আপডেট : ১১ জানুয়ারী, ২০১৮ ১৪:১১

বার্ন ইউনিটে রেকর্ড সংখ্যক রোগীর সমাগম

অনলাইন ডেস্ক
বার্ন ইউনিটে রেকর্ড সংখ্যক রোগীর সমাগম

সন্ধ্যায় মাটির চুলায় আগুন পোহাচ্ছিলেন নুরুন নাহার (৬০)। অসাবধানে কোনো এক সময় শাড়িতে আগুন লাগে। টের পেয়ে আগুন নেভাতে নেভাতে তাঁর শরীরের ৪২ শতাংশ পুড়ে গেছে। তিনি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।

রংপুরের এই নারীকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে গত সোমবার বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। শুধু নুরুন নাহার নন, এদিন নানাভাবে দগ্ধ মোট ৩২ জন রোগী এখানে ভর্তি হয়েছে। আর আন্তবিভাগ ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে সেবা নিয়েছে কমবেশি ২০০ পোড়া রোগী।

বাংলাদেশের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির জাতীয় সমন্বয়ক অধ্যাপক সামন্তলাল সেন বলেন, এ বছর শীতের তীব্রতা যেমন রেকর্ড ভাঙা, তেমনি বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার পর রেকর্ডসংখ্যক রোগী এখন আসছে। আগুন পোহাতে গিয়ে এবং গরম পানি বহনের সময় অধিকাংশ অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটছে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাবে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় দুই সপ্তাহ ধরে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। আর মোট পোড়া রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি। গড়ে প্রতিদিন এখন ৩০-৩৫ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে আর পোড়া রোগী আসছে ১৫০-২০০ জন। বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বার্ন ইউনিটের সহকারী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ বলেন, রোগীর চাপের কারণে ২০ শতাংশের কম পোড়া হলে তাঁকে এখন ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। বছরের অন্য সময় কম-বেশি চার শ রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেয়। সে সংখ্যা এখন ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে।

কেন বাড়ছে

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, শীত থেকে রেহাই পেতে নানাভাবে আগুনের সংস্পর্শে আসার ফলে অগ্নিদগ্ধ রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

গত মঙ্গলবার হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে স্ট্রেচারে রোগীদের লম্বা লাইন। কেউ আগুন পোহাতে গিয়ে, কেউবা রান্না করতে গিয়ে বা ডাল-তরকারি হাঁড়ির মধ্যে পড়ে, কেউবা ডেকচিতে করে গরম পানি বহনের সময়, কেউ ব্যাডমিন্টন খেলার লাইন থেকে বা কেউবা কাজ করার সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে, আবার গিজারের গরম পানি থেকে শুরু করে চা-কফি থেকেও দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে পোড়া রোগীরা আসছে।

হাড়কাঁপানো শীত। তাই রাতে খাবারের আগে মা ডাল গরম করেন। সেই গরম ডালের কড়াইয়ে পড়ে যায় নীলফামারীর তিন বছরের আবু জাফর। এতে জাফরের বুক, মুখ ও পায়ের অনেকটা পুড়ে গেছে। শিশুটিও এখানে চিকিৎসা নিচ্ছে।

চিকিৎসক তানভীর আহমেদ বলেন, দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে পোড়া রোগীদের সবচেয়ে বড় অংশ আসছে। ঢাকাসহ চারপাশ থেকেও আসা রোগীর সংখ্যাও কম নয়। নারী রোগীর সংখ্যা বেশি।

হাসপাতালের গ্রিন ইউনিটের নারী ওয়ার্ডে মোট শয্যার সংখ্যা ১২। বাড়তি রোগীর চাপে মেঝেতেও বেশ কয়েকজন রোগীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁদের একজন ৮০ বছরের সালেহা। আগুন পোহাতে গিয়ে টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের এই নারীর শরীরের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে শিশু ও পুরুষের ওয়ার্ডেও। মেঝে, করিডর উপচে সিঁড়ি পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোগীদের চিকিৎসা চলছে।

মো. ইব্রাহিম ইনসুলেটরবিহীন তার দিয়ে ইলেকট্রিক কাজ করতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। লিফটের সামনের মেঝেতে তাঁর চিকিৎসা চলছে। এতে রোগীর পাশাপাশি স্বজনদেরও ভুগতে হচ্ছে।

জানা গেছে, বার্ন ইউনিটে অনানুষ্ঠানিকভাবে রোগীদের জন্য ৩৩০ শয্যার ব্যবস্থা আছে। আর লোকবল আছে ১০০ শয্যার রোগীদের সেবা দেওয়ার। অথচ এখন তাঁদের ছয় শতাধিক রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। বাড়তি রোগীর চাপে চিকিৎসক-নার্সদের কর্মঘণ্টার বেশি কাজ করতে হচ্ছে।

চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী, অগ্নিদগ্ধ নুরুন নাহারের মৃত্যুঝুঁকি ১০২ শতাংশ। সে অনুযায়ী এখন তাঁকে সার্বক্ষণিক পরিচর্যা কেন্দ্রে (এইচডিইউ) রাখা উচিত। কিন্তু শয্যা খালি না থাকায় তাঁকে সাধারণ ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। এ নিয়ে তাঁর ছেলে নূর আলমের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।

প্রতিরোধে দরকার সাবধানতা

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, অগ্নিদুর্ঘটনায় স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হয়। অঙ্গহানির ঘটনা ঘটে। মৃত্যুঝুঁকিও অনেক বেশি। আর ঘটনা–পরবর্তী মানসিক সমস্যাতেও ভুগতে হয়। অথচ একটু সচেতনতা আর সতর্কতা এসব দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমিয়ে আনবে বা সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব—বলেন তাঁরা।

অধ্যাপক সামন্তলাল সেন বলেন, অগ্নিদগ্ধের ঘটনা কমাতে প্রতিরোধ হচ্ছে সর্বোত্তম পন্থা। প্রতিরোধে তিনি কতগুলো টিপস দেন। সেগুলো হলো রান্নার পরপরই চুলা বন্ধ রাখা, চুলার পাশে যাওয়ার সময় শাড়ি, ওড়না, শাল সামলে রাখা। সবচেয়ে ভালো গাউন পরে রান্না করা। ডেকচি বা হাঁড়ির পরিবর্তে গরম পানি ব্যবহারে বালতি বহন করা ।

সামন্তলাল সেন আরও বলেন, প্রাথমিকভাবে অগ্নিদগ্ধ স্থানে স্বাভাবিক তাপমাত্রার প্রচুর পানি ঢালতে হবে। কোনোভাবেই ফ্রিজের ঠান্ডা পানি, ডিম, পেস্ট লাগানো যাবে না। পরে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রুমা

উপরে