আপডেট : ২ নভেম্বর, ২০১৮ ১৬:৫০

একজন রস বিক্রেতার নিরস জীবনের গল্প

অনলাইন ডেস্ক
একজন রস বিক্রেতার নিরস জীবনের গল্প

‘ভালা-মন্দ বুঝি না, হুধু জানি মানুষ ঠকাইতে এইহানে বহি নাই। পুরা ঢাহার মধ্যে এর থাইক্যা ভালা মাল পাইবেন না।’ কথাটা কানে আসতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম পিছে। দেখলাম ৭০-৭৫ বয়সী একজন বৃদ্ধ সামনে দাঁড়ানো এক যুবকের সঙ্গে কথা বলছে। বৃদ্ধর সামনে পায়ের কাছে দুইটা সিলভারের কলসি রাখা। যুবকটি কত টাকা করে গ্লাস জিজ্ঞাসা করায় বৃদ্ধ উত্তর দেয়, ‘বিশ টাহা প্রতি গেলাস, কোন দরদাম নয়।’

ব্যস্ততা না থাকা ও অফুরন্ত কৌতূহলের কারণে এগিয়ে গেলাম বৃদ্ধর কাছে। সাতপাঁচ না ভেবেই বলে ফেললাম, চাচা আমারেও এক গ্লাস দেন। শুরুতেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পরিস্কারডা নাকি ঘোলাডা?’ আমিও পুরানো ক্রেতার মতো মুখ গম্ভীর করে বললাম, ‘ঘোলাটাই দেন।’

গ্লাসটা হাতে নিয়ে মুখের কাছে ধরতেই উটকো গন্ধ আসলো নাকে। তারপরও গ্লাসে ঠোঁট রাখলাম, দিলাম চুমুক। কেমন যেন টক টক স্বাদ। অজান্তেই মুখ থেকে বের হয়ে আসলো, ‘চাচা কি এটা, এমন স্বাদ ক্যা?’ চাচা বললেন, ‘তালের রস বাবাজি, এইডা সলিড জিনিস। কয়েকদিনের বাসি বইলাই এইরাম সোয়াদ। আপ্নে পরথম খাইতাছেন বইলা এমন বিস্বাদ লাগছে আপনার কাছে।’

যাই হোক চাচাকে আশাহত না করতে অনিচ্ছা থাকলেও পুরাটা গ্লাস এক নিঃশ্বাসে শেষ করলাম। মানিব্যাগ থেকে টাকা দিতে দিতে চাচাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘চাচা বয়স কত আপনার?’ উত্তর মিললো, ‘গেলো বইশাখে পাঁচাত্তর হইছে।’ ‘এত্তো! এই বয়সে তো আপনার বিশ্রাম ও ইবাদত নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা। তাহলে কলসি নিয়ে রাস্তায় কেন, চাচা?’

কথাটা শুনেই মুখ তুলে তাকালেন চাচা। বললেন, তার নাম আবুল ব্যাপারী। তিনি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার ব্যাপারী বাড়ির ছেলে। ছোটবেলায় প্রাচুর্যের মধ্যেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তার চাচারা ভিটাবাড়ি ছাড়া সব জমি দখল করে নেয়। এই বাড়িটাও বছর চারেক আগে যায় আড়িয়াল খাঁ নদীর পেটে। তারপর থেকেই বাস্তুহারা তিনি ও তার পরিবার। কথাটা বলতে বলতে গামছা দিয়ে চশমা মুছতে থাকেন আবুল ব্যাপারী।

স্বপ্ন কে না দেখে? ৭৫ বছরের আবুল ব্যাপারীও এর বাইরে নন। এই বয়সে চশমা ছাড়া কিছুই পান না দেখতে, কিন্তু স্বপ্ন তিনি দেখেন ঠিকই। নাতিদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করার ইচ্ছাটাতেই বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা যেন প্রবল হয়ে উঠে তার। চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েও দায়িত্ব থেকে অবসর নেননি তিনি। গায়ে জোর না থাকলেও আত্নসম্মানবোধটা মোটেও নড়বড়ে নয় তার। চার মেয়েকে ঝামেলামুক্ত যেন তার যত চেষ্টা। চাচি কোথায় জিজ্ঞাসা করায় চাচা জানান, স্ত্রীকে রেখেছেন ফরিদপুরেই। প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা ইনকাম হয় তার। এই টাকায় স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকাতে থাকা সম্ভব নয়। স্ত্রী থাকে তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়। তিনি প্রতি সপ্তাহে ১০০০ টাকা পাঠান।

ঢাকাতে তিনি কোথায় থাকেন জিজ্ঞাসা করায় ৭৫ বছরের এই বৃদ্ধ জানান, তিনি মগবাজারের একটি মেছে থাকেন। তিন বেলা সেখানেই খান তিনি। নিজের জন্য এক টাকাও জামাননা তিনি। নিজের খাওয়া-পড়া টাকা বাদে বাকি সব টাকা বিকাশ করেন স্ত্রীর নাম্বারে। তার স্ত্রী অবশ্য কিছু টাকা জমিয়ে তার অগোচরেই পালাক্রমে মেয়েদের টাকা পাঠান। তিনি সবই জানেন কিন্তু এমন ভাব করেন যেন কিছুই জানেন না। কথাগুলো বলতে বলতেই চোখ মুছলেন আবুল ব্যাপারী। চোখের সামনে যে তার মেয়েদের মুখ ভেসে উঠেছে তা বুজতে বাকি রইলো না। নিজেকে কেমন যেন অপরাধী মনে হতে লাগলো। দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করলাম।

এবার জিজ্ঞাসা করলাম চাচা জীবনের শেষ ইচ্ছা কি আপনার। কিছুক্ষণের নিরাবতার পর মুখ খুললেন তিনি। বললেন, ‘গরীবের আর ইইচ্ছা! গায়ে-গতরে শক্তি থাকতেই মরবার চাই। প্রেত্তেক বেলায় নামাজে দাঁড়ায়ে এই দোয়াই করি।’

কথাটা শোনার পর তার সামনে দাঁড়ানোর শক্তিটা যেন হারিয়ে ফেলি। চোখে ভেসে ওঠে নিজের বাবার মুখটা। কতোটা দিন বাড়ি যাই না, কতোটা দিন একটু সময় নিয়ে কথা হয়না তার সঙ্গে!

উপরে