আপডেট : ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২১:১৯

জঙ্গিবাদের বিস্তৃতিতে কাজ করে পাকিস্তান

কারলোটা গল, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর উত্তর আফ্রিকা প্রতিনিধি
জঙ্গিবাদের বিস্তৃতিতে কাজ করে পাকিস্তান
কারলোটা গল

পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে কয়েক মাসের মধ্যে শান্তি আলোচনা সাফল্যের মুখ না দেখলে আফগানিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে ২০১৬ সালটা টিকে থাকবে না কি না সন্দেহ আছে। আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি সম্প্রতি একাধিক সাক্ষাৎকারে এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন আফগানিস্তানের পায়ের তলায় আজ মাটি নেই। বিশেষজ্ঞদের হাতেও পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, যার ভিত্তিতে বলা যায় পাকিস্তানই আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানকে বলে আসছে, তালেবানকে বলো তারা যেন শান্তির পথে হাঁটে। তবে আফগানিস্তানের ভাষ্য, তালেবানকে বাগে আনার লক্ষ্যে পাকিস্তান কার্যত কিছুই করেনি—ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি থেকে কোনো ফায়দা হাসিল করা যায় কি না, এ নিয়েই ইসলামাবাদের যত আগ্রহ।

শুধু আফগানিস্তান নয়, বেশ কিছু আন্তর্জাতিক বিরোধেই পাকিস্তান হাওয়া দিচ্ছে। দেশটির গোয়েন্দা বাহিনী অনেক আন্তর্জাতিক মুজাহিদিন গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছে। এই জিহাদিদের বেশির ভাগই সুন্নি চরমপন্থী। এ সন্দেহও আছে যে ইসলামিক স্টেটের উত্থানের পেছনেও পাকিস্তানের হাত রয়েছে।

তালেবানের সর্বশেষ প্রত্যাঘাত শুরু হয় ২০১৪ সালে। অনেক বছরের টালবাহানার পর পাকিস্তান জানিয়েছিল তারা তাদের দেশের উপজাতি অধ্যুষিত উত্তর ওয়াজিরিস্তানকে তালেবান ও আল-কায়েদা জঙ্গিদের হাত থেকে মুক্ত করবে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বলে, তাহলে আমরাও ধীরে ধীরে আফগানিস্তান থেকে সরে আসব। কিন্তু জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে দেখা গেল কারা যেন জঙ্গিদের আগেভাগেই খবর দিয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘাঁটি যদিও ধ্বংস হয়, জঙ্গিরা পালিয়ে যাওয়ার মওকা পায় এবং তাদের অনেকেই ঢুকে পড়ে আফগানিস্তানে। পাকতিয়া প্রদেশের কাছে জঙ্গিরা সিআইএর পরিত্যক্ত ঘাঁটি ও ফাঁড়িগুলোও দখল করে নেয়। এর পর থেকে পাকতিয়ায় আত্মঘাতী হামলার ঘটনাও নৈমিত্তিক হয়ে যায়। এদিকে পাকিস্তানে তালেবানের সবচেয়ে সক্রিয় শাখা হাক্কানি নেটওয়ার্কও উত্তর ওয়াজিরিস্তান থেকে পালিয়ে পাশের কুররাম জেলায় ঢুকে পড়ে। নতুন স্বর্গরাজ্য গড়ে তারা সেখান থেকে মার্কিন, আফগান ও আন্তর্জাতিক টার্গেটে হামলা চালাচ্ছে।

পাকিস্তান মনে করে আফগানিস্তান তাদের বাড়ির পেছনের উঠান। সেই আঙিনায় যাতে ভারত কোনো প্রভাব না ছড়াতে পারে, ক্ষমতার দণ্ডটা যাতে সুন্নিদের হাতেই থাকে সে জন্যই তালেবানকে ব্যবহার করা। তালেবানের আদর্শ সমর্থন যারা করে তাদের গোপনে সমর্থন ও সহায়তাদান এবং সুন্নিবিরোধী মহলকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, এই হচ্ছে পাকিস্তানের নীতি। তবে পাকিস্তানের ভেতরও যে সশস্ত্র জঙ্গিবাদ প্রকাশ্যেই রয়েছে—এও কম বিস্ময়কর নয়।

হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা এবং তালেবানের সেকেন্ড ইন কমান্ড সিরাজুদ্দিন হাক্কানি পাকিস্তানে প্রকাশ্যেই চলাফেরা করেন। রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের আফগানবিষয়ক গোয়েন্দা সদর দপ্তর পর্যন্ত তিনি পরিদর্শন করেছেন। তালেবানের নতুন নেতা মোল্লাহ আখতার মোহাম্মদ মানসুর পাকিস্তানি শহর কোয়েটার কাছে প্রকাশ্যেই তাঁর সামরিক ও সাংগঠনিক সম্মেলন করেছেন। গত বছর তিনি তালেবানের দায়িত্ব নেওয়ার পরই সংগঠনটি আফগানিস্তানে বড় মাপের অনেক হামলা চালায়, উত্তরাঞ্চলীয় কুন্দুজ শহর পুনর্দখল করে নেয় এবং আফিমসমৃদ্ধ প্রদেশ হেলমান্দে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় অনেক দূর এগিয়ে যায়। পাকিস্তান আল-কায়েদা নেতা আয়মান আল জাওয়াহিরির জন্যও এখন অভয়ারণ্য। কিছুদিন আগেও তাঁকে বেলুচিস্তানের এক এলাকায় দেখা যাওয়ার কথা জানা যায়। জাওয়াহিরি করাচি, ভারতসহ আরো কিছু স্থানে ব্লগারসহ মুক্তচিন্তার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানোর দায়িত্বও স্বীকার করেছেন।

পাকিস্তান তালেবান ও আল-কায়েদাকে পৃষ্ঠপোষকতা দানের অভিযোগ অস্বীকার করে বলে থাকে তারা নিজেরাও সন্ত্রাসবাদের শিকার। তবে অনেক বিশ্লেষক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বলছেন, পাকিস্তান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করার জন্য ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে লালন করছে। তার চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, ইসলামিক স্টেট জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানের পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে।

উত্তর ওয়াজিরিস্তানে পাকিস্তানের অভিযানের আগেভাগেই কয়েক শ জঙ্গি পালিয়ে গিয়ে সিরিয়ার বাশার আল আসাদবিরোধী বাহিনীতে যোগ দেয়। স্থানীয় উপজাতি নেতা ও তালেবান সদস্যরা বলছে, এই জঙ্গিরা কোয়েটা হয়ে বিমানে কাতার পৌঁছে। তারপর নতুন পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে তারা ঢুকে পড়ে সিরিয়ায়। ইরান ও ইরাকের চোরাকারবারিদের পথ ব্যবহার করেও অনেকে সিরিয়ায় পৌঁছে। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে ইরাকে আইএসের হামলা এবং ‘ইসলামিক স্টেট’ গঠনের সময়টাতেই তারা গিয়ে হাজির হয় এবং জঙ্গি অভিযান জোরদার করায় অবদান রাখে।

পাকিস্তানের একজন রাজনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমাকে বলেছেন, ওয়াজিরিস্তানে থাকার প্রয়োজন মনে করছে না বলেই জঙ্গিরা সিরিয়ায় পাড়ি দিচ্ছে।

আসলে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এমনটি চলছে। ১৯৯০ সালে আমি চীনের উইগুরের একদল মুসলমান তরুণের সঙ্গে বাস ভ্রমণ করেছিলাম। তাদের হাতে ছিল নতুন পাকিস্তানি পাসপোর্ট, যা জঙ্গিবাদে যোগ দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। ২০১২ সালে কয়েকটি ঘটনায় জানতে পারি, পাকিস্তানের হাক্কানিয়া মাদ্রাসা থেকে স্নাতক বেশ কিছু তরুণ আফগানিস্তানে ফিরে যাচ্ছে। তাদের হাতে অর্থ, মগজে তালেবান তৈরির প্রতিজ্ঞা। পরের বছর ওই মাদ্রাসায় গিয়ে জানি, তালেবানের অনেক নেতাই এখানকার শিক্ষার্থী ছিলেন। মাদ্রাসার মুখপাত্র ইউসুফ শাহ আমাকে বলেন, ‘তালেবান একদিন ক্ষমতায় যাবে, এটা রাজনৈতিক সত্য। আফগানিস্তানের বেশির ভাগ মানুষ তালেবানের সমর্থক—তিনি এ দাবিও করেন।

এই মাদ্রাসা আফগানিস্তানের জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা বাহিনীও মাদ্রাসাটির পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। আফগানিস্তানই শুধু নয়, চীনের উইগুরসহ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু দেশের মুসলমানকেও পাকিস্তান জঙ্গিবাদের দীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। যেহেতু অদ্যাবধি কেউ পাকিস্তানকে এই আচরণের জন্য দায়ী করেনি—তারা তা বন্ধ করতেই বা যাবে কেন!

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

উপরে