আপডেট : ১২ মার্চ, ২০১৬ ২০:৪৬

রেসলিং বাস্তব নয় সাজানো নাটক!

বিডিটাইমস ডেস্ক
রেসলিং বাস্তব নয় সাজানো নাটক!

আন্ডার টেকার বাতিস্তাকে উঁচু করে মারল এক আছাড়, এরপর রেফারি গুনলো এক – দুই – তিন, কিন্তু বাতিস্তা আর তার শরীরকে নাড়াতে পারলেন না। বাজিয়ে দেয়া হলো আন্ডার টেকারের বিজয়ের ঘণ্টা। এমন দৃশ্যের সাথে আপনারা অনেকেই পরিচিত আছেন। এটি রেসলিংয়ের একটি দৃশ্য। রেসলিং যাকে বাংলায় বলা হয় কুস্তি, বর্তমান বিশ্বে বিনোদনের এক প্রধান উৎস এটি। প্রথম দিকে রেসলিং শুধুমাত্র আমেরিকায় জনপ্রিয় থাকলেও বর্তমানে এটি সমগ্র বিশ্বে সমান তালে জনপ্রিয়।

বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের দর্শক সংখ্যা ও সিডি-ডিভিডি বিক্রয়ের পরিসংখ্যান দেখলে এটিসহজেই বোঝা যায় যে রেসলিং বিশ্বে কতটা জনপ্রিয়। ছোট বাচ্চা থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও পর্যন্ত টিভিতে রেসলিং দেখে থাকেন রুদ্ধশ্বাস নিয়ে। আমরা সবাই রেসলারদের শক্তি সামর্থ্য, তাদের মার হজম করার ক্ষমতা, মারের টেকনিক দেখে অবাক হই। কখন কে জিতবে, কে কাকে কত মারতে পারে এই সকল বিষয়গুলো আমরা রেসলিং দেখার সময় অপলক দৃষ্টিতে দেখে থাকি। অনেকে আবার তাদের প্রিয় রেসলারের জয়ে আনন্দিত হয় আবার হয় দুঃখিত তার পরাজয়ে। তবে রেসলিংয়ের সবচেয়ে গোপন বিষয়টি হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। আপনি শুনলে হয়তো বিশ্বাস করতে চাইবেন না, তবে বিষয়টি সত্য যে, রেসলিং কোনও খেলা নয়। এটি পাতানো নাটকের নিপুণ প্রদর্শনী। আমরা টিভিতে যে রেসলিং দেখে থাকি তা দর্শক বিনোদনের জন্য আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা স্ক্রিপ্টের সফল অভিনয়। এই রেসলিং আন্তর্জাতিকভাবে খেলা হিসেবে স্বীকৃত নয়, এটি দর্শক বিনোদনের জন্য শুধুমাত্রই অভিনয়। তবে অলিম্পিক বা ফিলো’র তত্ত্বাবধানে যে কুস্তি প্রতিযোগিতা গুলো অনুষ্ঠিত হয় সেগুলো আলাদা। কারণ, এগুলো সত্যিকারের কুস্তির লড়াই।

রেসলিং হচ্ছে মানুষে-মানুষে লড়াই। ফলে একে আদিম মানুষের বন্য লড়াই বললেও ভুল হবে না। ঐতিহাসিক মতে ১৫ হাজার বছর পূর্বে প্রথম ফ্রান্সে উৎপত্তি হয়েছিল কুস্তি খেলার এবং আজকে যার আধুনিক রূপ রেসলিং। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক কুস্তি ফেডারেশন, যার নাম ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব এসোসিয়েটেড রেসলিং স্টাইলস (ফিলো) রেসলিংয়ে মেয়েদের ফ্রি স্টাইল যুক্ত হয়েছে ২০০৪ সালের অলিম্পিক খেলা থেকে। এর আগে ১৯৮৭ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওয়ার্ল্ড ওমেন্স রেসলিং চ্যাম্পিয়নশিপ। বর্তমান রেসলিং আর তখনকার কুস্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। ১৯৫২ সালে আমেরিকায় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড রেসলিং ফেডারেশন (WWWF) এর ব্যানারে যাত্রা শুরু হয় বাণিজ্যিক পেশাদার রেসলিংয়ের। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রডেররিক ম্যাকমোহন। পরে ২০০২ সালে এসে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ওয়ার্ল্ড রেসলিং ইন্টারটেইনমেন্ট (WWE)। যার বর্তমান সদর দপ্তর অবস্থিত স্টামফোর্ডে।

বর্তমান সময়ের পেশাদার রেসলিংয়ের সব ম্যাচ থাকে পাতানো। ফলাফল আগে থেকেই থাকে নির্ধারিত। রেসলাররা বছরের পর বছর ধরে নিজেদের শরীরকে তৈরি করেন লৌহ মানবের মতো। এরপর তারা তাদের শরীরের কসরত দেখিয়ে অল্প কয় দিনেই বনে যান সুপার স্টার। অনেক রেসলার আবার তাদের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে সিনেমা জগতেও সুযোগ পেয়ে যান। লাখো দর্শকের সামনে জীবন-মরণ, বিধ্বংসী যে লড়াই হয় তার সবটাই থাকে সাজানো নাটক। আর এই নাটককে বাস্তবের মতো ফুটিয়ে তোলা হয় রেসলারদের নিপুণ অভিনয়ে। রেসলিংয়ে রেসলারদের শরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের শরীর গুলো এমনভাবে লৌহমানবের মতো তৈরি করা হয় যাতে তাদের অভিনয় গুলো বাস্তবিক মনে হয়।

আলো ঝলমল বিশাল ইনডোর স্টেডিয়াম বা আমরা যারা টিভি পর্দার সমানে বসে রেসলিং দেখি তারা সবাই মনে করি রিংয়ে যা হয় তার সবই সত্যি। তবে সত্য কথা এই যে, এগুলো সবই মিথ্যা। বিষয়টি পূর্বে কারো জানা ছিল না ফলে এটা যে অভিনয় তা অনেকে বিশ্বাস করতে চান না। WWE এর চেয়ারম্যান ভিন্স মিকম্যান এক ডকুমেন্টারিতে এই বিষয়টা স্বীকার করেছেন যে, রেসলিংয়ে সবই সাজানো নাটক এবং রেসলাররা সেই নাটকের অভিনেতা। তিনি বলেছেন, “আমার যা করি দয়া করে আপনারা কেউ বাড়ি, স্কুল বা কোথাও এগুলো করার চেষ্টা করবেন না। এসব রপ্ত করতে আমাদের অনেক অনুশীলন করতে হয়। তারপরও আমরা অনেকে মাঝে মাঝে ইনজুরিতে পড়ি”।

একজন রেসলারকে রিংয়ে নামার আগে তাকে তার অভিনয়ের বিষয়টি বিস্তারিত শিখিয়েদেয়া হয়। যাতে তিনি সামান্যতম ভুলও না করেন। কারণ, একটু ভুলই পারে রেসলিং যে অভিনয় তা দর্শকদের সামনে প্রমাণ করে দিতে। প্রতিটি রেসলিং কোম্পানির থাকে কয়েকজন স্ক্রিপ্ট লেখক। তারা খুব মন দিয়ে প্রতিটি খেলা দেখে থাকেন। কারণ একেকটি পর্ব মানেই একেকটি সিনেমা বা নাটকের মতো অভিনয়। পরের পর্বে কি দেখানো হবে সেটাও নির্ধারণ করা হয় আগের পর্ব দেখে। স্ক্রিপ্ট লেখকদের নির্দেশনা অনুযায়ীই মঞ্চে গিয়ে বলতে হয় রেসলারদের, লড়তেও হয় তাদের লেখা স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী। রেসলারদের জয়-পরাজয় আগেই থেকেই থাকে নির্ধারিত। দর্শকদের মাঝে রোমাঞ্চ বাড়ানোর জন্য থাকে নানান আয়োজন। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে তা না বুঝে দর্শকরা জেনো সেটা নিয়ে টেনশনে ভোগে, নিজের প্রিয় তারকার জন্য হাসে, কাঁদে আর প্রতিপক্ষকে দুয়োধ্বনি দেয় এসব নিশ্চিত করতে আগে থেকেই স্ক্রিপ্ট লিখে ধরিয়ে দেয়া হয় যার যার হাতে। যুদ্ধ চলাকালে যখন একজন আরেকজনের মাথায় বা গায়ে চেয়ার, রড, হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তখন ভাবার কারণ নেই যে এটি সত্যি। কারণ এই চেয়ার, রড বা হাতুড়ি গুলো তৈরি করা থাকে বিশেষ উপায়ে। আর এই জিনিসগুলোর ভিতরে প্রবেশ করানো থাকে মাইক্রোফোন ফলে মারের শব্দগুলো কয়েকগুণ বেশী জোরে শোনা যায়। তবে রক্তের বেলায় রেসলারদের একটু যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়। শরীর থেকে রক্ত বাহির করার জন্য রেসলাররা কৌশলে নিজেদের শরীর নিজেরা ব্লেড দিয়ে হালকা কেটে ফেলেন। তারা কৌশলে রেফারির কাছ থেকে ব্লেড সংগ্রহ করেন আবার মাঝে মাঝে স্টেজে আসার পূর্ব থেকেই ব্লেড কাছে রেখে দেন। মুখের ভিতর থেকে রক্ত বাহির করার কৌশলটি আবার ভিন্ন। সেটি হচ্ছে, তারা পূর্ব থেকেই জিহ্বার তলায় ব্লাড ক্যাপসুল নিয়ে রাখেন। যখন দরকার হয় তখন তারা এই ক্যাপসুল দাঁত দিয়ে কেটে সমস্ত মুখ রক্তাত্ত করে ফেলেন।

যখন কোনও রেসলার জনপ্রিয় হয়ে উঠেন তখন বিভিন্ন কৌশল ও নতুন নতুন কাহিনী দিয়ে তাকে বারবার বিজয়ী করে দর্শকের আকর্ষণকে ধরে রাখা হয়। আর এই আকর্ষণকে পুঁজি করেই দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে রেসলিং নামের এই নাটক। তারা এই নাটকগুলো কৌশলে করে থাকে তবে অন্যরা করতে গেলে তাদের মারাত্মক ইনজুরি হবার আশংকা থাকে সেজন্য রেসলিং কমিটির পক্ষ থেকে বারবারই টিভিতে সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়ে বলা হয় ‘Please don’t try this at home’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে