আপডেট : ১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:১২

বর্জ্যজীবীদের অমানবিক জীবন...

অনলাইন ডেস্ক
বর্জ্যজীবীদের অমানবিক জীবন...

রবিউল থাকেন কারওয়ান বাজারে রেললাইনের পাশের বস্তিতে। বাবা কারওয়ান বাজারে বর্জ্য ফেলার কাজ করত। কিছূদিন আগে বার্ধক্যজনিত রোগে মারা যায় রবিউলের বাবা। বাবার উত্তরসুরি হিসবে বর্জ্য পরিস্কারের কাজটি পায় রবিউল। ঘরে মা অসুস্থ্য। দিন শেষে যে টাকা পায় তা দিয়ে মায়ের চিকিৎসা সহ কোন রকম খেয়ে পরে বেঁচে আছে রবিউল। শুধু রবিউলই নয় এরকম হাজারো বর্জ্যজীবী রবিউলরা মানবেতের জীবন যাপন করছে।

বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্খাপনা বা নাড়াচাড়ায় বিভিন্ন ধরনের কর্মীরা জড়িত। যেমন : বাসাবাড়ী থেকে ভ্যানে করে বর্জ্য সংগ্রহকারী ও তা নিকটস্থ ডাস্টবিন বা ট্রান্সফার সেন্টারে ফেলার ভ্যানচালক ও তার হেলপারগণ, সিটিকর্পোরেশনের রাস্তার ঝাড়ুদারগণ, রাস্তার পাশের ডাস্টবিন, খোলা রাস্তার উপর বা ড্রেনে বা যে কোন স্থানে জমা বর্জ্য পরিবহনের ট্রাকচালক হেলপারগণ, রাস্তা-নদীর ঘাট ও ট্রেন স্টেশন, শহরের ডাস্টবিনও আবর্জনার স্তুপ থেকে নিজের উদ্যেগে আবর্জনার বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহকারী বর্জ্যজীবীরা, ভাঙ্গারী দোকান বা রিসাইক্লিং- এর জন্য তৈরি করার ছোট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বর্জ্যজীবীরা দিনমজুর( বর্জ্যের ধরণ অনুযায়ী পৃথক করা, ধুয়ে পরিস্কার করা, যন্ত্রেরমাধ্যমে বর্জ্যকে প্রক্রিয়াজাত করা, যেমন; মেশিনে গরু-ছাগল-মহিষের হাড় ভেঙ্গে ছোট টুকরা করা, প্লাস্টিক বোতল কেটে ছোট ছোট টুকরা করা, গাড়ীর ব্যাটারীর প্লাস্টিক- ধাতব অংশ আলাদা করা, কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আলাদা করা)।

প্রাতিষ্ঠানিক কর্মীরা সিটি কর্পোরেশনে বা পৌরসভায় চাকুরিভূক্ত কর্মচারী এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মীরা স্বাধীন-স্বনিয়োজিত বর্জ্য জীবী ও বর্জ্যজীবী দিনমজুর। বর্জ্য নাড়াচাড়ায় যারা জড়িত তাদের প্রায় সবাই কোন ধরণের নিরাপত্তা উপকরণ ব্যবহার ছাড়াই খালি হাতে, খালি পায়ে ও কোন মাস্ক ছাড়াই কাজ করে।

২০০৫ সালে সরকারের হিসেবে দেখা যায়- বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩৬ হাজার টন মেডিক্যাল বর্জ্য তৈরি হয়। যার ৭ হাজার ২শ টন অত্যন্ত ক্ষতিকর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্রমতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরী গুলোতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দূর্বল। এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ডাস্টবিনে ব্যবহার করা সিরিঞ্জ, রক্তের ব্যাগ, স্যালাইনের ব্যাগ. নানান ঔষধ, শরীরের কাটাছেড়া অংশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

বর্জ্যজীবীরা শহরের ডাস্টবিন ও ডাম্পিং সাইট বা ল্যান্ডফিল থেকে বর্জ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এ পেশাটি হলো শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিশু, কিশোর-কিশোরী, নারী ও পুরুষের আয় একটি পেশা । বর্জ্যজীবীরা উচ্ছিষ্ট খাবার, কাগজ, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর বর্জ্য, টিন ও টিনজাত দ্রব্য, ভাঙ্গা কাঁচ, লোহার টুকরা, কাঠ, জুতা-স্যান্ডেল, ব্যবহার করাসিরিঞ্জ, রক্ত ও স্যালাইনের ব্যাগ, প্লাস্টিক বোতলও প্লাস্টিক দ্রব্য, এক্স-রে প্লেট,পলিথিন, রাবারে সামগ্রী, হাড় ইত্যাদি সংগ্রহ করে থাকে।

বর্জ্যজীবী হলো একটি শহুরে জনগোষ্ঠী যারা শহরের ডাস্টবিন ও ল্যান্ডফিল ( আবর্জনা ডাম্পিং সাইট ) থেকে বিক্রয়যোগ্য ও পুন:ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন শ্রেণিতে আলাদাকরে ও বিভিন্ন উপায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে তা বিক্রয় করে থাকে বা নিজেরা ব্যবহার করে থাকে। অধিকাংশ বর্জ্যজীবীই দারিদ্র, পারিবারিক কলহ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সর্বশান্ত হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে। তাদের মধ্যে অনেকেই বর্জ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এ পেশাটি হলো শহরের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর শিশু,কিশোর- কিশোরী ও নারীদের আয় করার একটি স্বাধীন ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক পেশা। এদের অধিকাংশ মানুষই গ্রামীণ দারিদ্রের কারণে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের দ্বারা উদ্বাস্তু হয়ে শহরে এসেছে।

বর্জ্যজীবীরা রাস্তার পাশের ডাস্টবিন এবং ওয়েস্ট ডাম্পিং সাইট(ল্যান্ডফিল) থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে। অধিকাংশই বর্জ্যজীবীরা রাস্তার পাশের ডাস্টবিন এবং ওয়েস্ট বা শহরে গৃহহীন অবস্থায় বাস করে। প্রতিদিনই তাঁরা কাঁধে একটি বস্তা এবং হাতে একটি আরচা ( লোহার দন্ড যার মাথা বাঁকা) নিয়ে বর্জ্য ঘাটাঘাটি করে প্রয়োজনীয় বর্জ্য বের করে, তাইর’নবী কার্টুনিস্ট এদেরকে ‘টোকাই’ বলেছেন।

বর্জ্যজীবীরা উচ্ছিষ্ট খাবার, কাগজ ওপ্যাকেজিং ম্যাটেরিয়াল, প্লাস্টিক বোতল ও বোতলের কর্ক, ব্রাশ, বলপেন, আইসক্রিম পট, প্লাস্টিক পাইপ এবং অন্যান্য প্লাস্টিকজাত দ্রব্য, ভাঙ্গা কাঁচ,টিন, লোহার টুকরা, কাঠ, জুতা-স্যান্ডেল, ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া সিরিঞ্জ, রক্ত ও স্যালাইনের ব্যাগ, ছেঁড়া বা উচ্ছিষ্ট কাপড়, গার্মেন্টসফ্যাক্টরীর বর্জ্য, চুল,টিন ও টিনজাত দ্রব্য, এক্সরে পেপার, পলিথিন, রাবারের সামগ্রী, হাড় ইত্যাদি সংগ্রহ করে থাকে। বর্জ্য সংগ্রহ করার পর তার গুণগত মান বাড়ানোর জন্য সেগুলো তারা নানাভাবে পরিস্কার করে বা কখনো কখনো পানি দিয়ে ধোয়ামোছা করে। বর্জ্য সংগ্রহ করে তা পরিস্কার করার পরই তারা সেগুলো নিয়ে বর্জ্য বিক্রির দোকানে ( ভাঙ্গারী/কাগজ/ঝুট-এর দোকান) আসে।

বর্জ্যজীবীরা বর্জ্য সামগ্রী সংগ্রহের সময় নানাভাবে শারীরিকভাবে আহত হয় এবং দূর্ঘটনার শিকার হয়। তারা ধারাল বন্তু, ভাঙ্গা কাঁচ,মেডিকেল বর্জ্য দ্বারা নানাভাবে আক্রান্ত হয়। তাদের কাজ সর্বদাই ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায়শই যারপরিণতি শারীরিক প্রতিবন্ধিত্ব। এই জনগোষ্ঠী অত্যন্ত খারাপ পরিবেশে খালি হাতে- পায়ে বর্জ্য সংগ্রহ করার ফলে তারা নিয়মিতই বিভিন্ন ধরনের রোগের শিকার হয়ে থাকে।

বর্তমানে বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার বিদ্যমান বর্জ্য ব্যবস্খায় মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্খাপনায় কঠিন বর্জ্যসমূহ অপসারণ ব্যবস্থাব আদৌ পরিবেশসম্মত নয়।

প্রথমত: নগরে শিল্পজাত ও হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণের দক্ষ আলাদা ব্যবস্থা নেই। ২০০৯ সালের বাংলাদেশ সরকারের দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্রে শহরের দরিদ্র বর্জ্যজীবীদের মেডিকেল বর্জ্য দ্বারা মারাত্নকভাবে ক্ষতিরশিকার হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে তারা নানারকম ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে – টাইফয়েড, কলেরা, যক্ষা, আমাশয়, ডায়রিয়া, এইচআইভি সংক্রমণ, নানা ধরণের চর্মরোগ,জন্ডিস, নিউমোনিয়া, ম্যালেরিয়া। এর পাশাপাশি বিভিন্নভাবে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে যায়, কখনোবা কাজ করার সময় দূর্ঘটনায় শরীরের কোন অংশ থেতলে যায় বা অঙ্গহানি ঘটে। এসবই ঘটে বর্জ্যজীবীদেরজ্ঞান সচেতনতার অভাবের কারণে। এছাড়া বর্জ্যজীবীরা অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের শিকার হয়ে প্রতিনিয়তই স্বাস্থ্যহীনতায় ভূগছে।

উপরন্ত, তারা শারীরিক অসুস্থ্যতায় তেমন কোন ডাক্তার বা হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারেনা। রুগ্ন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তির অভাবের ফলশ্রুতিতে তাদের অনেকেরই অকালমৃত্যু ঘটে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে শহরে শতকরা ১ ভাগ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বর্জ্যজীবী হিসাবে জীবিকা নির্বাহ করে। এই হিসেবে বাংলাদেশে আনুমানিক ৪ লাখ বর্জ্যজীবী রয়েছে। শুধুমাত্র ঢাকাতেই প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার দরিদ্রমানুষ পুন:চক্রায়ন বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে জড়িত আছে। ক্ষতিকর ও দূর্গন্ধযুক্ত বজ্য সংগ্রহ, ঠিক জায়গামত নিয়ে ফেলা এবং রিসাইক্লিং- এ এসব মানুষদের অবদান অসামান্য।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে