দৃষ্টি বাড়িয়ে দেয় সেটি তাঁকে সবসময়ই ভাবিয়েছে। ফলে এই গবেষণাটি করতে আগ্রহী হন তিনি। এই নিয়ে তিনি তাঁর সহকর্মী গ্রেগরি কোলফ্লেশ এবং জেনিফার উইলির সঙ্গে কথা বলেন যারা অ্যালকোহল নিয়ে কাজ করেন।

সাংবাদিক এলিসন বিয়ার্ড এ পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করেন। বিয়ার্ড জানতে চান, এমনটা কি হতে পারে, এ গবেষণার জন্য বাছাই করা ব্যক্তিদের মধ্যে যারা অ্যালকোহল গ্রহণ করেছে তাঁরা এমনিতেই বেশি মেধাবী?

এ প্রশ্নের জবাবে গবেষক অ্যান্ড্রু জ্যারসজ বলেন, মেধা বিষয়ে মোটামুটি সমতা রক্ষার জন্য গবেষণায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে তাঁদের কর্মবিষয়ক স্মৃতিশক্তি পর্যালোচনার মাধ্যমে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ফলে গড়পড়তা সবার মেধার মানই সমান ছিল।

এলিসন বিয়ার্ড আরও জানতে চান, নারী বা বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে এই পরীক্ষাটি সম্পাদন করা হলে কি ভিন্ন ফলাফল আসতে পারতো কিনা?

এ বিষয়ে প্রফেসর অ্যান্ড্রু জ্যারসজ বলেন, তিনি মনে করেন যে তরুণ নারীদের নিয়ে গবেষণা করা হলেও সম্ভবত একই ফলাফল আসবে। বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে গবেষণাতেও একই ফলাফল আসতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্রেনের কর্মপদ্ধতির পরিবর্তন হয় বলে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই গবেষণার ফলাফলে ভিন্নতা আসার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন প্রফেসর জ্যারসজ।

এক পর্যায়ে প্রশ্নকর্তা এলিসন বিয়ার্ড ঠাট্টা করে প্রশ্ন করেন, তাহলে কি সৃজনশীল পেশায় কর্মরত সকলের বেশি বেশি করে মদ্যপান করা উচিত?

গবেষক উত্তরে বলেন, কোনো পেশাই শতভাগ মনোযোগ কিংবা শতভাগ আউট অব বক্স চিন্তার দাবি করে না। তাই মদ্যপানের পরিমাণ নির্ভর করবে কাজের ধরনের ওপর।

তাই সংক্ষেপে বলা যেতে পারে, মদ্যপান করা খুব একটা খারাপ নয়। হালকা মদ্যপান আমাদের নির্দিষ্ট কিছু মানসিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, মদ্যপানের সময় স্থান-কাল-পাত্রের বিষয়টি মাথায় রাখা!

উপরে