আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১৮:৪৩

বিশ্ব মানচিত্রে ২০১৫; সম্ভাবনা আর শঙ্কার পাদটিকা

অনলাইন ডেস্ক
বিশ্ব মানচিত্রে ২০১৫; সম্ভাবনা আর শঙ্কার পাদটিকা

অনেক আশা-আকাঙ্খা, শঙ্কা নিয়েও শুরু হয় নতুন একটি বছর। ২০১৫ সালের শুরুটাও ছিলো এমনই। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৮তম সম্মেলনে সালটিকে আন্তর্জাতিক আলো ও মৃত্তিকা বছর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিলো।

বলা যায়, বছরটিকে ঘিরে আশঙ্কা নয় বরং আকাঙ্খার পাল্লাটাই ছিলো ভারি। সে আকাঙ্খার কতটুকু পূরণ হয়েছে; তা বিচারের ভার পাঠকের উপরই।

সে বিচারের না জড়িয়ে চলুন আমরা বছরজুড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর দিকে একবার চোখ বুলাই।

আইএসর উত্থান:

১৯৯৯ সালে জামাত আল তাওহিদ ওয়াল জিহাদ নামে আইএস’র প্রথম যাত্রা শুরু হয়েছিলো যারা ২০০৪ সালে আল-কায়েদার সংস্পর্শে আসে। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে তারা সর্বপ্রথম ইরাকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ধারণাটির সূত্রপাত করে।

২০১৫ সাল জুড়েই আলোচনায় ছিল সিরিয়া ও ইরাকভিত্তিক উগ্র ইসলামিপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) । বিশ্বের পরশক্তি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে এবং বিভিন্ন দেশে গোষ্ঠীটির মদদে সংঘটিত বিভিন্ন জঙ্গি হামলার ঘটনাও তাদের আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছিল।

নাইজেরিয়ার জঙ্গিগোষ্ঠী বোকো হারাম, লিবিয়া ও সিনাইয়ের জঙ্গিগোষ্ঠী ছাড়াও বেশ কয়েকটি জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। এই বছরটিতেই আইএস তার লড়াই নিজস্ব গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়। তারমধ্যে ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একইসঙ্গে চার জায়গায় হামলা চালিয়ে ১৩০ জনকে হত্যা করার ঘটনাটি সবচেয়ে আলোচিত।

এছাড়া ১২ নভেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আইএসের বেশ কয়েকটি আত্মঘাতী হামলায় ৪৩ জন নিহত ও ২৩৯ জন আহত হন। জুলাইয়ে আইএসের একজন অনুগত জঙ্গি তুরস্কের সুরুকে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৩৩ জনকে হত্যা করে। এর তিনমাস পর গোষ্ঠীটির অনুগত আরো দুই জঙ্গির জোড়া আত্মঘাতী বোমা হামলায় দেশটির রাজধানী আঙ্কারার এক শান্তি সমাবেশে ১০২ জন নিহত ও ৪০০ জন আহত হন।

৩১ অক্টোবর মিশরের সিনাইয়ে রাশিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২২৪ আরোহীর সবাই নিহত হন। তাদের পেতে রাখা বোমায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয় বলে দাবি করে আইএস।

বছরের শেষদিকে ২ ডিসেম্বর আইএসের আনুগত্য স্বীকার করা যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক পাকিস্তানি দম্পতির গুলিতে ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্দিনোতে ১৪ জন নিহত হন।

এছাড়া তিউনিসিয়ার সুসেতে আইএসের অনুগত এক আত্মঘাতীর বেপরোয়া গুলির্বষণে ৪০ জন নিহত, কুয়েতে, সৌদি আরব ও ইয়েমেনে শিয়া মসজিদে গোষ্ঠীটির আত্মঘাতী বোমা হামলায় আরও অন্ততপক্ষে শতাধিক মানুষ নিহত হন।

বছরের প্রথম উল্লেখযোগ্য জঙ্গি হামলা হয়েছিল শার্লি এবদু নামে প্যারিসের একটি বিদ্রুপ সাময়িকীর দপ্তরে। নিজেদের আল কায়েদার সদস্য পরিচয় দেওয়া দুইভাই এই পত্রিকা দপ্তরে হামলা চালানোর পর একটি ইহুদি বিপণীবিতানে হামলা চালিয়ে ১৭ জনকে হত্যা করা হয়।

মে মাসে সিরিয়ার ঐতিহ্যবাহী নগর পালমিরার দখল নেয় ইসলামিক স্টেট (আইএস) । ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এই নগরীতে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি সেখানকার ঐতিহাসিক অনেক স্থাপনা পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস করে ফেলে। বিশেষ করে দুইহাজার বছরের পুরনো বেল মন্দিরটি তারা বিস্ফোরক দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়।

আরবের বসন্ত সুদূরপরাহত:

আরবের বসন্ত এখনো আসেনি। সমগ্র আরব ভূখন্ড একধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়েই চলমান বছরটি পার করেছে। এ অঞ্চলের সিরিয়া ও ইরাকে গৃহযুদ্ধ চলমান থাকলেও এ বছর নতুন করে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইয়েমেন। এতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শিয়া শক্তি ইরান ও সুন্নি সৌদি আরবের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেকাংশেই প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।

ইয়েমেনের ইরানপন্থি ‘হুথি’ বিদ্রোহীরা দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ’র অনুগত সেনাদের সহায়তায় সুন্নি প্রেসিডেন্ট মনসুর হাদিকে বিতাড়িত করে রাজধানী সানাসহ দেশটির অধিকাংশ স্থান দখল করে নেয়। পরে হুতি ও তাদের মিত্র সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট।

ইয়েমেনের নয়মাসের লড়াইয়ে প্রায় ছয় হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। নিহতদের মধ্যে ছয়শরও বেশি শিশু রয়েছে।

এ বছর রাশিয়া প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষ হয়ে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের উপর বিমান হামলা শুরু করলে দেশটির গৃহযুদ্ধ এক নতুন পর্বে প্রবেশ করে।

রুশ বিমান হামলা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সমালোচনার মধ্যেই সিরিয়ার তুর্কি সীমান্তের কাছে একটি রুশ বোমারু বিমানকে গুলি চালিয়ে ভূপাতিত করে তুর্কি জঙ্গি বিমান। এতে ন্যাটোভুক্ত তুরস্কের সঙ্গে রাশিয়ার প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। তুরস্কের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করে রাশিয়া।

অন্যদিকে রুশ বিমান হামলায় আইএসের অবস্থান অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করে।

এ বছরটিও ইসরায়েলের দখলকৃত পশ্চিমতীর ও জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘাত ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার হয়।

বছরের শেষ দিকে ওই দুটি এলাকায় ইসরায়েলিদের ওপর ফিলিস্তিনিদের ছুরি নিয়ে হামলায় সহিংসতার একটি নতুন পর্ব শুরু হয়। এর প্রতিক্রিয়ার ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অনেক ফিলিস্তিনি নিহত হন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনি ছুরি হামলায় অনেক ইসরায়েলিও নিহত হন।

শরণার্থী সঙ্কটে ইউরোপ:

মধ্যপ্রাচ্যের অশান্তির ঢেউ ভূমধ্যসাগরের পেরিয়ে আঘাত হেনেছে ইউরোপেও। শরণার্থী ইউরোপের নতুন একটি সঙ্কটের নাম।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে ও অন্যান্য অঞ্চলের সহিংসতা থেকে বাঁচতে লাখ লাখ বেপরোয়া শরণার্থী বিপদসঙ্কুল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে গিয়ে হাজির হয়। ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনমানের আশায় অন্যান্য দেশ থেকে আসা শরণার্থীরাও এদের সঙ্গে যুক্ত হন।

সারা বছর ধরে চলা শরণার্থীর স্রোত বছরের শেষ দিকে ১০ লাখের কোটা অতিক্রম করে। সমুদ্রপথে শরণার্থীবাহী নৌকাডুবিতে অনেক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশই ইউরোপে পৌঁছতে সমর্থ হয়। শরণার্থীদের চাপে ইউরোপের দুর্বল সীমান্ত ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় আর এরমধ্যদিয়ে ইউরোপের জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসীবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, যতদিন সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলবে আর ইউরোপের অর্থনীতি বেকারদের আকর্ষণ করবে ততদিন ইউরোপকে শরণার্থীর চাপ বহন করে যেতে হবে।

ইরানের পরমাণু চুক্তি:

প্রায় দুই বছর ধরে আলোচনার পর গত জুলাইয়ে পি৫+১ দেশ হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এবং ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত পরমাণু চুক্তি সই হয়।

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী অন্ততপক্ষে দশ বছরের জন্য ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ কমিয়ে আনবে। বিনিময়ে ধীরে ধীরে দেশটির উপর থেকে পরমাণু সংশ্লিষ্ট সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা, আটকে থাকা দেশটির তেল বাণিজ্যের শত শত কোটি ডলার ছাড় ও নিষেধাজ্ঞার কারণে জব্দ হয়ে থাকা অন্যান্য সম্পদ মুক্ত করার কথা রয়েছে। এসব নিষেধাজ্ঞার কোনো কোনোটি ৩৫ বছর ধরে বলবৎ ছিল।

চুক্তি অনুযায়ী বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ২৭ ডিসেম্বর ইরান ১১ টনেরও বেশি ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় পাঠিয়েছে।

মিয়ানমারে নির্বাচন:

মিয়ানমারের নির্বাচনে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমক্রেসি (এনএলডি) জয়ী হয়েছে। দেশটিতে কয়েক দশকের সেনাশাসন শেষে ২৫ বছরের মধ্যে এই নির্বাচনকেই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কঠোর নির্বাচনী নিয়মে দেশটির এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশি-বিদেশি ১০ হাজারেরও বেশি পর্যবেক্ষক এই নির্বাচন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

কানাডার নির্বাচন:

কানাডার পার্লামেন্ট নির্বাচনে জাস্টিন ত্রুদোর নেতৃত্বাধীন লিবারেল পার্টি জয় লাভ করেছে। পার্লামেন্টে তৃতীয় অবস্থানে থেকে প্রচারণা শুরু করে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়। এর মধ্যদিয়ে দেশটিতে কনজারভেটিভদের প্রায় এক দশকের শাসনের অবসান হয়। ৪৩ বছর বয়সী ত্রুদো দেশটির প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ত্রুদোর ছেলে।

পিয়েরে ত্রুদোকে আধুনিক কানাডার জনক হিসেবে মান্য করা হয়। পার্লামেন্টে তৃতীয় স্থানে থাকা কোনো দল পরের নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় অর্জন করার ঘটনা দেশটির ইতিহাসে এবারই প্রথম। কানাডার পার্লামেন্টে মোট আসন ৩৩৮টি।

জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এই আসনের আইন প্রণেতারা নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে পার্লামেন্টের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী।

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপাল:

গত ২৫ এপ্রিল ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় নেপাল। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর পোখারা থেকে ৫০ মাইল পূর্বে ভূপৃষ্ঠের মাত্র ২ কিলোমিটার গভীরে ছিল এই ভূমিকম্পের কেন্দ্র। ভূমিকম্পে নেপালে ৮ হাজার ৮৫৭ জন, প্রতিবেশী ভারতে ১৩০ জন, চীনে ২৭ জন এবং বাংলাদেশে ৪ জনসহ মোট ৯ হাজার ১৮ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় ১৬ হাজারের বেশি মানুষ।

এরপর ১২ মে ৭ দশমিক ৩ মাত্রার আরেকটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয় দেশটিতে। এতে নেপালে আরো ১৫৩ জন, ভারতে ৬২ জন, বাংলাদেশে ২ জন ও চীনে ১ জনসহ মোট ২১৮ জন নিহত হন।

১৯৩৪ সালের পর এ দুটোই ছিল নেপালে আঘাত হানা সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূমিকম্প। ভূমিকম্পে হিমালয় পর্বতের একটি এলাকা আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে যায়।

এছাড়া গত ২৬ অক্টোবর হিন্দুকুশ পর্বতমালা এলাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এক ভূমিকম্প হয়। এতে পাকিস্তানে ২৭৯ জন, আফগানিস্তানে ১১৫ জন এবং ভারতে ৪ জনসহ মোট ৩৯৮ জন নিহত হন।

ঘূর্ণিঝড় প্যাট্রিসিয়া:

২৩ অক্টোবর মধ্য আমেরিকার তিনটি দেশ গুয়াতেমালা, এল সালভাদর ও নিকারাগুয়ায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় প্যাট্রিসিয়া। প্রতি ঘণ্টায় ২০০ মাইল বাতাসের গতিবেগ সম্পন্ন এই ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম গোলার্ধের সবেচেয়ে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের রেকর্ড করেছে। ঘূর্ণিঝড়টির আঘাতে তিনটি দেশে ছয়জনের মৃত্যু ও ৪১ লাখ ডলার সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

তামিলনাড়ুতে ভয়াবহ বন্যা:

চলতি বছরের শেষ দুইমাসের নজিরবিহীন বৃষ্টিপাতে দক্ষিণ ভারতের করমণ্ডল উপকূলের তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পাদুচেরিতে প্রবল বন্যা দেখা দেয়। তবে তামিলনাড়ু ও এর প্রধান শহর চেন্নাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে চারশরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং অন্ততপক্ষে ১৫শত কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়।

হজ্জ্বে ভয়াবহ পদদলন, দুর্ঘটনা:

হজ শুরুর পর ১২ সেপ্টেম্বর মক্কার মসজিদ আল-হারামের সম্প্রসারণ কাজে থাকা একটি ক্রেন ঝড়ে উল্টে পড়লে ১১৭ জনের মৃত্যু হয়। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার মিনা থেকে জামারায় ‘শয়তানের স্তম্ভে’ পাথর ছুঁড়তে যাওয়ার পথে পদদলনের ঘটনায় সৌদি আরবের সরকারি হিসাব অনুযায়ী ৭৭৯ জন নিহত ও অন্ততপক্ষে ৮৬৩ জন আহত হন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়, এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা অন্ততপক্ষে ২ হাজার ২০০ জন, আহত নয়শরও বেশি এবং নিখোঁজ ৬৫০ জন।

চীনের জাহাজডুবি:

জুনে চীনের ইয়াংজি নদীতে টর্নেডোর আঘাতে একটি যাত্রীবাহী জাহাজ ডুবে প্রায় সাড়ে চারশ মানুষের মৃত্যু হয়। জাহাজের যাত্রীদের অধিকাংশই ছিলেন পর্যটক। তারা ১১ দিনের এক প্রমোদ ভ্রমণে পূর্বাঞ্চলীয় জিয়াংসু প্রদেশের নানজিং থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর চোংকিংয়ে যাচ্ছিলেন। ক্যাপ্টেনসহ জাহাজটির মাত্র ১৪ জন আরোহীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ৭০ বছরে চীনের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বিপর্যয়কর জাহাজডুবির ঘটনা।

জার্মানির বিমান দুর্ঘটনা:

চলতি বছরের ২৪ মার্চ স্পেনের বার্সেলোনা থেকে জার্মানির ডুসেলডর্ফ যাওয়ার পথে ফ্রান্সের আল্পস পর্বতমালায় জার্মানির রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা লুফথানসার মালিকানাধীন সাশ্রয়ী বিমান পরিবহন নেটওয়ার্ক জার্মান উয়িংসের একটি বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানের ১৫০ জন আরোহীর সবাই নিহত হন। এয়ারবাস কোম্পানির এ-৩২০ বিমানটি আল্পসের ডিগনে ও বার্সিলোনেত্তি এলাকার মাঝামাঝি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানান ফরাসি কর্মকর্তারা। মানসিকভাবে অসুস্থ বিমানটির কোপাইলট সচেতনভাবে বিমানটির ককপিট ছেড়ে গিয়ে বিমানটিকে দুর্ঘটনায় ফেলেন।

এছাড়া ৩০ জুন ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রায় একটি আবাসিক এলাকায় সামরিক পরিবহন বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১৪১ জন নিহত হয়।

জলবায়ু চুক্তি:

জুলাইয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্যারিস সম্মেলনে সই হওয়া চুক্তিটিকে সর্বসম্মতিতে করা একটি ঐতিহাসিক চুক্তি হিসেবে দেখছেন বিশ্বনেতারা। চুক্তিটি আগামী কয়েক দশকের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিশ্ব অর্থনীতিকে রূপান্তরিত করে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি রুখে দেবে বলেও ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

ফ্রান্সের রাজধানীতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রায় দুইশ দেশের প্রতিনিধিরা দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে একটি চুক্তিতে পৌঁছতে আলোচনা করেন।

চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ‘যে একটি মাত্র গ্রহ আমাদের আছে তাকে বাঁচাতে এটিই সেরা সুযোগ।’

প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা ২ সেলসিয়াসের নিচে ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। কিছু অংশ পালন করার জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা ও কিছু অংশ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে পালন করার বিধান সম্বলিত চুক্তিটি ২০২০ সাল থেকে কার্যকর হবে।

মঙ্গলে পানি:

সেপ্টেম্বরে মঙ্গলে পানির প্রবাহ রয়েছে- এমন ইঙ্গিত পাওয়ার দাবি করেন নাসার বিজ্ঞানীরা, যা গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে দিক নির্দেশক হবে।

নাসার গবেষকরা বলেছেন, সৌর পরিবারের লাল গ্রহটির উপরিভাগে গ্রীষ্মের মাসগুলোতে পানির প্রবাহের চিহ্ন পেয়েছেন তারা। নাসার প্ল্যানেটারি সায়েন্স বিভাগের পরিচালক জিম গ্রিন ঘোষণা দেন, ‘এতদিন ভাবা হত মঙ্গল একটি শুষ্ক গ্রহ। কিন্তু তা নয়, বিশেষ পরিবেশে তরল পানির সন্ধান মিলেছে মঙ্গলে।’

এর মানে হল মঙ্গলে এখনও প্রাণের উদ্ভবের পরিবেশ রয়েছে। তবে এই পানির উৎস কী কিংবা এর রসায়ন সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা বিজ্ঞানীরা এখনও পাননি।

ইবোলা সংক্রমণ:

মার্চে গিনির পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিম পাঁচটি অঞ্চলে ইবোলা প্রাদুর্ভাবের কারণে ৪৫ দিনের ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আলফা কন্ডে।

নতুন নিষেধাজ্ঞায় যেসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ইবোলা সংক্রমিত রোগী সনাক্ত হবে সেসব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করে রাখা হবে। পাশাপাশি এই রোগে নিহতদের সমাহিতকরণের ব্যাপারেও নতুন নিয়ম জারি করা হয়।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে গিনিতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকার দেশগুলোতে ইবোলা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মারা গেছেন।

ডেঙ্গুর টিকা অনুমোদন:

ডিসেম্বরে বিশ্বে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু জ্বরের টিকা ব্যবহার অনুমোদন করে মেক্সিকো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, মশাবাহিত এই প্রাণঘাতী রোগে বিশ্বে প্রতিবছর ২২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ফরাসি ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্যানোফি জানায়, ডেঙ্গুভ্যাক্সিয়া নামের এই টিকা উন্নয়নে ২০ বছর ধরে তারা কাজ করেছে। বিশ্বে প্রতিবছর ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন।

বিশেষ করে ক্রান্তীয় ও আধা ক্রান্তীয় জলবায়ুর শহরগুলোর বাসিন্দাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান স্যানোফি জানিয়েছে, ডেঙ্গুর টিকা তৈরি ও চিকিৎসা পদ্ধতি বের করার পেছনে তারা ১৬০ কোটিরও বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে।

ভোট দিলেন সৌদি নারীরা:

ডিসেম্বরে সৌদি আরবে পৌর নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন দেশটির নারীরা। এই প্রথম সৌদি নারীরা কোনো নির্বাচনে ভোট দিলেন। ভোট দেওয়া ছাড়াও এই প্রথম সৌদি আরবে নারী প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন।

কঠোর শরিয়া আইনে পরিচালিত দেশটিতে নারীদের গাড়ি চালনার অধিকার নেই; কিন্তু এরপরও এই নির্বাচনে ৫,৯৩৮ জন পুরুষের পাশাপাশি ৯৭৮ জন নারীও বিভিন্ন পদে প্রার্থী হয়েছেন।

সৌদি আরবে নির্বাচন অনুষ্ঠান একটি বিরল ঘটনা। কিন্তু ডিসেম্বরের এই নির্বাচন দেশটির ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘটনা। ১৯৬৫ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ৪০ বছর দেশটিতে কোনো ধরনের নির্বাচন হয়নি।

সাহিত্যে অনুসন্ধানী সাংবাদিকের নোবেল জয়:

সাহিত্যে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বেলারুশের লেখক, অনুসন্ধানী সাংবাদিক সোয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচ, যার ‘বহুস্বরের’ গদ্যকে সুইডিশ অ্যাকাডেমি অভিহিত করেছে ‘সমকালীন যাতনা আর সাহসিকতার সৌধ’ হিসেবে। তিনি সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ১১২তম লেখক।

৬৭ বছর বয়সী সোয়েতলানা আলেক্সিয়েভিচ হলেন চতুর্দশ নারী, যিনি সাহিত্যে নোবেল পেলেন। প্রায় অর্ধশতক পর সুইডিশ অ্যাকাডেমি এমন একজন সাহিত্যিককে নোবেল দিল, যিনি মূলত ‘নন-ফিকশন’ লেখক। আলেক্সিয়েভিচের হাত দিয়ে এসেছে ছোটগল্প, প্রবন্ধ আর সংবাদ প্রতিবেদনের সঙ্কলন। তার সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি ‘চেরনোবিলের কণ্ঠ’, যাকে বলা হচ্ছে ভয়ঙ্কর সেই পারমাণবিক বিপর্যয়ের ‘এক মৌখিক ইতিহাস’।

একইভাবে ‘জিংকি বয়েজ’ বইটিতে সঙ্কলিত হয়েছে এমন কিছু মানুষের জবানবন্দি, যারা আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের চাক্ষুষ সাক্ষী।

 

কানাডায় স্বেচ্ছামৃত্যুতে বৈধতা:

ফেব্রুয়ারিতে কানাডার সুপ্রিম কোর্ট ‘স্বেচ্ছামৃত্যুকে’ বৈধ বলে আদেশ জারি করে। ওই আদেশ অনুযায়ী, দেশটিতে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এখন থেকে চাইলে চিকিৎসকের সাহায্য নিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করতে পারবেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্যে স্বেচ্ছামৃত্যু বৈধ।

বিডিটাইমস৩৬৫ ডটকম/পিএম/একে

 

উপরে