আপডেট : ২৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১৫:৪৫

৩৫’র দাবি ও বিএনপির 'স্বার্থপর রাজনীতি'

গাজী মুনির
৩৫’র দাবি ও বিএনপির 'স্বার্থপর রাজনীতি'

সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করা সংক্রান্ত একটি বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে জাতীয় সংসদ। নানান যুক্তি দেখিয়ে ওই প্রস্তাব প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। এরপর কণ্ঠভোটে ওই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার যুবক সেদিন অধীর আগ্রহে দেখছিলেন সংসদ অধিবেশ। তাদের ভাগ্য নির্ধারণের খেলা। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের হতাশ হতে হয়েছে।

স্বতন্ত্র সাংসদ রেজাউল করিম ওই সিদ্ধান্ত প্রস্তাবটি এনেছিলেন। কণ্ঠভোটে তাঁর প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়। রেজাউল করিমের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন সংসদে বলেন, বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ ও অবসরের যে বয়সসীমা, সবদিক বিবেচনায় সেটাকে সরকার যৌক্তিক বলে মনে করছে। স্বাধীনতার পর প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ২৫ থেকে ২৭ ও পরবর্তীতে ৩০ করা হয়। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট নেই। ২৩ বছর বয়সে শিক্ষার্থীরা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাচ্ছেন। ছয়-সাত বছর চাকরির প্রস্তুতির জন্য সময় পাচ্ছেন। তা ছাড়া চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ করা হলে পেনশন সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হবে।

তবে বাস্তবতা প্রতিমন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে বিস্তর ফারাক। ৩৫ চাই দাবিতে যে ছাত্রসমাজ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন তাঁরা সবাই ৩-৫ বছর পর্যন্ত সেশন জটের শিকার। এই ছাত্রদের অধিকাংশই ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এসএসসি পাশ করেছেন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০০৭ সালের অগাস্টে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে দেশজুড়ে চরম অস্থিরতা-নাশকতা, ২০১৩ সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের দেশজুড়ে আগুন সন্ত্রাস, ২০১৫ সালের লাগাতার অবরোধ এই সবই ভুগতে হয়েছে এই সময়ের পাশ করা শিক্ষার্থীদের। মরার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে সদাশয় সরকার গড় আয়ু বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১২ সালে সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৫৯ বছরে উন্নীত করে; অল্প দিনের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরের বয়স ৬০ বছর করা হয়। ফলে সরকারি চাকরিতে শূন্যপদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। নতুন স্নাতক-স্নাতকোত্তর পাশ করা শিক্ষার্থীদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ একেবারেই সীমিত হয়ে পড়ে। বঞ্চনার শিকার হয় এই সময়ে পাশ করা প্রায় ২৮ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ-তরুণী।

এসব বিবেচনায় ২০১২ সাল থেকে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ছাত্রদের এই নায্য দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে তা রক্ষা করা হয়নি। সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বৃদ্ধির বিষয়টি রাখলেও সংসদে প্রস্তাব নাকচ করার মধ্য দিয়ে কার্যত সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার।

নির্বাচনী ইশতেহারে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বদ্ধির বিষয়টি রেখেছিল রাজপথের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এমনকি তাঁরা এককাঠি সরেস হয়ে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমাই তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গত ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। তাতে ক্ষমতায় গেলে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা তুলে দেবে বলে ঘোষণা দেয় তাঁরা। ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়- পুলিশ ও সামরিক বাহিনী বাদে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য কোনো বয়সসীমা থাকবে না। অনগ্রসর ও প্রতিবন্ধী ছাড়া আর কারও জন্য কোটা থাকবে না। ৩০ বছরের বেশি শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা চালুর জন্য রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দেখতে কমিশন গঠন, পিইসি-জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, ডাকসুসহ ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে প্রশাসনের হাতে দেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি চালু হবে।

অথচ, যে বিষয়টির সঙ্গে দেশের ২৮ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীর ভাগ্য জড়িত, ২৮ লাখ পরিবারের স্বার্থ প্রতক্ষ্যভাবে জড়িত, ২৮ লাখ পরিবার মানে প্রায় তিন কোটি নাগরিকের বেঁচে থাকা-সামাজিক মর্যাদা জড়িত। যে বিষয়টি তাঁরা নির্বাচনের ইশতেহারে এত গুরুত্ব দিয়ে রেখেছিল_সেই জন আকাঙ্খার বিষয়টিকে সরকারে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী মহান সংসদে দাঁড়িয়ে যেভাবে মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন সেটার একটা প্রতিবাদ বিএনপির কাছ থেকে দেশের যুবসমাজ আশা করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য দেশের অন্যতম বিরোধীদলের দাবিদার বিএনপি বিষয়টি নিয়ে এখনও পর্যন্ত টু-শব্দটিও করেনি। এটা ২৮ লাখ বেকার যুবকের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। ৩৫’র দাবি নিয়ে মন্ত্রীর সংসদে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে পারতো, ২৮ লাখ বেকার তরুণ-তরুণীর পাশে দাঁড়িয়ে দাবি আদায়ে সরকারকে বাধ্য করতে পারতো বিএনপি। এটাই ছিল দলটির কাছে ছাত্র সমাজের প্রত্যাশা।

প্রশ্ন জাগছে বিএনপি কি আসলে রাজনীতি বোঝে? দলটি কি আসলে জনগণের রাজনীতি করে নাকি নিজেদের স্বার্থ নিয়েই রাজনীতি করে? ৩৫’র দাবি যদি যৌক্তিক না হবে তাহলে তাঁরা নির্বাচনের ইশতেহারে কেন রেখেছিল? শুধু ভোট পাওয়ার জন্য।

২০০৬ সালে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে দলটিকে কোন জনসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজনীতি করতে দেখা যায়নি। এই সময়ে তাঁদের রাজনীতি ছিল খালেদা জিয়ার বাড়ি, তারেকের মামলা, ভোট, খালেদার মুক্তি, নিজেদের অবৈধ সম্পদ রক্ষার ইত্যাদি...। ছাত্রসমাজের নায্য দাবি ৩৫’র কবর দেওয়ায় সরকারের ওপর এই ছাত্ররা ক্ষুব্ধ, পাশাপাশি বিএনপির স্বার্থপর রাজনীতিও তাঁদের হতাশ করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। বিএনপি নামক দলটি যদি জন আকাঙ্খা বুঝতেই না পারে, জনগণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কোন কথা বলতে না পারে তাহলে দলটির বাংলাদেশে রাজনীতি করার কোন অধিকার বা প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা সেটা নিয়ে এখন শিক্ষিত যুবসমাজ সন্দিহান। এভাবে চলতে থাকলে জনবিচ্ছিন্ন হতে হতে এক সময় বিএনপি কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে এমনটাই ধারণা রাজনীতি বিশ্লেষকদের।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সেশনজট কিছুটা কমায় ধারণা করা যায়, প্রায় সবাই ৩০ বছর বয়সের মধ্যে শুধু স্নাতক নয়, স্নাতকোত্তর শিক্ষাও শেষ করতে পারছেন। কিন্তু শিক্ষিত যুবকদের সংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় চাকরিপ্রার্থীরা কয়েকবার চেষ্টা করার সুযোগ প্রত্যাশা করেন। এরূপ সুযোগ সৃষ্টি করতে সরকারের কোনো অসুবিধা থাকার কথা নয়। চাকরিপ্রার্থী যুবসম্প্রদায় কর্মসংস্থানের আশায় যদি আরও কিছুদিন ছাত্রাবস্থার মতো পড়াশোনা চালিয়ে যায়, তবে পাঠাভ্যাসবিমুখতার এই যুগে তাদের ‘বাধ্যতামূলক’ এই জ্ঞানচর্চাকে তো উৎসাহ দেওয়াই ভালো।

সংসদে নাকচ হওয়ার পরও সরকারের কাছে বিনীত অনুরোধ ২৮ লাখ উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীকে নিজ দেশে রোহিঙ্গা বানাবেন না। তাঁদের বাঁচতে দিন, বাঁচার সুযোগ দিন। এতে সরকার ও দেশের কোন ক্ষতি নেই। এই বেকার তরুণ-তরুণীরা এদেশেরই সন্তান, এঁরা যদি আরও কিছু দিন স্বপ্ন দেখতে পারে, আরও কিছু দিন সমাজে মাথা উচু করে বাঁচতে পারে তাহলে সার্বিক বিবেচনায় সেটা দেশের জন্যই মঙ্গলজনক হবে। সুতরাং সব দিক বিবেচনায় যুবসম্প্রদায়ের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র ও সময় প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স যথাশিগগির ৩৫ বছর কিংবা তারও বেশি উন্নীত করা দরকার। আর একই সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবা একটি যৌক্তিক বয়স পর্যন্ত পেতে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে চাকরি থেকে অবসরের বয়স এক বছর বাড়িয়ে ৬০ বছর করাই হবে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।   

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে