আপডেট : ১১ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৭:১০

চিনে নিন, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক ব্যাক্তিটিকে!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চিনে নিন, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপদজনক ব্যাক্তিটিকে!

মাত্র ১২ বছর বয়সেই মোহম্মদ বিন সালমান তার বাবা সালমানের পাশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ন বৈঠকে বসতে শুরু করেছিলেন, পরবর্তীতে মোহম্মদ রিয়াদ প্রদেশের গভর্নর হয়েছিলেন।

১৭ বছর পর যখন তার বয়স ২৯, ততদিনে সে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। এসময়েই তিনি তার দেশকে ইয়েমেনে এক রক্তাক্ত ও নির্মম যুদ্ধে জড়ালেন। আপাদত সে যুদ্ধের কোন শেষ দেখা যাচ্ছেনা।

এ মহুর্তে সৌদি আরব তার আঞ্চলিক শত্রু ইরানের সঙ্গে চুড়ান্ত বিবাদে জড়ালো। আর এ বিবাদ যার নেতৃত্বে, বুঝাই যাচ্ছে মধ্য প্রাচ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতা হতে তার খুব তাড়া!

যুবরাজ মোহাম্মদের কিশোর বয়সেই শেয়ার বাজার এবং প্রপার্টি ব্যাবসায় হাতেখড়ি হয়। সেসময় তার দু একটি ভুল ভ্রান্তি তার বাবাই সামলিয়ে নিতেন। তার সৎ বড় ভাইদের মতো তিনি বিদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাননি। তিনি রিয়াদেই থেকে যেতে মনস্থির করেছিলেন এবং সেখানকার কিং সাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কর্তৃপক্ষ তাকে একজন উদ্যমি যুবক হিসেবেই বিবেচনা করতো, যে কিনা কখনো ধূমপান কিংবা মদ্যপান করেনা, যার নেই কোন পার্টিতে যাওয়ার বদভ্যাস।

২০১১ সালে তার বাবা ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সের মর্যাদা পান এবং পুরষ্কার হিসেবে পান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। যে মন্ত্রণালয় দেশটির সবচেয়ে বেশি বাজেটের এবং লাভজনক অস্ত্রচুক্তির। একবছর পরই ২০১২ সালে মোহম্মদ বিন রাজকীয় দরবারে সদর্পে আনাগোনা শুরু করেন তার বাবার সহকারী হিসেবে যেসময় তার বাবার উপাধী থেকে ডেপুটি শব্দটুকু চলে যায়।

প্রতিটা পদক্ষেপেই যুবরাজ মোহাম্মদ তার বাবার সঙ্গেই ছিলেন। তার বাবাও অনুগত পুত্রকে গোলাপের মতো ঠাঁই দেন হাউজ অব সাদে। সৌদি ধর্মীয় এবং ব্যাবসায়িক অভিজাতরা এটা খুব ভালো করেই বুঝে গিয়েছিলো যে, বাবার সঙ্গে দেখা করতে হলে পুত্রই একমাত্র দরজা।

সমালোচকরা বলেন, মোহম্মদ এসময় তার বিশাল আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু আসলে এটা টাকা নয়, ক্ষমতা!

২০১৫ সালে সালমান যখন সৌদি সিংহাসনে বসেন সেসময় তিনি তার পুত্র মোহাম্মদের প্রতি আরো বেশী নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ৭৯ বছর বয়সে বাদশা তখন স্মৃতিভ্রমজনিত রোগে আক্রান্ত এবং সারাদিনে অল্পকিছু সময় তিনি মনোযোগ দিতে পারতেন। বাবার দরজা রক্ষক হিসেবে মোহাম্মদ সে সময়েই সৌদি সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজপুরুষে আবির্ভূত হন।

সালমানের প্রথম কয়েকমাসের শাসনামলে নাটকীয়ভাবে মোহাম্মদের ক্ষমতা ও শক্তি লাভ হয়। সে সময়েই তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। ন্যাশনাল এনার্জি কোম্পানী এ্যারামকো’র দায়িত্ব পান তিনি। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অর্থনীতি এবং উন্নয়ন সম্পর্কীত নতুন কমিটির প্রধানেরও দায়িত্ব পান। এছাড়াও, দেশটির জনবিনিয়োগ তহবিলেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। সেসময়ে মোহাম্মদ ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সের দায়িত্ব পালন করলেও তার প্রতিদ্বন্দী ক্রাউন প্রিন্স ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহম্মদ বিন নায়েফের উপর দিয়েই কতৃত্ব ফলাতে থাকেন।

আমলাতান্ত্রিক চাঞ্চল্যের মধ্যেই মোহাম্মদ খুব দ্রুত নিজেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যান।

অল্প বয়সেই বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দর্শন তাকে দেশটির জীবন্ত কিংবদন্তীতে রূপান্তরীত করেছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন তিনি।

তার সম্পর্কে বলতে গিয়ে এক ব্যাবসায়ী বলেন, “তরুণদের মধ্যে সে খুব জনপ্রিয়। সে কঠোর পরিশ্রম করে, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণদের কাছে তিনি অনেক খোলামেলা এবং তরুণদের ব্যাপারটাও তিনি বোঝেন।”

জানা যায়, দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ’র বয়সই ৩০ বছরের নিচে যদিও বেকারত্বের পরিমান সেখানে দিনে দিনেই বাড়ছে। মতান্তরে তা ২০-৩০ শতাংশ।

দেশটির অর্থনীতির পুনর্গঠন নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা সত্ত্বেও মোহম্মদ বিন এরই মাঝে পার্শ্ববর্তী ইয়েমেনে এক রক্তাক্ত লড়াইয়েও সৌদি আরবকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

সম্প্রতি তিনি তার দেশের সেনাবাহিনীকে দিয়ে ইয়েমেনে অবস্থান করা হুতি সম্প্রদায়ের জঙ্গিদের ওপর বিমান হামলা চালিয়েছেন দেশটির সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্ট মনসুর আল হাদিকে সহায়তা করার জন্য। বলা যায়, যুদ্ধের উত্তাপ থেকে সৌদি আরব কয়েক দশকের সতর্ক অবস্থান থেকে সরে এসেছে মোহাম্মদ হাত ধরে।

আপত দৃষ্টিতে এটাকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলেই মনে হচ্ছে যে, একজন বয়ষ্ক বাদশাহর তরুণ উচ্চাকাঙ্খী ছেলে সমস্যাগ্রস্থ দক্ষিণের প্রতিবেশী দেশে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়ছে। অবশ্য ইয়েমেনে হুতিদের জঙ্গিপনা শিয়া রাষ্ট্র ইরানের সমর্থন পুষ্ট। সৌদি সেনাবাহিনী কয়েক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রসজ্জিত হয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে।

মোহাম্মদ তার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং তার সমর্থকদের কাছে প্রমান করতে চেয়েছিলেন তার সাহস ও শক্তিমত্তা। তার সেই পরিকল্পনা খুব দ্রুতই সাফল্য পেয়েছে। একজন সেনা অধিনায়ক হিসেবে সাফল্য তাকে তার পিতামহ যুদ্ধবাজ বাদশা ও আধুনিক সৌদি আরবের জনক ইবনে সাদ-এর জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।

সৌদি রাজতন্ত্রের শত্রু আল-কায়েদার সঙ্গে হুতিদেরও বিরোধপূর্ন সম্পর্ককে মোহম্মদ আমলে নিচ্ছেন না। বরং আমলে নিচ্ছেন যা, তা হলো- ২০০৯ সালে এই হুতিরাই সৌদি সীমান্তে দেশটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছিলো এবং জিজানে অবস্থিত সৌদি ‘রেড সি পোর্ট’ দখল করে নিয়েছিলো, যা ৭০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিলো।

হুতিদের ওপর অবিরাম বোমা বর্ষনে ইয়েমেনের অনেক গুরুত্বপূর্ন অবকাঠামো ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে যখন হুতিরা রাজধানী সানা এবং দেশটির উত্তরাঞ্চল দখল করে ছিলো। দক্ষিণে অবশ্য আল-কায়েদার মুক্তভূমি। তবে এই মহুর্তে হুতিদের কব্জা করতে অব্যাহতভাবে বোমা বর্ষণের মনস্থির করেছেন মোহম্মদ।

সন্ত্রাসবাদ নির্মুল করতে গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে মোহম্মদ যখন ৩৪ রাষ্ট্রের একটি সংগঠনের ঘোষণা দিলেন তখনে ইরানের বিষয়টি তার মনে ভালো করেই ছিলো। ইরান অবরুদ্ধ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং হিজবুল্লাহ গেরিলাদের অস্ত্রসহ জোড়ালো সমর্থন দিচ্ছে।

মোহাম্মদ সৌদি আরব সিরিয়ায় যে কোন শান্তি আলোচনার আগে বাশারের পতন চায়।

 

টাইমস অব ইন্ডিয়া’ থেকে অনুবাদ।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/পিএম

উপরে