আপডেট : ১০ অক্টোবর, ২০১৮ ০৯:৩০

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আদ্যোপান্ত

অনলাইন ডেস্ক
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আদ্যোপান্ত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্বরতম ঘটনা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হবে আজ ১০ অক্টোবর। ঐতিহাসিক এই রায়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের এক ক্ষতচিহ্নে প্রলেপ লাগাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই রায়ের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতি কলঙ্কমুক্ত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ঐতিহাসিক এই রায়ের দিনে জেনে নেওয়া যাক ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আদ্যোপান্ত সকল ঘটনা। 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পুরো ঘটনা

বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে মুছে ফেলতে বঙ্গবন্ধু কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। সেদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার পরিকল্পনায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে হামলা চালায় হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা। সেই বর্বরোচিত হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল অনেক দিন ধরে, বিএনপির ডাকসাইটে নেতাদের সহযোগিতায়।

হামলার দিন দুপুরে মামলার অন্যতম আসামি মুফতি হান্নানের মেরুল বাড্ডার আস্তানায় জমায়েত হন হামলা পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা প্রায় ২০ জন জঙ্গি। এদের নিয়ে মুফতি হান্নান, মাওলানা আবু সাইদ ওরফে জাফর, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে জাহাঙ্গীর বদর ও হাফেজ আবু তাহেরসহ আরও কয়েকজন বৈঠক করেন। বৈঠকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে ইসলাম ধর্মের শত্রু আখ্যায়িত করে জঙ্গিদের হামলা করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এসব তথ্য ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলে মুফতি হান্নানের দেওয়া জবানবন্দি থেকে জানা গেছে।

বৈঠকের এক পর্যায়ে দাড়ি নেই এমন ১২ জনকে আক্রমণের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে তাঁদের ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড দেওয়া হয়। গ্রেনেড সরবরাহ করেন বিএনপির সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন। মঞ্চে আক্রমণের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয় জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের সমন্বয়ে গঠিত দলটিকে। হামলার সময় মঞ্চের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে পেট্রল পাম্পের মোড়ের কাছে অবস্থান নেয় দলটি। জান্দালই মঞ্চ লক্ষ্য করে প্রথম গ্রেনেড ছোড়ে।

দ্বিতীয় দলে ছিলেন সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বল নামের চারজন জঙ্গি। আর তৃতীয় দলে ছিলেন মুত্তাকিন, মুরসালিন, আরিফ হাসান ও ইকবালের নামের চারজন জঙ্গি।

আসরের নামাজের আগে আগে এই ১২ জঙ্গি গোলাপ শাহ মাজারে একত্রিত হন। সেখান থেকে সমাবেশমুখী মিছিলের সঙ্গে মিশে আওয়ামী লীগের সমাবেশে হাজির হন তাঁরা। এই ১২ জন সমাবেশে অংশ নিতে চলে গেলেও সেখানে তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর পাঠানো কয়েকজন যুবক ব্যাক আপ হিসেবে অবস্থান নেন।

সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা একটি ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে কুড়ি মিনিট  বক্তৃতা শেষে নিচে নেমে আসার সময় ৫টা ২২ মিনিটে শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে মঞ্চে প্রথম হামলা চালানো হয়। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড যাতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন ২১ জন। পরবর্তীতে আরও ৩ জন মারা যান যার মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের নেত্রী ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমান, তিনি ২০০৪ সালের ২৪ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।

পরিকল্পনা ছিল, জঙ্গি বুলবুল সরাসরি শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড ছুড়বেন। কিন্তু প্রথম গ্রেনেড বিস্ফোরণের পরই ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটাছুটি করতে শুরু করে মানুষ। এই ধাক্কাধাক্কিতে জঙ্গি বুলবুল পড়ে যাওয়ায় আর গ্রেনেড ছোড়ার সু্যোগ পাননি। এসময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে শেখ হাসিনাকে নিরাপদে সরিয়ে আনেন। এভাবেই নস্যাৎ হয়ে যায় শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র।

গ্রেনেড হামলার ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা

বিএনপি-জামাত জোট সরকার তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। দেশের সরকার হিসেবে তাদের দায়িত্ব ছিল গ্রেনেড হামলার ন্যায় বিচার করা ও দোষীদের শাস্তি দেওয়া। কিন্তু তা না করে তারা হামলার ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। হামলা সংঘটিত হওয়ার দিনই আহতদের উদ্ধারে সহযোগিতা না করে পুলিশ উল্টো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করতে শুরু করে। হামলার পরদিন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে। গ্রেনেড হামলার তদন্তে গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিটি ২০০৪ সালে ২ অক্টোবর ১৬২ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করে কিন্তু বিএনপি-জামাত শাসনামলে এই মামলার কোনো চার্জশিট দাখিল করা হয়নি।  তাছাড়া ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনা ধামাচাপা দিতে একের পর এক আষাঢ়ে গল্প বানাতেও শুরু করে বিএনপি সরকার। গ্রেনেড হামলার পরপরই জাতীয় সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘ওনাকে মারতে যাবে কে?’ শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন।’ 

শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িতদের বাঁচাতে সব রকম সাহায্য-সহযোগীতে দিয়েছে বিএনপি-জামাত জোট সরকার। গ্রেনেড হামলায় জড়িত জঙ্গি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানকে মামলা থেকে বাদ দিতে সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। এছাড়া হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারী সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছে রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থা।

জজ মিয়া নাটক

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার অপরাধীদের বাঁচাতে তৎকালীন প্রশাসন সকল সীমা ছাড়িয়ে যায় জজ মিয়া নাটক সাজানোর মাধ্যমে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল হোতা দাবি করে ২০০৫ সালের ৯ জুন জজ মিয়া নামে নোয়াখালীর সেনবাগের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জজ মিয়া সে সময় গুলিস্তানে সিডির ব্যবসা করতেন। সিআইডি কার্যালয়ে এনে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে ক্রসফায়ার করে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে জজ মিয়াকে সাজানো জবানবন্দি দিতে বাধ্য করে তৎকালীন সিআইডির কর্মকর্তারা। ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পর গ্রেনেড হামলার কথিত প্রধান আসামি জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন সিআইডির জজ মিয়া নাটকের ঘটনা ফাঁস করে দেন। নানা নাটকীয়তার পর ২০০৮ সালের ১১ জুন আদালতে সিআইডির দাখিল করা চার্জশিটে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় জজ মিয়াকে।  ২০১৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বহুল আলোচিত ‘জজ মিয়া’ মিয়া নাটকের পুরোপুরি অবসান হয়। সেদিন আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জজ মিয়া তাঁর ওপর তৎকালীন পুলিশি নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরের ঘটনাবলী

হামলার পরদিন ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা করেন। এ মামলাটির প্রথমে তদন্ত শুরু করে থানা পুলিশ। তার পরদিন ২৩ আগস্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হয়ে গ্রেনেড হামলা মামলার তদন্ত স্থানান্তর করা হয় সিআইডিতে। এছাড়া ২২ আগস্ট গ্রেনেড হামলার তদন্তে বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

তদন্ত কাজে সহযোগিতার জন্য ২০০৪ সালের ২৯ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এর দুই কর্মকর্তা মিস জ্যাকুলিন ও জেফ্রি আইলস এবং একই বছর ১ সেপ্টেম্বর ইন্টারপোলের কর্মকর্তা এইচ ডব্লিউ সিন, মারাস ভুসিনাস ও উইসন গিবসন ঢাকায় আসেন।

গ্রেনেড হামলার কিছুদিন পরই সে বছরের ১২ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় সংসদের ১৩তম অধিবেশন শুরু হয়। সংসদের ওই অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার শোক প্রস্তাব আনেন। কিন্তু শোক প্রস্তাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আইভি রহমানের ছাড়া আর কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এরপর ২ অক্টোবর গ্রেনেড হামলার জন্য গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ১৬২ পৃষ্ঠার তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করে। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট সরকারের অনিচ্ছায় গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিট তাদের শাসনামলে আর আলোর মুখ দেখেনি। ন্যায়বিচারও পাননি গ্রেনেড হামলায় ক্ষতিগ্রস্তরা।

তদন্ত, অধিকতর তদন্ত ও চার্জশিট

পরবর্তীতে ২০০৭ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে সে বছরের ১১ জানুয়ারি নতুন করে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নির্দেশে পূর্ণ তদন্ত শেষে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুলাই হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে আদালতে দুটি চার্জশিট জমা দেন। এই চার্জশিটে ২২ জনকে আসামি করা হয় যাদের মধ্যে জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু ছাড়া বাকি হরকাতুল জিহাদের জঙ্গি। এই চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, আবদুস সালাম পিন্টুর সহযোগিতায় হরকাতুল জিহাদের জঙ্গিরা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যা করে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার উদ্দেশ্যেই ওই হামলা চালায়।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে বছরের ১৩ আগস্ট থেকে সিআইডি কর্তৃক এই মামলার অধিকতর তদন্ত শুরু হয়। তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ২ জুলাই সিআইডি ৩০ জনকে আসামি করে আদালতে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে। চার্জশিটে উল্লেখিত আসামিরা হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া, বিএনপি-জামাত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ মোহাম্মদ কায়কোবাদ, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, এনএসআইয়ের সাবেক দুই মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার (অব.) আবদুর রহিম ও মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার, ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, পুলিশের সাবেক তিন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বকশ চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি খান সাঈদ হাসান ও সাবেক এসপি মো. ওবায়দুর রহমান, জোট সরকারের আমলে মামলার তিন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান ও এএসপি আবদুর রশিদ, হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফ এবং হুজি-বির ১০ নেতা। নিরপেক্ষ চার্জশিটে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার সম্পৃক্ততার কথা বারবার উঠে এসেছে। তারেক জিয়া ছাড়াও তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের কয়েকজন উচ্চপর্যায়ের নেতা ওই হামলায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

হামলার পরিকল্পনা করার জন্য যে সকল স্থান বেছে নিয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীরা তাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে চার্জশিটে। চার্জশিট অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ১৪ আগস্ট হাওয়া ভবনে বসেই ২১ আগস্টের হামলার মূল পরিকল্পনা করা হয়। হাওয়া ভবনের বৈঠকে তারেক রহমান আসামিদের ঘটনা বাস্তবায়নে আর্থিক ও প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। হাওয়া ভবনে বসেই তারেক জিয়া, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরী, উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ কায়কোবাদ, জামাত নেতা মুজাহিদ ও জঙ্গি হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নানরা শেখ হাসিনাকে হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করেন।

হাওয়া ভবন ছাড়াও অন্যতম আসামি জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানের বাড্ডার বাসা, আসামি আহসানউল্লাহ কাজলের মেরুল বাড্ডার ভাড়া বাসা, মিরপুরের মসজিদ-ই আকবর, আসামি সুমনের মোহাম্মদপুরের বাসা, তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির সরকারি বাসাসহ আটটি স্থানে বৈঠক করে শেখ হাসিনাকে হত্যার নীল নকশা প্রণয়ন করা হয় বলে চার্জশিটে উল্লেখ আছে।

এছাড়া তৎকালীন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর বাসায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের উপস্থিতিতে হুজির নেতাদের পরিকল্পনা সভা, হামলার আগের দিন সকালেও আব্দুস সালাম পিন্টুর বাসায় পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, মাওলানা তাহের, কাজলসহ অন্যান্য আসামিরা জড়ো হয়ে ১৫টি আর্জেস গ্রেনেড ও ২০ হাজার টাকা সংগ্রহ, আসামি আহসানউল্লাহ কাজলের মেরুল বাড্ডার বাসায় ২১ আগস্টে হামলা চালাতে কারা অংশ নেবে সে বিষয়ে বৈঠক ও পরিকল্পনার কথাও লিপিবদ্ধ হয়েছে চার্জশিটে।

মামলার বিচার কার্যক্রম

চার্জশিট দাখিলের পর ২০১১ সালেই পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের বিশেষ আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। গ্রেনেড হামলার মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানসহ ৫২ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার কাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ২৮ মার্চ বুধবার৷ বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় ওই বছর ৯ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়৷

দীর্ঘদিন বিচারকাজ চলার পর ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর মামলার অন্যতম আসামি লুৎফুজ্জামান বাবরের পক্ষে আইনি পয়েন্টে যুক্তি পেশের মধ্য দিয়ে আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক পেশ শেষ হয়। এই মামলায় মোট ৪৫ আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক পেশ করা হয়েছে। এর দেড় সপ্তাহ পর ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনগত ব্যাখ্যা উপস্থাপনও শেষ হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনগত ব্যাখ্যা উপস্থাপনের পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর ১৪ বছর বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের জন্য ১০ অক্টোবর দিন ধার্য করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দীন। একইসঙ্গে এই মামলায় জামিনে থাকা ৮ আসামির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২১ আগস্টের ঘটনায় পৃথক মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ৫২ জন। এর মধ্যে অন্য মামলায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাঁদের মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।  ওই তিন আসামি হলেন জামাত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ সাহেদুল আলম বিপুল। এখন ৪৯ আসামির বিচার চলছে যাদের মধ্যে ১৮ জন পলাতক। গ্রেনেড হামলার মূল আসামি তারেক জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে পলাতক রয়েছেন। আলোচিত এ মামলায় ৫১১ সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। আরও ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

অবশেষে বর্বরোচিত সেই গ্রেনেড হামলার ১৪ বছর পর আজ ১০ অক্টোবর ঘোষিত হতে যাচ্ছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের মধ্য দিয়ে প্রকৃতি অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে এবং ন্যায় বিচার পাবেন গ্রেনেড হামলায় ক্ষতিগ্রস্তরা এমনটাই আশা করছে বাংলাদেশের জনগণ।

উপরে