আপডেট : ২৩ আগস্ট, ২০১৭ ১৪:৩২

মানসিক চাপের কারণ ও তার প্রতিকার

অনলাইন ডেস্ক
মানসিক চাপের কারণ ও তার প্রতিকার

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগে কাজ করছেন মোজাফ্ফর সাহেব। ইদানীং তিনি বুকের ভেতর অস্বস্তিবোধ করেন। রাতে ঠিকমতো ঘুম আসে না। সাধারণ বিষয়গুলো কিছুতেই মনে রাখতে পারছেন না। অল্পতেই রেগে যাচ্ছেন। হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং নিউরোলজিস্ট প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন তাঁর হৃদ্যন্ত্রে কোনো সমস্যা নেই, বুকে-পেটেও সমস্যা নেই, সমস্যা নেই মস্তিষ্কেও। চিকিৎসকেরা তাঁকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠালেন! নিতান্ত অনিচ্ছায় মোজাফ্ফর সাহেব মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলেন। সেখানে বিশদ সাক্ষাৎকারে জানা গেল অফিসের একটি বড় অঙ্কের হিসাবে গোলমাল হওয়ায় মোজাফ্ফর সাহেব তীব্র মানসিক চাপে আছেন। মানসিক চাপ থেকে তাঁর নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সঠিক চিকিৎসায় তিনি সুস্থবোধ করতে লাগলেন।
অনেক সময় জীবনে চলে আসে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। হুট করে ঘটে যায় এমন ঘটনা, যা আমাদের কল্পনারও বাইরে। ঠিক সেই সময় পরিবর্তিত প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে মনোজগতে তৈরি হয় আলোড়ন। তৈরি হয় মানসিক চাপ, যাকে বলা হয় ‘স্ট্রেস’। এই মানসিক চাপের কারণে কেবল মনোজগতের পরিবর্তনই ঘটে না বরং উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু শারীরিক লক্ষণও দেখা দেয়। মানসিক চাপের কারণে মস্তিষ্কে কিছু রাসায়নিক বস্তু বা নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট হয়, অন্তঃক্ষরা বিভিন্ন গ্রন্থি থেকে নিঃসরিত হরমোনের ঘাটতি-বাড়তি হয় এবং এসবের প্রভাবে হৃদ্যন্ত্রের সংকোচন-প্রসারণের হার পরিবর্তিত হয়, নিশ্বাস-প্রশ্বাস হয় অস্বাভাবিক। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে যে শারীরিক কোনো সমস্যা হচ্ছে। কিন্তু মানসিক চাপের কারণেও যে এমনটা হতে পারে সেটাও মনে রাখা প্রয়োজন।
মানসিক চাপের কারণে ভুলে যাওয়া, সহজেই রেগে যাওয়া, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো, দুশ্চিন্তা, বিচার-বুদ্ধি লোপ পাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়া, মন খারাপ, উৎসাহ-উদ্দীপনা কমে যাওয়া ইত্যাদি মনোসামাজিক লক্ষণ দেখা দেয়। পাশাপাশি যেসব শারীরিক অসুস্থতা বা যেসব লক্ষণ সাধারণত দেখা দিতে পারে, সেগুলো হলো—
* মাথা ব্যথা করা, মাথা ভারী অনুভব করা বা মাথা ঘোরানো
* মাংসপেশিতে ব্যথা বা খিঁচ ধরা
* বুকে ব্যথা বা অস্বস্তিবোধ হওয়া, বুক ধড়ফড় হওয়া
* শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা দ্রুত বারবার শ্বাস নেওয়া
* দুর্বল লাগা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসা
* যৌনাকাঙ্ক্ষা ও যৌনশক্তি কমে যাওয়া
* পেট ফাঁপা, পেট সব সময় ভরা বোধ করা, বুক-পেট জ্বলা
* হজমের সমস্যা হওয়া, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা বমি বমি ভাব
* বারবার বাথরুমে যাওয়ার প্রয়োজন হওয়া
* খিদে কমে যাওয়া বা কখনো খিদে বেড়ে যাওয়া
* ঘুম কমে যাওয়া, ঘুম না আসা
* হাত-পা ঘামা ও মৃদু কাঁপুনি
* মুখ শুকিয়ে যাওয়া
* রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
* প্রায়ই ছোটখাটো সংক্রমণ ও ঠান্ডাজনিত রোগে ভোগা
* চোয়াল শক্ত হয়ে আসা ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাঁতে দাঁতে বাড়ি লাগা
* ডায়াবেটিসের রোগীদের রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া
* হাঁপানি, হৃদ্রোগ বা দীর্ঘমেয়াদি চর্মরোগ যাঁদের রয়েছে, তাঁদের মধ্যে এগুলোর উপসর্গ হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া
* নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়মিত ঋতুস্রাব হওয়া।
সবার ক্ষেত্রে সব সময় একই রকম লক্ষণ প্রকাশ পায় না। মানসিক চাপের কারণ এবং পরিস্থিতি আয়ত্ত করার ব্যক্তিগত দক্ষতা বা ‘কোপিং মেকানিজম’-এর ওপর লক্ষণ নির্ভর করে। একই ঘটনায় বিভিন্ন ব্যক্তির শারীরিক-মানসিক লক্ষণ বিভিন্ন হতে পারে। শারীরিক এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে শারীরিক চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি মানসিক চাপের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। ঘরে-বাইরে কোনো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে কেউ মানসিক চাপে পড়তে পারেন।

মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকতে হলে শরীরের পাশাপাশি মনের যত্নও নিতে হবে। মনের যত্ন নিতে যা যা করা যেতে পারে—
* রুটিন মেনে চলা
খাওয়া, ঘুম, বিশ্রাম, কাজ সব যেন রুটিন মেনে হয়। রাতের বেলা ঘুমাতে হবে আর দিনে কাজ করতে হবে। যদি এর উল্টোটা হয়ে যায় তবে মস্তিষ্কের ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ এলোমেলো হয়ে যায়, যা মানসিক চাপের উদ্রেক করতে পারে।

* একসঙ্গে অনেক কাজ নয়
সব কাজ সাজিয়ে নিয়ে তালিকা অনুযায়ী ধাপে ধাপে কাজ করুন। একসঙ্গে অনেক কাজ শুরু করবেন না।

* অসম্ভব প্রতিশ্রুতি নয়
চক্ষুলজ্জার কারণে প্রতিশ্রুতি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার জন্য যা কষ্টকর এমন কিছু প্রতিশ্রুতি সব সময় দেবেন না। শালীনভাবে ‘না’ বলতে শিখুন।

* নিজেকে সময় দিন
প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য হলেও নিজেকে নিয়ে ভাবুন।

* পরিবারকে গুরুত্ব দিতে হবে
পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় রাখতে হবে। সবাই একসঙ্গে খাওয়া, সপ্তাহে নিয়ম করে একসঙ্গে আড্ডা দেওয়া, বেড়াতে যাওয়া পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করে, একাকিত্ব কমায় এবং মানসিক চাপ মুক্ত থাকতে সাহায্য করে।

* সামাজিক দক্ষতা
সামাজিকভাবে দক্ষ হলে মনের ওপর চাপ কম পড়ে, মন সুস্থ থাকে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বেশি সময় ব্যয় না করে বাস্তব সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে সক্রিয় অংশ নেওয়া প্রয়োজন।

* সময়ের সদ্ব্যবহার
সঠিকভাবে সময়ের সদ্ব্যবহার করুন। অযথা সময় নষ্ট করলে দিন শেষে মানসিক চাপ বাড়বে।

* হালকা ব্যায়াম
প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম মাংসপেশির শিথিলতা ও দৃঢ়তাকে নিশ্চিত করে। মনের চাপ কমাতে ‘রিলাক্সেশন’ (শিথিলায়ন) অত্যন্ত উপকারী।

* সম্মিলিতভাবে কাজ করুন
একটি কাজ পরিবারের সদস্য বা অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগ করে নিন। একা সব কাজের দায়িত্ব নেবেন না।•

* পাঠাভ্যাস ও বিনোদন
পাঠ্যবই বা অফিসের দরকারি ফাইলের বাইরে প্রতিদিন কিছু না কিছু পড়তে হবে। এর পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা, সংগীত, ছবি আঁকা, নাচ করা মনের চাপ কমাতে কার্যকরী।

* সঠিক খাদ্যাভ্যাস
সুষম খাদ্য আর পানি পান করতে হবে। সময়মতো খেতে হবে। অনিয়ম করে খাওয়া শরীরে মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের নিঃসরণ বাড়াবে।

* মানসিক চাপ বাড়ে এমন বিষয় পরিত্যাগ
পারিবারিক দ্বন্দ্ব, কলহ, মাদকের নেশা, অনিয়ন্ত্রিত রাগ, অহেতুক হিংসা-কুটিলতা, অন্যায্য শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজের মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, পেশাজীবনে অনৈতিকতার চর্চা ইত্যাদি মনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে; এগুলো এড়িয়ে চলুন।

* মানসিক সমস্যার চিকিৎসা গ্রহণ
মানসিক চাপের কারণে মানসিক সমস্যা হলে বিষয়টিকে এড়িয়ে না গিয়ে, লুকিয়ে না রেখে সঠিক বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রুমা

 

উপরে