আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২২:১০

মৃত সহযাত্রীদের মাংস খেয়ে বেঁচে ছিলেন ২ মাস!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মৃত সহযাত্রীদের মাংস খেয়ে বেঁচে ছিলেন ২ মাস!

মৃত সহযাত্রীদের মাংস খেয়ে দুই মাস বেঁচে ছিলেন ২৭ জন বিমান যাত্রী। ১৯৭২ সালে আন্দিজ পর্বতের বুকে আছড়ে পড়ে একটি বিমান। তাতে বেশ কিছু বিমানযাত্রী মারা যান। কিন্তু ভাগ্যজোরে যারা বেঁচে গিয়েছিলেন তারা প্রায় ২ মাস আটকে ছিলেন হিমশীতল আন্দিজ পাহাড়ের খাঁজেই। খাবারহীন, পানিহীন অবস্থায় ২৭ জন মানুষ দুই মাস কীভাবে সেখানে বেঁচে ছিলেন?

রবার্ট কানেসা সেই বিমানের এক বেঁচে ফেরা যাত্রী। দীর্ঘ দুই মাস তিনি বেঁচে থাকার সেই অমানুষিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন। পেশায় চিকিৎসক রবার্ট তার সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ‘আই হ্যাড টু রেসকিউ: হাউ প্লেন ক্রাশ ইন দ্য আন্দিজ ইন্সপায়ার্ড মাই কলিং টু সেভ লাইফ’। আগামী ৩ মার্চ প্রকাশ হবে বইটি।

রবার্ট জানান, ১৯৭২ সালের ১৩ অক্টোবর রাগবি খেলার জন্য চিলি যাচ্ছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলো আরো বন্ধুবান্ধব। গান-গল্প আর হইহুল্লোড় করে ভালই সময় কাটছিলো। বিমানের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলেন রবার্ট। তার মনে হচ্ছিলো, কিছু একটা হতে চলেছে। রবার্টের কথায়, ‘বুঝতে পারছিলাম আমরা অনেকটাই নিচ দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ মনে হলো, বিমানের ডানা দুটো যেন বরফে ঢাকা আন্দিজের চুড়ার খুব কাছে!’

তিনি বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম, খারাপ আবহাওয়া। কিন্তু হঠাৎ একটা ভয়াবহ শব্দ করে বিমানটা আন্দিজ পর্বতের উপর ভেঙে পড়লো। ধাতব কিছু একটা উপর থেকে প্রচণ্ড শব্দ করে ঘুরতে ঘুরতে নিচে নেমে এলে যেমন হয়, ঠিক তেমনই মনে হচ্ছিলো। যেন ভয়াবহ একটা ঘূর্ণিঝড়ের মুখে হঠাৎ এসে পড়েছে। পাহাড়ের ঢাল ধরে বিমানটা স্লেজগাড়ির মতো নেমে আসছিলো। মাথা ঘুরছিলো, আমি অপেক্ষা করছিলাম ভয়ঙ্কর সেই ঘটনার জন্য। কিন্তু না! সেটা হতে গিয়েও হলো না। বরং যেটা হলো সেটা আরো ভয়াবহ।’

‘প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে পর পর সব কয়টা আসন যাত্রীদের নিয়েই উপড়ে আসতে লাগল সামনের দিকে। সব যখন শান্ত হলো, তখনো বুঝিনি আদৌ বেঁচে আছি কিনা! সহযাত্রীদের কান্না আর আর্তনাদে আশেপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে। বিমানের অধিকাংশ অংশই ভেঙে পড়েছে। বরফে সাদা পাহাড়ের অংশ দিব্যি দেখা যাচ্ছে আশেপাশে। হিম ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ধাক্কা দিচ্ছে। বাইরে তখন তাপমাত্রা মাইনাস ১০ ডিগ্রির নিচে। আর বিমানের ভিতরে তাপমাত্রা প্রায় ৭৫ ডিগ্রি। রাত বাড়লো। চারপাশে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। এত বড় দুর্ঘটনার পরেও দেহের কোথাও চোট পাইনি!”

সে সময় উরুগুয়ের মন্টেভিডিও মেডিকেল কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন রবার্ট। লরি সারেক্কো নামে একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম ছিলো তার। রবার্টের কথায়, ‘এর আগে আমাদের জীবন খুব সাধারণ ছিলো। আর পাঁচ জনের মতোই একটা কিছু হয়ে ওঠার চেষ্টায়, সাধারণ জীবনযাপন। ওই মুহূর্তটায় প্রথম বুঝলাম, বেঁচে থাকার তীব্র টান আসলে কাকে বলে। যেন ওই রাতটাই আমাদের জীবনের শেষ রাত। দুঃস্বপ্নের ভেতর যেন জেগে রয়েছি বাস্তবটাকে জানব বলে।’

তিনি বলেন, ‘বিমান থেকে তার ছিঁড়ে ঝুলছে। দুর্ঘটনায় কেউ মারা গিয়েছে, কেউ গুরুতর আহত, কেউ বা কোমায়। খুব সামান্য কিছু খাবার ভাগ করে নিয়েছিলেন ওই ২৭ সহযাত্রী। ক্রমশ খাবার ফুরিয়ে এালো। দিনের পর দিন কোনো সাহায্যও আসেনি। মনে হচ্ছিলো আমরা যেন অন্য কোনো ভিনগ্রহের প্রাণি। তখন একটাই উদ্দেশ্য যে কোনোভাবে বেঁচে থাকা। কিন্তু আমাদের খাবার ততদিনে প্রায় শূন্য। পাহাড়ের ওই উচ্চতায় কোনো গাছ বাঁচে না।’

তিনি জানান, বাঁচার জন্য স্বভাবের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে ওই ২৭ জনের। খিদের মুখে বরফের মধ্যে পড়ে থাকা বন্ধুদের মৃতদেহ থেকে খাবলে নেওয়া মাংস একটা ধাতব পাতে রেখে ঝলসে খেয়ে বেঁচেছিলেন কয়েকজন। শুধু বেঁচে থাকার তাড়নায় সব রকম সংস্কার-কুসংস্কারের বেড়াজাল টপকে গিয়েছিলো সবাই। তিনি বলেন, ‘সে সময় এমন কাজ করেছি, যা হয়তো মানুষের পক্ষে দুঃসহ।’

অবশেষে ৮ ডিসেম্বর, উদ্ধারকারী দল এসে পৌঁছায় ঘটনাস্থলে। রবার্টদের জীবিত অবস্থায় পাওয়া যাবে, তা হয়তো ভাবেননি কেউই। কিন্তু ভাগ্যজোরে বেঁচে যান ২৭ জন বিমানযাত্রী।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে