আপডেট : ১১ মার্চ, ২০১৬ ০৯:৪৫

পশ্চিমবঙ্গে বাম-কংগ্রেস সমঝোতায় কি চাপে তৃণমূল?

বিডিটাইমস ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে বাম-কংগ্রেস সমঝোতায় কি চাপে তৃণমূল?

ছড়া তৈরি করে রাজনৈতিক স্লোগান তৈরিতে সিদ্ধহস্ত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। এপ্রিলের গোড়া থেকে যে বিধানসভা নির্বাচনের ভোট নেওয়া শুরু হবে, তার আগে মিস ব্যানার্জীর নতুন স্লোগান হলো ‘হাত-হাতুড়ী পদ্ম বাংলার মানুষ করবে জব্দ’। হাত হলো কংগ্রেসের প্রতীক, হাতুড়ী বামপন্থীদের আর পদ্মফুল বিজেপি'র প্রতীক।

এর মধ্যে প্রথম দুটি – হাত আর হাতুড়ীর মধ্যে চির বৈরিতা থাকলেও তারা নিজেদের মধ্যে আসন ভাগাভাগি করে নিয়ে নির্বাচনে লড়বে বলে ঘোষণা করেছে। সেই মতো প্রার্থী তালিকাও ঘোষণা করা হচ্ছে পর্যায়ক্রমে, যদিও বেশ কিছু আসনের ক্ষেত্রে এখনও সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি।

বাম-কংগ্রেস সমঝোতাই যে ২০১৬ নির্বাচনের অন্যতম মূল ইস্যু হয়ে উঠেছে, তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছে, যখন মমতা ব্যানার্জী গত কয়েকদিন ধরেই এই স্লোগানটা দিচ্ছেন আর সভা-সমাবেশে বিষয়টার অবতারণা করছেন নানা ভাবে।

চির বৈরী দুই রাজনৈতিক শক্তি – বামফ্রন্ট আর কংগ্রেস যারা সবসময়ে একে অপরের বিরোধীতা করে ভোটে লড়েছে, তাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে দুজনেরই অভিন্ন প্রতিপক্ষ – তৃণমূল কংগ্রেস।

সিপিআইএম দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামল চক্রবর্তী ব্যাখ্যা করছিলেন কেন এই সমঝোতা করলেন তাঁরা।

তাঁর কথায়, “রাজ্যের ক্ষেত্রে প্রধান শত্রু হয়ে উঠেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের যে কোনও ভাবে সরাতেই হবে। সেই আবেদনই আমরা জানিয়েছি সব ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে"।

যে বামফ্রন্টের বিরোধীতা করে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে ঠিক ৫ বছর আগের বিধানসভা নির্বাচনে লড়েছিল, সেই কংগ্রেস কেন এই আসন সমঝোতা করল?

প্রদেশ কংগ্রেসের অন্যতম শীর্ষ নেতা ওমপ্রকাশ মিশ্র বলছেন “রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেও যেমন আমরা তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করতে, তেমনই শাসক হিসাবেও তাদের সরানোর দরকার আছে। ইতিহাস ঘেঁটে লাভ নেই, রাজ্যের যা বর্তমান পরিস্থিতি, তাতে সামনের দিকেই এগোতে হবে"।

"সেজন্যই কংগ্রেস আর বামফ্রন্টের মধ্যে যে চিরাচরিতভাবে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ছিল সেটা থেকে বেরিয়ে এসে ঐকবদ্ধ হয়েছি আমরা" বলছিলেন ওমপ্রকাশ মিশ্র।

বামফ্রন্টের শরিক দল আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য বলছিলেন কংগ্রেসের সম্বন্ধে বামপন্থীদের পুরনো বিশ্লেষণে কোনও বদল হয় নি, কিন্তু রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার জন্য এই নির্বাচনী কৌশল মাত্র।

যতই নিজেদের পুরনো বিশ্লেষণ আঁকড়ে থাকার কথা মুখে বলুন বামপন্থীরা, বিশ্লেষক শুভাশীষ মৈত্রের কথায় বাম আর কংগ্রেস এখন স্বাভাবিক মিত্র, চরম বৈরিতার জায়গা থেকে এই দুই শক্তি আগেই সরে এসেছে।

মি. মৈত্র বলছিলেন, “এই দুটো দলই মূলত যে রাজনীতির চর্চা করে এখন, তাতে কংগ্রেস আর বামপন্থীদের মধ্যে দু একটা জায়গা ছাড়া খুব ফারাক নেই। ভবিষ্যতেও তাদের আরও কাছাকাছি আসারই সম্ভাবনা। তাই এই জোট বা সমঝোতা, সেটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া থেকেই এসেছে। যদিও পুরণো রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে প্রকাশ্যে জোটের কথা বলা হচ্ছে না"।

তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ।

তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম বিধায়ক ও বিদায়ী বিধানসভায় মুখ্য সরকারী সচেতক শোভনদেব চ্যাটার্জীর মতে, “নীতিহীন, আদর্শ জলাঞ্জলি দেওয়া একটা জোট হয়েছে এটা। সুবিধাবাদী রাজনীতি করছে ওরা দুটো দলই।“

সি পি এম নেতা শ্যামল চক্রবর্তী অবশ্য বলছেন নীতি-আদর্শ – এসব কথা তৃণমূল কংগ্রেসের মুখে মানায় না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রজত রায় অবশ্য বলছেন, “বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের নীচুতলার কর্মী সমর্থকদের চাপেই অলিখিত জোট বা আসন সমঝোতা করতে হয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বকে। এধরণের সমঝোতার প্রয়োজন বেশ কিছুদিন আগেই বুঝেছিলেন তারা। উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের দু দুটি নির্বাচনে হাতে নাতে ফলও এনে দিয়েছিল এই সমঝোতা, তখন থেকেই কংগ্রেস বামফ্রন্টের মধ্যেকার এই সমঝোতার নাম হয়ে গেছে শিলিগুড়ি মডেল"।

বিরোধী ভোট এককাট্টা হলেই যে তারা বেশীরভাগ আসনে জিতে যাবে, এমন সরল পাটিগণিতের নিয়মে নির্বাচন চলে না। তার মধ্যে থাকে অনেক রসায়ন, বলছিলেন আর এস পি নেতা মনোজ ভট্টাচার্য।

কীভাবে কাজ করতে পারে এই রসায়ন? কী হিসেব কষছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা? জানতে চেয়েছিলাম বিশ্লেষক বিশ্বজিত ভট্টাচার্যের কাছে।

তাঁর কথায়, “২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে উত্তরবঙ্গের ছটা জেলা, মুর্শিদাবাদ আর নদীয়ার একটা অংশের কংগ্রেসের একটা ভাল ভোট রয়েছে। আর ওই একই এলাকায় বামফ্রন্টের ভোটও ভাল সংখ্যায় রয়েছে। এই দুই দলের ভোট এক জায়গায় এলে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভালই বেগ পেতে হবে ওখানে"।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদী হাওয়ার ফলে বিজেপির দিকে যে ভোট চলে গিয়েছিল, সেই একই পরিমান ভোট কমেছিল বামপন্থীদের।

তাই ওই বিজেপির ভোট বাম ভোট বলেই ধরা হয়।

এখন বিজেপির পালে সেই হাওয়া নেই, তাই ওই বাড়তি ১৩% ভোট কোথায় ফিরে আসবে, সেটা একটা বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক রজত রায়।

বাম কংগ্রেসের জোট যে চাপে ফেলবে তৃণমূল কংগ্রেসকে, সেটা মুখে স্বীকার না করলেও গুরুত্ব দিতেই হচ্ছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে। সেইজন্যই সম্ভবত তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জীকে বারে বারে বাম-কংগ্রেস সমঝোতা নিয়ে মন্তব্য করতে হচ্ছে, ভাষণ দিতে হচ্ছে।

বাম-কংগ্রেস জোট-বিরোধীতা যে শীর্ষ স্তরের নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মীদের ছোট একটা অংশের মধ্যেও রয়েছে, এটা স্বীকার করেন বাম নেতারাও।

তবে তাঁরা বলছেন, বিরোধী ভোট ভাগ হওয়া আটকাতে এই পথ নিতে তাঁরা রাজনৈতিকভাবে বাধ্য হয়েছেন।

বাম-কংগ্রেস নেতারা আরও বলছেন, এটা যদি জোটের পথে একটা কাঁটা হয়, অন্য কাঁটাটা হল কয়েকটি জায়গায় কংগ্রেস আর বামফ্রন্টের আসন সমঝোতা না হওয়া, যদিও সেটার সংখ্যা একেবারে হাতে গোনা কয়েকটা।

বামফ্রন্ট আর কংগ্রেস নেতারা অবশ্য বলছেন ছোটখাটো এইসব সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন তাঁরা। একেবারে নতুন, অচেনা পথে হাঁটতে গিয়ে সামান্য হোঁচট খেতে হতেই পারে বলে মনে করছেন দুই দলের নেতারাই।

বামফ্রন্ট আর কংগ্রেসের এই নতুন, অচেনা পথ কোন দিকে যায়, সেটাই বোঝা যাবে ভোটের ফল ঘোষণার দিন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে