আপডেট : ২১ জানুয়ারী, ২০১৮ ১৩:৫৪

মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে গ্রামীণফোন!

অনলাইন ডেস্ক
মৃত্যু ঝুঁকি বাড়াচ্ছে গ্রামীণফোন!

রাজধানীর নামকরা হাসপাতাল বারডেম। এই হাসপাতালের উপর গ্রামীণফোনের টাওয়ার। কোনো ঝুঁকি বিবেচনা না করেই গ্রামীণফোনকে এই টাওয়ার স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব টাওয়ারের রেডিয়েশন স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ব্রেন টিউমার ও ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। সিটি করপোরেশন বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এসব টাওয়ার বসানোর জন্য নেওয়া হচ্ছে না কোনো ধরনের অনুমতি। শুধু ভবন মালিকের সঙ্গে চুক্তি করেই টাওয়ারগুলো বসানো হচ্ছে। সিটি করপোরেশন অবৈধ বিলবোর্ড উচ্ছেদ করলেও এসব টাওয়ার উচ্ছেদের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এদিকে দীর্ঘ সময় পর অবশেষে মোবাইল টাওয়ার থেকে ক্ষতিকর রেডিয়েশন পরিমাপের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

রেডিওলজিস্ট ও ক্যান্সার হাসপাতালের ক্যান্সার এপিডিমিয়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন কয়েকদিন আগে বলেন, যে কোনো ধরনের রেডিয়েশনই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এটি দৃশ্যমান নয়। আজকে যে রেডিয়েশনের শিকার হচ্ছে, কয়েক বছর পর এর প্রভাব পরিলক্ষিত হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রেডিয়েশনের কারণে ব্রেন টিউমার হচ্ছে যেটা অবশ্যই আশঙ্কার। বাংলাদেশে বিভিন্ন ভবনের ছাদে শুধু গ্রামীণফোনের ১৩ হাজারের বেশি টাওয়ার রয়েছে। সব মিলিয়ে টাওয়ার আছে ৩৫ হাজারের মতো। এসব টাওয়ার থেকে কি পরিমাণ তেজস্ক্রিয়তা ছড়াচ্ছে তার কোনো হিসাব নেই।

জানা গেছে, সর্বশেষ নতুন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তফা জব্বার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই টাওয়ার ব্যবস্থাপনার নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছেন। এটা বাস্তবায়ন হলে টাওয়ারগুলো নতুন কোম্পানির হাতে চলে যাবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামীণফোনের কোনো টাওয়ারই পরিবেশবান্ধব নয়। অথচ আরেক মোবাইল ফোন অপারেটর রবির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ই-ডটকো সাম্প্রতিক সময়ে কার্বন ফাইবার টাওয়ার স্থাপন করেছে। সেটি পরিবেশ বান্ধব ও স্বাস্থ্যের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উন্নত বিশ্বে আবাসিক এলাকা থেকে যথাসম্ভব দূরে মোবাইল ফোনের টাওয়ার স্থাপন করা হয়। এ ধরনের টাওয়ার নবজাতক ও প্রসূতির জন্য অবশ্যই ক্ষতিকর। শিশুর প্রতি অবহেলা কার্যত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নির্দেশক। বাংলাদেশে শিশুর প্রতি সহিংসতার বাইরেও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের বৈশ্বিক পুষ্টি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ২২ শতাংশ নবজাতক কম ওজন নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি পাঁচ শিশুর দু’টি খর্বাকৃতি। মোবাইল ফোন টাওয়ারের রেডিয়েশনের কারণেই এমনটি হচ্ছে কি-না তা গবেষণার কথা বলেছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন কিছুদিন আগে বলেন, ‘ভবনের ছাদে বসানো টাওয়ারে কর দেওয়ার একটা নীতিমালা আছে। অথচ মোবাইল ফোন কোম্পানির টাওয়ার বসাতে আমাদের কাছ থেকে কেউ অনুমতি নেয়নি। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, কিছু একটা করা যায় কি-না।’

শুধু বারডেম হাসপাতাল নয়, সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নবজাতক ও শিশু ওয়ার্ডের ছাদেও বসানো হয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি মোবাইল টাওয়ার। অথচ এ সব টাওয়ার থেকে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন হয়। যা নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। টাওয়ার পর্যবেক্ষণ ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ নিশ্চিত করতে ছাদে যেসব ভারী যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে, তাতে যে কোনো সময় ছাদের ওই অংশ ভেঙে পড়তে পারে। রাজধানীর একটি নামকরা স্কুলের ছাদে বসানো ৫টি টাওয়ার সম্প্রতি অপসারণ করেছে ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোবাইলের রেডিয়েশনের ফলে দেশের অগণিত শিশু নানা মানসিক প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত হচ্ছে। সমস্যার আর একটি দিক হলো, আমরা যখন ফোনে কথা বলি না, তখনও ওই বিকিরণ আমাদের ক্ষতি করে চলে। মোবাইল অন থাকলেই তাতে তড়িত্চুম্বকীয় তরঙ্গ আসতে থাকে টাওয়ার থেকে। কানে ফোন নিয়ে কথা বলার সময় সেটি মস্তিষ্কের একেবারে কাছে চলে আসে। বিকিরণ প্রবাহিত হতে থাকে শরীরের মধ্যদিয়ে।

আন্তর্জাতিক ক্যান্সার রিসার্চ সংস্থার মতে, অতিমাত্রায় রেডিয়েশনের কারণে ব্রেইন ক্যান্সার হতে পারে। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এর মতে, অতিমাত্রায় মোবাইল ব্যবহারে শরীরের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘক্ষণ কথা বলার কারণে কানের সমস্যা, কানে ঝিমঝিম করা, কানের ভিতরে ব্যথা, ব্রেইনের নিউরনের ক্ষতি, ব্রেনের কোষ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। মোবাইল টাওয়ার রেডিয়েশনের কারণে মানুষের টিউমার, আলঝেইমার, ব্রেইন টিউমার, ক্যান্সার, বন্ধ্যাত্ব, নিদ্রাহীনতা, উচ্চ রক্তচাপ, হূদরোগ ও গর্ভপাতসহ বিভিন্ন রোগ বেড়ে গেছে।

সম্প্রতি ভারতে মোবাইল টাওয়ারের ক্ষতিকর দিক বর্ণনা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে বিচ্ছুরিত তড়িত্-চুম্বকীয় বিকিরণের জন্য চড়ুই, মৌমাছি, ব্যাঙ, বাদুড় চামচিকা, শালিক, টুনটুনি, ময়না, টিয়া প্রভৃতি অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে বিজ্ঞানিরা বলেছেন। বিকিরণের জন্য বদলে যাচ্ছে পশু-পাখি-পতঙ্গকুলের আচরণ। সাথে সাথে তাদের প্রজননেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এদিকে দেশে মোবাইল ফোনের যাত্রা শুরুর দুই যুগের বেশি সময় পর মোবাইল টাওয়ার থেকে ক্ষতিকর রেডিয়েশন পরিমাপের জন্য যন্ত্রপাতি কেনার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগামী মে মাস নাগাদ রেডিয়েশন মাত্রা পরিমাপের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটি।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানির টাওয়ার থেকে নিঃসৃত রেডিয়েশনের (তেজস্ক্রিয়তা) মাত্রা উচ্চ পর্যায়ের, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা এ প্রতিবেদনের কথা গত মার্চে হাইকোর্টকে জানায়। স্বাস্থ্যের ক্ষতির বিষয়টি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে নির্ণয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা চেয়ে রিট করা হয়। এসব নিয়ে পরবর্তীতে খুব একটা আর এগুয়নি।

সূত্র: ইত্তেফাক

উপরে