আপডেট : ৯ মে, ২০১৬ ২০:৩৭

সৌদিতে `অত্যাচারে` মৃত ভারতীয় গৃহপরিচারিকা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদিতে `অত্যাচারে` মৃত ভারতীয় গৃহপরিচারিকা

ভারতের হায়দ্রাবাদ থেকে সৌদি আরবে গৃহ পরিচারিকার কাজ করতে যাওয়া এক তরুণী গৃহস্বামীর প্রবল অত্যাচারের জেরে প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

পঁচিশ-বছর বয়সী আসিমা খাতুন গত বছরেই সৌদিতে কাজ নিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তার পরিবার জানাচ্ছে মালিকের অত্যাচার সইতে না-পেরে তিনি গত বেশ কিছুদিন ধরেই তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলছিলেন।

ভারতের মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ দেশ থেকে যে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে কাজ নিয়ে যান, তাদের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে ভারত সরকার আদৌ সচেষ্ট নয়। আর তাই এই নির্যাতনের পরম্পরাও কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না।

হায়দ্রাবাদের দবিরপুরা এলাকার একটি গরিব পরিবারের মেয়ে আসিমা খাতুন গৃহপরিচারিকার চাকরি নিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে পাড়ি দিয়েছিলেন গত বছরের শেষ দিকে।

কয়েক মাসের চাকরিতে বাড়িতে তিনি একটি পয়সাও পাঠাতে পারেননি, তবে যখনই সুযোগ পেয়েছেন মাকে ফোন করে জানিয়েছেন তার ওপর রাতদিন অকথ্য অত্যাচার চলছে।

মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর আসিমার মা গৌসিয়া খাতুন বিবরণ দিচ্ছিলেন সেই চরম নির্যাতনের।

তিনি বলছিলেন, ‘‘আমার মেয়ে যখন থেকে ওখানে গেছে তখন থেকেই একটা বন্ধ কামরায় ওকে আটকা রাখা হত। কিছু খেতে দিত না, জল দিত না – সকালে তালাবন্ধ করে রেখে যেত, আর সন্ধেবেলা তালা খুলে ঘরে ঢুকে অত্যাচার করত।’’

‘‘আমার মেয়ে খালি আমায় কাঁদতে কাঁদতে ফোন করত আর বলত, আম্মি আমি আর পারছি না। আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। খালি বলত, আমায় কিছু খেতে পর্যন্ত দেয় না, জল দেয় না।’’

আসিমার পরিবারের আবেদনের ভিত্তিতে গত সপ্তাহে তেলেঙ্গানা রাজ্যের মুখ্য সচিব ভারতে সৌদি দূতাবাসে চিঠিও লিখেছিলেন, যাতে তাকে মালিকদের হাত থেকে উদ্ধার করে ভারতে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে, তিনদিন আগে সৌদি থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি ফোন করে গৌসিয়া খাতুনকে জানায় যে তার মেয়ে আসিমা আর বেঁচে নেই।

পরে রিয়াদের ভারতীয় দূতাবাসও আসিমার মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করে।

এদিকে গৃহপরিচারিকার কাজের জন্য সৌদিতে পাঠানো কিন্তু ভারত দুবছর আগেই নিষিদ্ধ করেছে।

তার পরও কীভাবে হায়দ্রাবাদের দালাল চক্র আসিমাকে রিয়াদে পাঠাতে পারল সে ব্যাপারে রাজ্য পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

শহরের রানিবাজার থানার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা রমেশ কুমার বলছিলেন, ‘‘তদন্তে কাউকে দোষী পাওয়া গেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেব। এই মুহূর্তে আমরা মুসকান নামে এক ব্যক্তির খোঁজ করছি, যে রিক্রুটমেন্ট এজেন্ট হিসেবে কাজ করত।’’

‘‘তবে এই খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে সে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেছে, আমরা তার খোঁজে তল্লাসি চালাচ্ছি। যদি তদন্তে দেখা যায় তার গাফিলতি ছিল, আমরা ওকে গ্রেফতার করব’’, জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

সৌদি আরবে ১০ লক্ষেরও বেশি ভারতীয় নারী-পুরুষ কাজ করেন, আর মেয়েদের একটা বড় অংশই কাজ করেন গৃহ পরিচারিকা হিসেবে, যেখানে অত্যাচার ও নির্যাতনের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।

মাত্র ছ-সাতমাস আগেই কস্তূরী মনিরত্নাম নামে এক ভারতীয় পরিচারিকার হাত কেটে ফেলে দিয়েছিলেন তার সৌদি গৃহকর্তা।

ভারত সরকারিভাবে সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর পরও দোষীদের এখনও কোনও সাজা হয়নি।

দিল্লিতে এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটসের সুহাস চাকমা বলছিলেন, ভারত সরকারের নিষ্ক্রিয়তাও এ জন্য অনেকটাই দায়ী।

মি. চাকমার কথায়, ‘‘ভারত সরকার এই সমস্যা সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে তাদের যতগুলো দূতাবাস আছে সেখানে এই ভারতীয়দের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে কোনও স্পষ্ট নির্দেশও নেই, তাদের কোনও লোকবলও নেই।’’

‘‘আসলে এখানে জীবনের কোনও মূল্যই দেওয়া হয় না। এই ধরনের অমানবিক নির্যাতনের ঘটনাই শুধু নয়, মধ্যপ্রাচ্যে কোনও ভারতীয় নাগরিক যদি তুচ্ছ কোনও ঘটনাতেও ফেঁসে যান, তারপরও দেখা যায় দূতাবাসগুলো কিন্তু তাদের আদৌ সাহায্য করতে প্রস্তুত নয়’’, বলছিলেন মি. চাকমা।

আসিমা খাতুনের ক্ষেত্রেও তার ওপর চরম অত্যাচার চলছে জেনেও তার অসহায় পরিবার কিছুই করতে পারেনি। তারা সরকারের সাহায্য চাওয়ার পরও আসিমার মৃত্যু ঠেকানো যায়নি।

এখন তাদের শুধু একটাই প্রার্থনা, সরকার যেন তার দেহটুকু অন্তত দ্রুত ভারতে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আরকে

উপরে