‘ওই ভাইয়া ওঠ, পুলিশ আর আসবে না' | BD Times365 ‘ওই ভাইয়া ওঠ, পুলিশ আর আসবে না' | BdTimes365
logo
আপডেট : ১৩ মে, ২০১৯ ১৫:৫১
‘ওই ভাইয়া ওঠ, পুলিশ আর আসবে না'
গাজী মুনির

‘ওই ভাইয়া ওঠ, পুলিশ আর আসবে না'

‘ওই ভাইয়া ওঠ, পুলিশ আর তোকে ধরতে আসবে না। আব্বু ভাইয়া উঠছে না কেন? আমার কথা শুনছে না।’ ভাইয়ের লাশের খাটিয়া ধরে এভাবেই বিলাপ করছিল মা-হারা একমাত্র ছোট বোন টুম্পা। লাশের মাথার কাছে বসে অঝোরে কেঁদে চলছে সদ্য বিধবা স্ত্রী শান্ত। লাশের পায়ের কাছে নির্বাক বসে আছে বাবা আব্দুল হান্নান। তাঁকে নিষ্ফল সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলের লাশ নিয়ে ঢাকা থেকে ছুটে আসা বন্ধুরা। বাড়ির উঠোনজুড়ে পাড়া প্রতিবেশীদের উপচে পড়া ভিড়। সবার কণ্ঠে একই কথা এটা কী হয়ে গেল, ছেলেটা খুব ভালো ছিল। কেউ যেন কাউকে সান্তনা দিতে পারছে না।

এই হৃদয় বিদারক দৃশ্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সবুরের বাড়িতে। সবুর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তথ্য ও খনিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন একাধিক রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘদিন ফেরারি জীবন যাপন করছিল সে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে প্রায়শই বুধপাড়ার বাড়িতে অভিযান চালাতো পুলিশ। গ্রেপ্তার হয়ে বেশকিছুদিন জেলেও ছিল সে।

পরে সবকিছু ছেড়ে ঝামেলামুক্ত জীবন কাটাতে চেয়েছিল সে। ঢাকায় এসে এমইপি গ্রুপে সেলস এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেছিল। চেয়েছিল একটা শান্তির জীবন কাটাতে। ২০১৮ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএর শিক্ষার্থী হাবিবা সুলতানা শান্তকে। সবে একটা জীবনে সুখের দেখা পেতে শুরু করেছিল। অল্প সময়ের মধ্য নিজের কর্মদক্ষতা, সততা ও পরিশ্রম দিয়ে অফিসেও একটা ভালো অবস্থান করে নিয়েছিল। তবে সুখের দেখা পাওয়ার আগেই বেজে গেল ছুটির ঘন্টা। পরপারের ডাকে সাঁড়া দিয়ে চলে যেত হল সবকিছু ছেড়ে।

সবুরের বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “বেটা আমার ওপর অভিমান করেছে। কিছু না বলে চলে গেল। আমার বেটার কোন অসুখ ছিল না। ওকি একবারও ভাবলো না ও চলে গেলে আমি কী নিয়ে থাকবো? বেটা আমাকে শেষ বারের মতো দেখতেও যেতে দিল না ঢাকায়। সবুর আমার শুধু ছেলে ছিল না বন্ধুও ছিল।”

বন্ধুদের মাঝে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ছিল সবুরের। মানুষকে ভালোবেসে কাছে টানার অনন্য এক ক্ষমতা তাঁকে দিয়েছিল সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে। অল্প সময়ের মধ্যে যে কোন মানুষকে ভালোবেসে বশে আনার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল এই টগবগে যুবকের মাঝে।

ঢাকা থেকে লাশের সঙ্গে আসা শুভ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “ভাই আমাকে অনেক ভালোবাসতো। নিজের ভাইয়ের মতো আগলে রাখতো। মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে আমার ওপর প্রচন্ড অভিমান করেছিল ভাই। বলেছিল শুভ তোকে আমি মানুষ করতে পারলাম না। ঢাকায় ভাই ছিল আমার অভিভাবক, আমার ছাঁয়া। চলতি মাসেই আমাকে জামালপুর থেকে এনে ঢাকায় চাকরি দিয়েছে। ভাই সবসময় বলতেন শুভ তোকে আমি একটা ব্যবস্থা করে দিব, ভাই কথা রেখেছেন তবে নিজে চলে গেলেন।”

ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও রুমমেট কায়সার আক্ষেপ করে বলছিল, “সবুরের সঙ্গে ছিল আমার আত্মার সম্পর্ক। সে ছিল আমার ভাই, আমার বন্ধু। আমাকে জীবনে সবচেয়ে যে বেশি সাপোর্ট দিয়েছে, বিপদে-আপদে পাশে থেকেছে সেই বন্ধুকে আজ হারালাম। এই ব্যথা কখনো ভুলবার নয়। সবুরের মাঝে সবচেয়ে ভালো দিক ছিল মানুষের বিপদে-আপদে কাছে থাকা। নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা করার অনন্য গুণাবলী ছিল ওর মাঝে।”

অতুলনীয় প্রাণশক্তির অধিকারী টগবগে এই যুবক, গত ৬ মে থেকে অল্প অল্প জ্বরে ভুগতে থাকে। মাঝে একটু সুস্থ হতেই ৯ তারিখে অফিসও করে। অসুস্থ অবস্থায়ও রোজা করছিল নিয়মিত। কিন্তু বিধির নির্মম খেলা ১০ তারিখ শুক্রবার বিকালে হঠাৎ অসুস্থতা বাড়তে থাকে। বন্ধুরা তাকে দ্রুত রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে বিধিবাম, কিছুতেই কিছু হল না। ডাক্তার-বন্ধুদের সকল প্রচেষ্ঠা ব্যর্থ করে রোববার সকাল ৯ টার দিকে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যায় সকলের প্রিয় এই মানুষটি।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম