আপডেট : ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৯:২০

চাকমা বিয়ের রীতি-নীতি

উম্মে জান্নাত
চাকমা বিয়ের রীতি-নীতি

চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলায় চাকমা জনগোষ্ঠী এ অঞ্চলের অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। শারীরিক গঠন-প্রকৃতি; যেমন: উচ্চতা, গায়ের রঙ, মুখাবয়ব, চোখের আকার, আয়তন প্রভৃতি বিবেচনায় চাকমারা মঙ্গোলীয় জাতিভুক্ত একটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশে বসবাস করলেও তাদের আচার আচরণে কিছু ভিন্নতা রয়েছে। অন্য অনেক সম্প্রদায়ের মতো তাদের বিয়ে ও সামাজিক আচারে রয়েছে ব্যাতিক্রম রীতি। চাকমা সমাজে পাত্রের অভিভাবকরাই পাত্রীর সন্ধান করে।

পাত্রী পছন্দ হলে বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা জানানো হয় পাত্রীর বাড়িতে। এই ইচ্ছা প্রকাশকে চাকমা ভাষায় ‘উদা লনা’ বা খোঁজ নেয়া বলা হয়। পাত্রপক্ষের পরিবার সম্পর্কে গোপনে খোঁজ নিয়ে পছন্দ হলেই পাত্রীপক্ষ ইতিবাচক সাড়া দেয়।

তবে একবার সম্পর্ক স্থাপনের পক্ষে মত দেয়ার পর পাত্রীপক্ষ তাদের সম্মতি প্রত্যাহার করতে পারে না। একইভাবে পাত্রপক্ষও বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। যে পক্ষই এভাবে অপর পক্ষের সম্মানহানি ঘটাবে সে পক্ষ অপর পক্ষকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ ‘লাজভার’ দিতে বাধ্য থাকবে। পাত্রীপক্ষের সাড়া পেলে পাত্রপক্ষ নির্ধারিত দিনে জানিয়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী স্থানীয় মদ, পান, সুপারি, নারিকেল, শুঁটকি মাছ, কয়েক প্রকারের পিঠা প্রভৃতি নিয়ে পাত্রীর বাড়িতে গিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব রাখে। এটাকে ‘বৌ চা যানা’ বা ‘কনে দেখা’ বলে।

পাত্রীপক্ষের আনুষ্ঠানিক সম্মতি লাভের পর পাত্রীপক্ষের দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো চূড়ান্ত করার জন্য পাত্রপক্ষকে কয়েকবার পাত্রীপক্ষের বাড়িতে যেতে হয়। বিয়ের দিনক্ষণ ও পাত্রীপক্ষের ‘পণ’ নির্ধারণের জন্য দ্বিতীয়বার পাত্রীর বাড়িতে যাওয়াকে চাকমা ভাষায় ‘দ্বিপুর’ বা দ্বিতীয় সফর বলা হয়। তবে দ্বিতীয়বার পাত্রীপক্ষের বাড়িতে গিয়েও বিয়ের চূড়ান্ত দিন, তারিখ নির্ধারণ নাও সম্ভব হতে পারে । তাই তৃতীয়বার পাত্রীর বাড়িতে যাওয়ার পরই বিয়ের চূড়ান্ত দিন, তারিখ নির্ধারণ হয়। এই পর্বকে ‘মদ পিলাং গজানি’ বা ‘গছানি’ বলা হয়।

এরপর উভয়পক্ষ বিয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি যেমন: ভোজে নিমন্ত্রিতদের সংখ্যা, মাছ-মাংসের পরিমাণ, নিমন্ত্রিতদের জন্য চোলাই মদ, চাল, ডাল ইত্যাদি খরিদ করা শুরু হয়ে যায়। এটাকে ‘থক ধরা যানা’ (বিয়ে প্রস্তুতির ব্যাপারে শেষবারের মতো খবর নেয়া) বলা হয়। বিয়ের নির্ধারিত তারিখের কমপক্ষে এক সপ্তাহ আগে পাত্রীপক্ষের দাবিকৃত পণ পাত্রপক্ষের পরিবারের কোনো সদস্য বা নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে পাত্রীর বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়।

পাত্র ও পাত্রীপক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ‘বৌ হজা যেয়ে’ (বৌ আনার দল- বরযাত্রী) ও ‘বৌ বারে দিয়া’ (বৌকে বরের বাড়ি পৌঁছানো- মাকুন্দি) দলের সংখ্যা নির্ধারণ করেন। বরপক্ষ থেকে বেজোড় সংখ্যক বৌ আনার দল পাত্রীর বাড়ীতে যায়। এ দলের মধ্যে যুবক-যুবতীর সংখ্যাই বেশি থাকে। বরের ঠাট্টা সম্পর্কীয় ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কাকাতো, জেঠাতো বোনের স্বামী সম্পর্কের একজন পুরুষ বরপক্ষ ও কনেপক্ষের যুবতি মেয়েদের সাহায্যে কনেকে অলঙ্কারাদি পরান। পুরুষকে সপত্মীক হতে হয়।

কনে নিজ বাড়ি থেকে বরের বাড়ি পৌঁছুলে কলসির উপর রাখা মোমবাতি অথবা সলতে জ্বালিয়ে দিয়ে বাড়িতে বৌ তোলার অনুমতি চাওয়া হয়। অনুমতি পাওয়ার পর বরের ছোট ভাই বা বোন অথবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয় একজন ছেলে বা মেয়ে মূল প্রবেশপথে একটা পিঁড়ি পেতে কনের পা ধুইয়ে দেয়। তারপর বরের মা কিংবা অন্য একজন সধবা বয়স্ক নারীরা প্রবেশপথের দুইপাশে রাখা দুটি কলসির গলায় বাঁধা সাত প্রস্থ সূতা কেটে কনের বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলে বেঁধে দেয়। এরপর কনেকে ফুল দিয়ে সাজানো নির্ধারিত কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়।

চাকমা সমাজে বিয়ের মূল অনুষ্ঠান হলো 'চুমুলাং'। এ অনুষ্ঠানে একজন পুরোহিতের দরকার হয়। চুমুলাং এর সময় একই বেদীতে দুটি পূজার ঘট বসানো হয়। বরের জন্য নির্দিষ্ট ঘটে চাল ও কনের জন্য দেয়া হয় ধান।

চুমুলাং পূজায় একটি শুকর, তিনটি মুরগি ও মদ উৎসর্গ করা হয়। এরপর ওঝা মন্ত্রপাঠ করে থাকে। চুমুলাং পূজার মাধ্যমে নবদম্পত্তির দাম্পত্য জীবন শুরু করার জন্য সমাজের উপস্থিত সবার সম্মতি গ্রহণ করতে হয়। ‘জদনবানাহ’ মানে জোড়া বাঁধার মাধ্যমে বর-কনে সমাজের স্বীকৃতি লাভ করে। বরের বড় ভগ্নিপতি সম্পর্কীয় একজন এসে নবদম্পত্তির জন্য সাজানো একটি কক্ষে বরের বামে কনেকে বসিয়ে উচ্চস্বরে বিয়েতে উপস্থিত জনগণের মতামত প্রার্থনা করে এই বলে, ‘অমুক আর অমুক বর-কনের জোড়া বাঁধার হুকুম আছে কি না?’ সবাই উচ্চস্বরে ‘আছে আছে’ বলে স্বীকৃতি জানালে সেই ব্যক্তি সাত হাত লম্বা একখণ্ড সাদা বস্ত্র দিয়ে বর-কনে উভয়ের কোমরে জড়িয়ে বেঁধে দেয়। আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর সমাজের অনুমতি নিয়ে বাঁধন খুলে দেয়া হয়। বর আর কনে তখন ত্বরিৎ গতিতে যার যার আসন থেকে উঠে দাঁড়ায়। আসন থেকে যে আগে উঠতে পারে সেই সারাজীবন অপরজনের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারে বলে তাদের সমাজের বিশ্বাস।

চাকমা বিয়ের আরেকটি পর্ব ‘খানা সিরানা’ বা ‘খানা সিরেদেনা’। এর অর্থ সমাজের দায় শোধ করা। বিয়েতে সমাজের স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে বর সমাজের কাছে ঋণী হয়। এই ঋণ বা দায় শোধ করতে সে বাধ্য। সেই হিসেবে বিয়েতে সামর্থ্য অনুসারে বর পক্ষকে একটি সামাজিক খানা দিতে হয়। এই খানায় ‘টক’ জাতীয় একটি বাধ্যতামূলক তরকারি থাকে, যাকে চাকমা ভাষায় ‘খাদা’ বলা হয়। এই অনুষ্ঠানে বর-কনে মদের বোতলসহ রান্না করা মোরগ ও শূকরের মাংস একটি মেজাংয়ের উপর ঢাকনা দিয়ে সাজিয়ে বৃত্তাকারে আসীন সবাইকে প্রণাম করে পরিবেশন করে। যারা বিয়েতে ‘খানা সিরিনা’ পর্ব সমাপ্ত করে না তাদের মৃত্যু হলে সমাজের লোকেরা তাদের শ্মশানে নেয়ার সময় কাঁধের উপরে করে নেয়ার বদলে নিচে করে নেয়।

বিবাহকার্য সম্পন্ন হওয়ার পরদিন বর ও নববধূকে কনের বাবার বাড়িতে যেতে হয়। এই যাওয়ার নাম চাকমা কথায় ‘বেষুত ভাঙা’ বা বরের শ্বশুরালয় গমন। এই বেষুত ভাঙার কাজ সম্পন্ন না করে নবদম্পতি সহবাস ও একত্রে বসবাস করতে পারবে না। এমনকি ‘বেষুত ভাঙা’ ছাড়া বর ও নববধূর অন্য কারো বাড়িতে যাওয়াও নিষেধ। বেষুত ভাঙা যাওয়ার সময় নবদম্পতি বাড়িতে নানা রকমের পিঠা শ্বশুরালয়ে নিয়ে যায়। কোনো কারণে কনের বাবার বাড়িতে নির্দিষ্ট সময় এই ‘বেষুত ভাঙা’য় যাওয়া সম্ভব না হলে নিকটস্থ কনের স্বগোত্রীয় গুরুজন সম্পর্কীয় কোনো পুরুষ আত্মীয়ের বাড়িতে ‘বেষুত ভাঙা’ সম্পন্ন করতে হয়। তাও সম্ভব না হলে চিরসবুজ ছায়াযুক্ত গাছের ছায়ার তলে বেষুত ভাঙার কাজ সম্পন্ন করার বিধি আছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে