আপডেট : ২৭ মার্চ, ২০১৬ ১২:২২

ঘাম ঝরালেই কমবে ক্যানসারের সম্ভাবনা

অনলাইন ডেস্ক
ঘাম ঝরালেই কমবে ক্যানসারের সম্ভাবনা

নিয়মিত শরীরচর্চা রোগবালাই ঠেকিয়ে রাখে, এ কথা শোনা যায় সবসময়ই। কিন্তু এক দল বিজ্ঞানীর বক্তব্য, শুধুমাত্র সাধারণ অসুখ-বিসুখ নয়, ঘাম ঝরানো ব্যায়াম ঠেকিয়ে রাখতে পারে ক্যানসারের মতো রোগের বাড়বৃদ্ধিকেও। সম্প্রতি ডেনমার্কের কোপেনহাগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে পরীক্ষানিরীক্ষা করে প্রমাণ করে দিয়েছেন, ক্যানসার প্রতিরোধের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে শরীরচর্চা।

ওই গবেষকদের বক্তব্য, শুধু ক্যানসার ঠেকিয়ে রাখাই নয়, যাঁদের এক বার ওই রোগ হয়েছিল, এবং চিকিৎসায় সেরে উঠেছেন, তাঁরা যদি নিয়মিত শরীরচর্চা চালিয়ে যান, তা হলে রোগ ফিরে আসার ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।

কোপেনহাগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে ইঁদুরদের উপরে পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। সেখানে ইঁদুরদের দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এক ভাগকে গবেষণাগারে ‘অ্যাক্টিভিটি হুইল’-এর উপরে রাখা হয়েছিল। ফলে নিয়মিত তাদের দৌড়ঝাঁপ চলেছে। অন্য ইঁদুরগুলিকে রাখা হয়েছিল সাধারণ খাঁচায়, যেখানে স্বাভাবিক নড়াচড়ার বাইরে তাদের আর কোনও কাজ ছিল না। এই দুই ভাগের ইঁদুরদের আবার তিন ভাগে ভাগ করে তাদের শরীরে লিভার, ত্বক ও ফুসফুসের ক্যানসারের কোষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

নির্দিষ্ট সময় পরে দেখা যায়, যে ইঁদুরগুলো অ্যাক্টিভিটি হুইলে দৌড়ঝাঁপ করেছে, তাদের লিভারে টিউমারের বৃদ্ধি অন্য ইঁদুর অর্থাৎ যারা দৌড়ঝাঁপের সুযোগ পায়নি, তাদের তুলনায় ৬১% কম। ফুসফুসের ক্ষেত্রে ৫৮% কম। ত্বকের ক্যানসারের ক্ষেত্রে মাত্র ৩১ শতাংশের মধ্যে ক্যানসারের ‘গ্রোথ’ তৈরি হয়েছে। যেখানে দৌড়ঝাঁপ না করা ইঁদুরদের ৭৫ শতাংশের মধ্যেই টিউমার হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, ইঁদুরের দেহে তৈরি হওয়া টিউমারগুলিকে মাইক্রোস্কোপের নীচে রেখে দেখা গিয়েছে, দৌড়ঝাঁপ করা ইঁদুরদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধকারী কোষ (ইমিউন সেল) অনেক বেশি তৈরি হয়। এক বার নয়, একাধিক বার পরীক্ষা করে একই ফল মিলেছে।

একই রকম ভাবে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ক্যানসারকে ঠেকানোর দিশা দেখিয়েছেন ব্রিটিশ গবেষকরা। ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের এক দল বিজ্ঞানীর মতে, ক্যানসারের দুর্বলতম জায়গাটা তাঁরা খুঁজে পেয়েছেন। তাঁরা জানাচ্ছেন, সমস্ত কোষের সাধারণ পরিবর্তন ঘটানো এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বাড়িয়ে তোলাই হল সাফল্যের চাবিকাঠি। আর এর সঙ্গেও শারীরিক পরিশ্রমের বিষয়টি যুক্ত বলে জানিয়েছেন তাঁরা। শরীরচর্চা বাড়ালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। আর সেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনায়াসেই ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়াকে দমিয়ে রাখতে পারে।

কিন্তু এই শরীরচর্চার অর্থ কি নিয়মিত জিমে যাওয়া? প্রতিদিন দু’বেলা ঘাম ঝরিয়ে বহু দূর হাঁটা? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শুধুমাত্র জিমে গিয়েই শরীরচর্চা করতে হবে এমনটা নয়। ডাক্তারদের পরামর্শ, যে ভাবে হোক ঘাম ঝরানো পরিশ্রমটা দরকার, সব চেয়ে ভাল হল হাঁটা। দিনে অন্তত আধ ঘণ্টা থেকে ৪৫ মিনিট।

ক্যানসার চিকিৎসক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শরীরচর্চা করলে দেহে রক্ত চলাচল, অক্সিজেন চলাচল যথাযথ থাকে। যাঁরা বসে কাজ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এটা ঘটে না। এই কারণেই আমরা বার বার শরীরচর্চার কথা বলি। তবে এত দিন গবেষণাগারে পরীক্ষার ফল আমাদের হাতে আসেনি। এ বার আমরা আরও জোরের সঙ্গে বলতে পারব যে ক্যানসার প্রতিরোধে শরীরচর্চা অন্যতম বড় হাতিয়ার।’’

একই বক্তব্য ক্যানসার শল্য চিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায়েরও। তিনি জানান, রোগীদের সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ব্যায়ামের পরামর্শ দেন। কারণ, ‘‘শরীরচর্চা না হলে ওবেসিটি বাড়ে। কিছু ক্যানসার সরাসরি ওবেসিটির সঙ্গে যুক্ত। যেমন মহিলাদের স্তুন, জরায়ু, ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং পুরুষদের ফুসফুস ও প্রস্টেটের ক্যানসার’’, বললেন তিনি। গৌতমবাবুর বক্তব্য, ধূমপান এবং মদ্যপান থেকে ক্যানসার হওয়ার বিষয়টি ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। কিন্তু ওবেসিটির সঙ্গে ক্যানসারের যোগ নিয়ে এখনও তেমন সচেতনতা তৈরি হয়নি। অথচ সেটা খুবই জরুরি। সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের বিষয়টিও যুক্ত।

ডায়েটিশিয়ান রেশমী রায়চৌধুরীর কথায়, ‘‘দূষণ, মানসিক উদ্বেগ এবং খাবারে কালারিং এজেন্ট শরীরের ক্ষতি করছে। শুধু ব্যায়ামে ফল হবে না, যদি না ঠিকঠাক খাবার খাওয়া হয়। কৃত্রিম রং এবং প্রিজার্ভেটিভ দেওয়া খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। জাঙ্ক ফুড বন্ধ করতেই হবে। দিনে সাড়ে তিন থেকে চার লিটার জল খেতেই হবে প্রাপ্তবয়স্কদের। জল কম খেলেও ওজন বাড়ে।’’

 

উপরে