আপডেট : ১৩ মে, ২০১৮ ০৮:৩৮

মা তুমি প্রজাপতি, তুমি ফুল, তুমি রঙের পাঠশালা!

জাহিদ মিল্টন
মা তুমি প্রজাপতি, তুমি ফুল, তুমি রঙের পাঠশালা!

মা'কে প্রথম যখন দেখেছি ঠিক সেই মুহুর্তটি আমার মনে নেই। পৃথিবীতে এক নতুন শিশুর জন্ম যখন হল তখন আকাশে নতুন কোন নক্ষত্র ঝড়ে পড়েছে কিনা আমার তাও জানা নেই। মা'কে করা হয়নি জিজ্ঞাসাও কখনও। কিন্তু আমি জানি, মা শিশুটিকে তার বুকের কাছে পেয়ে ভেবে নিয়েছেন এক নক্ষত্র যেন তার পাশেই শুয়ে আছে। এই কাঁদছে, এই ঘুম। আহা কি নিশ্চুপ, এক নিশ্চিন্ত পৃথিবীর আত্বা বুকে নিয়ে মা শুয়ে বিছানায়।

শিশুটি যখন কাঁদতো মা'র কপালে চিন্তার পড়তো ভাঁজ। হাজার হাজার দুষ্ট পৃথিবীর ছায়া একে একে গ্রাস করার ভয় দেখালে মা হয়ে যেতেন জলোচ্ছাসের মতন নারী। বুকে ধরে আগলে রেখে এক আঙ্গুলে শাষিয়ে নিতেন সারা পৃথিবী, যেন ঘুমুতে বলতেন আমাকে নিশ্চিন্তে।

মা হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথমতম প্রজাপতি। পৃথিবীর প্রথমতম পাঠশালা। প্রথমতম রঙের পাঠশালা। শিশুকে আসমানে তুলে ধরে প্রার্থনা প্রথম যিনি করেন তিনিই তো মা। 

উপরে যেই শিশুটির কথা হচ্ছে সেই শিশুটি আমি কিংবা সেই শিশুটি আপনি, সেই শিশুটি আমরা সবাই।  মা এমনি কেউ যাকে পৃথিবীর কোন নারী থেকে আলাদা করা যায় না।

মা আমাদের বাড়ির পেছনে একটি অজান্তা ফুলের গাছ এক বেলায় লাগাতে দেখেছিলাম। তারপর গাছ বড় হল। গাছ থেকে ফুল ঝড়ে পড়ে সন্ধায় রোজ। অজান্তা ফুলের গন্ধটিও অজানা। তবে তা ছিল বেশ। মাকে প্রায়ই সকালে দেখতাম আমাকে নিয়ে যেতেন ঐ অজান্তা ফুলতলায়। আমাকে জল সহ ছিটিয়ে দিতেন বালক বাক্য সকল। কাল্পনিক কুয়োতলা তখন আমার লাল গোলকার প্লাস্টিকের বল।

মা আমাকে প্রথম শেখান কাকে বলে ঘাস। কেন থাকতেই হবে ঘাসের অহংকার। আমরা বিকেলে যেতাম আমাদের মাঠটাতে। বড় বড় দানব ছেলেরা যখন ক্রিকেট ফুটবলে মেতে আমি আর মা জানতাম ঘাসের কোমলতা কত আদুরে। যদিও সে পাথরের কাছে হেরে গেছে। কিন্তু মা আমাকে হারার গল্প শেখান নি। মা আমাকে বিশাল আকাশ দেখিয়েছেন। মা বলেন নি বিরক্তিকর বিজ্ঞান - আকাশের কোন রঙ নেই! আমি জেনেছি আকাশ নীল। আকাশ খুব কালো। ঝড়, এরেই বলে বৈশাখী। আকাশে ওড়ে বিমান, বিমানে বাবা ছুটে যায়। আমি ছুটে যাই জানালায়, মা আমার পিছপিছ খাবারের থালা হাতে, ক্রমশ মিলায়ে যায় উড়জাহাজ। আমার গলা দিয়ে নেমে যায় ভাত মাখা মায়ের হাত।

আমি জানি একসময় মায়ের সাথে খুব সম্পর্ক ছিল রজনীগন্ধার। সন্ধ্যেতে এরা গুটিকয়েক ঘরে আসতো। প্রায় রোজই রবীন্দ্রনাথ আসতেন। আমাদের পরিবারের মুরুব্বী স্বরুপ,কিছু ভাবগম্ভীর আলোচনায় অংশ নিতেন। আসলে মা রবীন্দ্রনাথকে ভালবাসতেন। একদিন টিপটিপ বৃষ্টিতে মা গেয়ে শোনালেন রবীন্দ্রনাথ। আর হঠাৎ বৃষ্টির ফোঁটাকে মনে হল আমার মা'র প্রতিনিধিত্ব করছে। আমি ক্রোধে কেড়ে নিলাম সিংহাসন বৃষ্টির, মুছে দিলাম মায়ের চোখ আর আমি কেঁদে দিলাম। আজো আমার জিজ্ঞেস করা হয় নি জলের সাথে তোমার কি সম্পর্ক মা?

মা'র মুখে হাজারো রঙ। শহরে রঙের সংকট দেখলেই মনে পড়ে মা'র কথা। শহরে এক প্রেমিকাকে দেখলে যখন ভাবি আবারও কিছু রজনীগন্ধা কি আমার ঘরে আর ঢুকবে না? আমার মনে পড়ে মায়ের কথা। বাসে হঠাৎ কোন নারী উঠলে যদি জায়গা না পাই আমাকে ছেড়ে দিতে হয় জায়গা, আমার মনে পড়ে মায়ের কথা। আধোগুপ্ত কান্না জাগা রাতে; মা, যে রাতে এখন ঘুম আসতে চায় না, বুকের গভীর জঙ্গল থেকে ডাক দেই মা...............।

মা এসে এসে বিছানার ধারে চোখ দিয়ে নামায় কবিতা আমার শরীরে। মা'র চোখ দিয়ে ঝড়ে পড়া একটা কবিতাকেও বুঝতে পারি নি আজও। এও এক প্রশান্তি আর অশান্তির তুমুল মহামিলন। মানে নেই কোন কিছুরই, কেবলি রজনীগন্ধার গন্ধ। মায়ের শরীর যেন অতল সমুদ্রের চেয়ে অতল। ডুবে যেতে যেতে ডুবে যাই, তবে কেউ গ্রাস করে নেয় না। সেচ্ছায় বালুর ঢিবিতে গেড়ে দেই মাথা।

মা, তোমাকে ভালবাসি অনেক। এও এক ব্যর্থতা, যেমন আমার আর কোন ভাষা নেই। মা, তুমি রঙের প্রজাপতি। আরেকটু আকাশ পেলে নিজেকে কোথায় নিয়ে যেতে?

আমি আসছি মা। আমরা আকাশ পথে একদিন সমুদ্রে গিয়ে নামবো। যেখানে আমরা হাঁটছিলাম আর তুমি বলছিলে নামিস না ... নামিস না। আমি পা ভিজিয়েছিলাম। তুমি বালুতে হাঁটলে, পায়ের পাতাও স্বমর্যাদায় ভেজালে না।

মা’কে বলেছি মা, তুমি প্রজাপতি, তুমি ফুল, তুমি রঙের পাঠশালা।

বিডিটাইমস৩৬৫/জামি

উপরে