আপডেট : ৪ এপ্রিল, ২০১৯ ১৯:২০

মালয়েশিয়া সম্পর্কে অজানা ১২টি তথ্য, প্রবাসীরা জেনে নিন কাজে লাগবে

অনলাইন ডেস্ক
মালয়েশিয়া সম্পর্কে অজানা ১২টি তথ্য, প্রবাসীরা জেনে নিন কাজে লাগবে

মালয়েশিয়া তেরটি রাজ্য এবং তিনটি ঐক্যবদ্ধ প্রদেশ নিয়ে গঠিত দক্ষিনপূর্ব এশিয়ার একটি দেশ। যার মোট আয়তন ৩,২৯,৮৪৫ বর্গকিমি। দেশটির রাজধানী শহর কুয়ালালামপুর এবং পুত্রজায়া হল ফেডারেল সরকারের রাজধানী। দক্ষিণ চীন সাগর দ্বারা দেশটি দুই ভাগে বিভক্ত, পেনিনসুলার মালয়েশিয়া এবং পূর্ব মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়ার স্থল সীমান্তে রয়েছে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, এবং ব্রুনাই; এর সমুদ্র সীমান্ত রয়েছে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন এর সাথে। মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যা ২৮ মিলিয়নের অধিক।

মালয়েশিয়া সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্য, প্রবাসীরা জেনে রাখতে পারে

১) সরকার ও রাজনীতি

মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের কাঠামোতে পরিচালিত হয়। রাজা হলেন রাষ্ট্রের প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন সরকার প্রধান। উল্লেখ্য মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজা পঞ্চম মোহাম্মদ। মালয়েশিয়ার সরকার ও ১১টি অঙ্গরাজ্য সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। সরকার এবং আইনসভার দুই কক্ষের (দেওয়ান নেগারা ও দেওয়ান রাকিয়াত) উপর যুক্তরাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়ন ক্ষমতা ন্যস্ত। বিচার বিভাগ নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন বিভাগ অপেক্ষা স্বাধীন, তবে নির্বাহী বিভাগ বিচারক নিয়োগদানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের উপর কিছুটা প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

২) মালয়েশিয়ার রাজা

সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে মালয়েশিয়ায় প্রাচীন ঐতিহ্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় অভিভাবক হিসেবে রাজা থাকেন।বর্তমান রাজার নাম পঞ্চম মোহাম্মদ।

৩) মালয়েশিয়া ও মাহাথির

ডাঃ মাহাথির মোহাম্মদ (জন্ম জুলাই ১০, ১৯২৫) মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি। তিনি ১৯৮১ সালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন দল পর পর পাঁচবার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তিনি এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৩ সালের ৩০শে অক্টোবর তিনি স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেন। অবসর গ্রহণের দীর্ঘ পনের বছর পর ৯২ বছর বয়েসে প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ব্যাপক দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার কারণে মাহাথির মোহাম্মদ আবারও আসেন রাজনীতিতে। ২০১৮ সালের ৯ মে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে জয়ের পরদিন ১০ মে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি

৪) অর্থনীতি

মালয়েশিয়ার অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত মুক্ত কিন্তু রাষ্ট্রকেন্দ্রিক। বর্তমানে মালয়েশিয়া একটি উঠতি শিল্পউন্নত বাজার অর্থনীতি বলে বিবেচিত।[৪][৫] সরকার বিভিন্ন ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশটির অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও এই প্রভাব দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। মালয়েশিয়ার অর্থনীতি মূলত মুক্তবাজার অর্থনীতি।

৫) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

মালয়েশিয়া আসিয়ান এবং ওআইসি এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য।এছাড়াও জাতিসংঘ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন (ন্যাম) এবং কমনওয়েলথ এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে মালয়েশিয়ার সরব উপস্থিতি রয়েছে। মালয়েশিয়ার বৈদেশিক নীতি নিরপেক্ষতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম দেশ এবং বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধিতে দেশটি বদ্ধ পরিকর। এছাড়াও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সম্পদ বা জাতীয় যে কোন ইস্যুতে মালয়েশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত দৃঢ়।

মালয়েশিয়ার সাথে ইসরায়েলের কোন প্রকার কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং ইসরায়েলকে কখনও স্বীকৃতি দেয় নি। ফিলিস্তিনের সাথে মালয়েশিয়ার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আন্দোলনকে মালয়েশিয়া নৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে । দখলদার ইসরায়েলী সৈন্যদের সকল প্রকার নির্যাতন,আক্রমন এবং ফিলিস্তিনের প্রতি ইসরায়েলের দমন-পীড়নমূলক নীতিকে মালয়েশিয়া সুস্পষ্টভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে।

৬) শিক্ষা ব্যবস্থা

মালয়েশিয়া পড়াশুনার দিক দিয়ে বেশ উন্নত। তবে বহিরাগত ছাএছাএী দের জন্য বেশ ব্যয়বহুল।

৭) ভাষা

মালয় ভাষা মালয়েশিয়ার সরকারি ভাষা। এখানকার প্রায় অর্ধেক সংখ্যক লোক মালয় ভাষাতে কথা বলে। । মালয়েশিয়াতে আরও প্রায় ১৩০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে চীনা ভাষার বিভিন্ন উপভাষা, বুগিনীয় ভাষা, দায়াক ভাষা, জাভানীয় ভাষা এবং তামিল ভাষা উল্লেখযোগ্য। বাজার মালয় ভাষা বহুজাতিক বাজারের ভাষা হিসেবে প্রচলিত এবং সাবাহ প্রদেশে সার্বজনীন ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা হিসেবে ব্যবহৃত। আনুষ্ঠানিক ভাষা বাহাসা মালয়েশিয়া। তবে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজ নিজ ভাষায়কথা বলে। দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্কুল পর্যায় থেকেই ইংরেজী শেখানো হয়। দৈনন্দিন যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ইংরেজীর বহুল ব্যবহার আছে।

৮) ধর্ম

দাপ্তরিকভাবে মালয়েশিয়া একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হলেও ইসলাম এর আনুষ্ঠানিক ধর্ম। মালয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩% ইসলাম ধর্মাবলম্বী। পাশাপাশি ১৯.৮% লোক বৌদ্ধ, ৯.২% লোক খ্রিষ্টান, ৬.৩% লোক হিন্দু এবং বাকিরা অন্যান্য ধর্ম পালন করে থাকে। সকল ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-আচরন পালন করার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারেন এখানে।

মালয়েশিয়ায় সুন্নী মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ । মালয়েশিয়া শরিয়াহ ভিত্তিক সকল কাজে ‘শাফেয়ী’ মাযহাবের অনুসরন করে থাকে।

ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় আলোচনা কিংবা যেকোন ধরনের সমস্যা নিষ্পত্তিতে ‘শরীয়াহ আদালত’র সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়। তবে শরিয়াহ আদালতের কার্যক্রম এবং সিদ্ধান্ত বিয়ে,সম্পত্তির উত্তরাধিকার,বিয়ে বিচ্ছেদ, ধর্মীয় আলোচনা প্রভৃতির মাঝেই সীমাবদ্ধ।

৯) খাবার এবং সংস্কৃতি

এশিয়ার খাদ্য স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দেশটি। নানা বর্ণ, ধর্ম আর সংস্কৃতির মানুষের অবস্থানের ফলে এখানকার খাবারও বেশ বৈচিত্রময়। মালয়, চাইনীজ এবং ভারতীয় নানা ধরনের খাবার বিভিন্ন রোস্তোরাঁ এবং পথের পাশের স্টলে খুব কম দামে পাওয়া যায়। এছাড়া রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য এবং থাইল্যান্ডের খাবার। নানা সংস্কৃতির মানুষের নানা উৎসবের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যটি ফুটে ওঠে।

মালয়েশিয়ায় রয়েছে বহুভাষী,বহুজাতিক নৃগোষ্ঠী। ফলে অসংখ্য জাতির সহস্র ধরনের রীতি-নীতি ও আচরনের মিশেলে মালয়েশিয়ার সংস্কৃতি হয়ে ওঠেছে বৈচিত্র্যময়। তবে মালয়েশিয় সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও সমাজের আবহমান কাল ধরে পালন করে আসা বৈচিত্রময় দৃষ্টিভঙ্গী ও আচার-আচরন। পাশাপাশি এটি ইসলামি সংস্কৃতির সাথে রক্ষা করেছে অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। মালয়েশিয়ার সংস্কৃতিতে মালয় ভাষাকে সবার উপরে স্থান দেয়া হয়েছে।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে মালয়েশিয়ার সংস্কৃতির এবং ইন্দোনেশিয়ার সংস্কৃতি খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রতিবেশি দেশ বলে পারষ্পরিক সাংস্কৃতিক উপাদানের বিনিময় এবং বিষয়বস্তুর ধারনে ইন্দোনেশীয়া এবং মালয়েশিয়া পরষ্পর পরষ্পরকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত করেছ। তবে তা , সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ও আত্নপরিচয়ের মৌলিক বিশ্বাস পালন,সংরক্ষনে মালয়েশিয়া বদ্ধ পরিকর।

১০) খেলাধুলা

ফুটবল মালয়েশিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ফুটবলের পরেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে ব্যাডমিন্টন। এছাড়াও হকি, টেনিস,ঘোড়দৌড়,মার্শাল আর্ট এখানে জনপ্রিয়। ২০৩৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম আয়োজক হতে পারে দেশটি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় মালয়েশিয়ার সরব উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। মালয়েশিয়া সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে মেলবোর্ন অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়। মালয়েশিয়া এ পর্যন্ত অলিম্পিকে ৬টি মেডেল জিতেছে যার ৫টিই এসেছে ব্যাডমিন্টন থেকে।

১১) নাগরিকত্ব

মালয়েশিয়াতে তিন ধরনের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা রয়েছে প্রথম হল যারা আদি নাগরিক তারা। তাদেরকে মালয় ভাষায় আস্লি বলে , তারা হচ্ছে মালয়েশিয়ার প্রথম পর্যায়ের নাগরিক । দ্বিতীয়ত রয়েছে যারা নগর সভ্যতার যুগ থেকে মালয়েশিয়ার শহর বা নগরে বাস করে, তারা মূলত আস্লি দের থেকেই এসেছে তবে বহু আগে তাদের আদি বাসস্থান ত্যাগ করেছে। তৃতীয়ত রয়েছে যারা বিভিন্ন দেশ থেকে গিয়ে ঐখানে স্থায়ী ভাবে জীবন যাপন করছে তারা । এই শ্রেণীর মধ্যে আছে চীনা, থাই, ভিয়েতনামি, তামিল, ইন্দোনেশিয়ান বাংলাদেশি, পাকিস্তানি। তাদের মধ্যে এখন সবচেয়ে ভাল অবস্থানে আছে চীনা মালয়েশিয়ানরা, মালয়েশিয়ার বেশীর ভাগ বড় বড় ব্যবসা প্রতষ্ঠান এখন তাদের মালিকানাধীন। আর তামিলদের বেশীর ভাগ ট্যাক্সি চালক আর কিছু আছে স্বর্ণ ব্যবসায়ী।

মালায়েশিয়ায় এখন সাধারণত বহিরাগতদের নাগরিকত্ব দেয়া হয় না। তবে ঐখানে জন্ম হলে বা কোন মালয় নাগরিক কে বিয়ে করলে মালায়সিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়া যায় । সেক্ষেত্রে মালায়েশিয়ার পাসপোর্ট দেয়া হয়। এবং অন্য সকল নাগরিক সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় ভাবে সকলেই সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।

১২) গণমাধ্যম

মালয়েশিয়ার প্রধান সংবাদপত্রগুলি হল উতুসান মালয়েশিয়া, দ্য স্টার এবং দ্য মালয় মেইল। এগুলির সবগুলিরই ইন্টারনেট সংস্করণ আছে। এগুলিতে স্থানীয় ইস্যু, রাজনীতি, ব্যবসা, বিনোদন এবং সংস্কৃতির উপর সংবাদ ও নিবন্ধ থাকে।

উতুসান মালয়েশিয়া ইংরেজি ও মালয় উভয় ভাষাতেই প্রকাশিত হয়। এটি ১৯৩৯ সালে সিঙ্গাপুরে যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৮ সালে মালয়েশিয়া ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করলে তারা কুয়ালালামপুরে স্থানান্তরিত হয়। এটি মালয়েশিয়ার প্রথম অনলাইন পত্রিকা হিসেবেও ইন্টারনেটে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে এটি মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বেশি পঠিত সংবাদপত্র।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে