আপডেট : ১ মার্চ, ২০১৬ ১১:৫৮

‘‘এটা সত্যজিৎ রায় ধরণী করে দাও’’-মমতা

বিডিটাইমস ডেস্ক
‘‘এটা সত্যজিৎ রায় ধরণী করে দাও’’-মমতা

মঞ্চে মাইক নিয়ে মেয়র বললেন, ‘‘আজই বিশেষ মেয়র পরিষদ বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, লি রোডের নাম সত্যজিৎ রায় সরণি করা হবে।’’

পাশ থেকে তাঁর নেত্রী, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ, ‘‘সরণি অনেক আছে। এটা সত্যজিৎ রায় ধরণী করে দাও।’’ তার একটু আগেই মুখ্যমন্ত্রী বক্তৃতায় জানিয়েছিলেন, ‘‘সত্যজিৎ রায়ের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়ির পাশ দিয়েই লি রোড। আমি কলকাতা পৌরসভাকে অনুরোধ করব রাস্তাটি সত্যজিৎ রায়ের নামে হোক।’’

কাজে নেমে পড়েন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায়। রাস্তার নতুন নামকরণের ফলক কোথায় বসানো হবে স্থানীয় কাউন্সিলর অসীম বসুকে নিয়ে তার জায়গা খোঁজা শুরু হয়ে যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেলে সত্যজিৎ রায়ের দক্ষিণ কলকাতার বাড়ি, বিশপ লেফ্রয় রোড ও সংলগ্ন রাস্তার সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সরণিকে ধরণী করার এই ঘটনা।

পছন্দ মতো নামকরণ ও ছন্দ মিলিয়ে বলার অভ্যাসে রীতিমতো রপ্ত মমতা। তাই সরণির বদলে ধরণী তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো খুব অস্বাভাবিক নয়। অভিধানের শব্দার্থ খোঁজা সেখানে অর্থহীন।

তবু রাস্তার নাম ‘সত্যজিৎ রায় ধরণী’ শুনে টেলিফোনে শঙ্খ ঘোষের প্রতিক্রিয়া শুধুই হাসি। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বললেন, ‘‘ধরণী শব্দটা তিনি কী ভেবে বলেছেন, আমি বুঝতে পারছি না। আপাতদৃষ্টিতে রাস্তার নামকরণের ক্ষেত্রে এ শব্দটা কোন ভাবেই খাটে না।’’ প্রথমটায় নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেননি ভাষাবিদ পবিত্র সরকারও। দ্বিতীয় বার শুনে তাঁর প্রথম মন্তব্য, ‘‘ধরণী দ্বিধা হও!’’ কেন? একটু ধাতস্থ হয়ে পবিত্রবাবু বলেন, ‘‘আমরা তো ধরণী বলতে পৃথিবী বুঝি। উনি তো লেখিকা, কথাঞ্জলি, নামাঞ্জলি কত বই আছে ওঁর লেখা। উনি নিশ্চয়ই জানেন। আমাদের জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে, তাই বুঝতে পারি না।’’

সত্যজিতের নামাঙ্কিত পথ ‘ধরণী’ হওয়ার খবরে অনেকে স্মরণ করছেন সেই সত্যজিৎকেই। তাঁদের কথায় ঘুরেফিরে আসছে ‘হীরক রাজা দেশে’-র সেই সংলাপ। ‘‘হীরক রাজের কাছে যদি ধরা হয় সরা, তবে রাত হবে দিন, এ আর এমন কী কঠিন?’’ মুখ খুলেছেন রাজনীতির লোকেরাও। কংগ্রেস নেতা মানস ভুঁইঞার বক্তব্য, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী হয়তো বলতে পারেন, সত্যজিৎ গোটা বিশ্বের কাছে সমাদৃত, তাই ‘ধরণী’! কিন্তু সত্যজিৎকে সম্মান জানাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বাংলা ভাষাকে নিয়ে যা করলেন, ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বেঁচে থাকলে আজই ভাষা-চর্চা ছেড়ে দিতেন!’’

কংগ্রেস নেতা যা বলেছেন কার্যত তেমনই ব্যাখ্যা মিলেছে এক তৃণমূল নেতার কথাতেও। মুখ্যমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের প্রশংসা করতে গিয়ে ওই নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘আমরা তো অনেক সময়েই গর্বের সঙ্গে বলি, এই পাড়াই আমার জগৎ। অথবা, আমার দেশই আমার পৃথিবী। যেমন কখনও আমরা বলি রবীন্দ্র-বিশ্ব বা আইনস্টাইন-বিশ্ব। মনে রাখতে হবে, আমাদের সত্যজিৎ রায় বিশ্বের গর্ব। তাই তাঁর সেই বিশ্বজনীনতা তুলে ধরার জন্যই ‘ধরণী’ শব্দ বেছে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।’’

রাস্তার নামকরণ সংক্রান্ত কমিটি রয়েছে কলকাতা পুরসভায়। কোনও রাস্তার নামকরণ করতে হলে তা সেই কমিটির কাছে যায়। এ ক্ষেত্রে তা হয়েছিল কি? মেয়র শোভনবাবু বলেন, ‘‘অনেক সময়ে পরিবেশ-পরিস্থিতি বলে একটা ব্যাপার থাকে। মাহেন্দ্রক্ষণ বলেও একটা কথা আছে। কমিটির ব্যাপারগুলো আমরা দেখে নেব।’’

বিশপ লেফ্রয় রোডের দুপাশের ফুটপাথ পেভার ব্লকে মোড়া হয়েছে। দু’ধারে ২২টি রঙিন স্তম্ভ। কোথাও লন্ডনের বাতিস্তম্ভের অনুকরণে তৈরি আলো। আর তারই মাঝে সত্যজিৎ রায়ের নানা সিনেমার পোস্টার। এ দিনের অনুষ্ঠানে সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায় বলেন,  ‘‘এই রাস্তার রূপ এমন হবে, কোনও দিন ভাবিনি।’’ সত্যজিৎ রায়ের একাধিক ছবির নায়িকা মাধবী চক্রবর্তীর অনুভূতি, ‘‘আগে এ সব হয়নি। অনেক শিল্পী বিখ্যাত ছিলেন। কিন্তু কেউই তাঁদের সম্মানিত করেনি। মমতা করে দেখালেন।’’

সূত্র: আনন্দবাজার

উপরে