আপডেট : ২৮ মার্চ, ২০১৬ ২০:৩৩

ওমানের সুলতান: আরব্য রজনির শাসক

বিডিটাইমস ডেস্ক
ওমানের সুলতান: আরব্য রজনির শাসক

অন্য সব আরব নৃপতি, তা তারা যতদিন ধরে ক্ষমতায় থাকুন না কেন, ২০১১ সালে তাঁদের সকলকে বিদায় নিতে হয়। না, সবাইকে নয়। ওমানের জনপ্রিয় সুলতান চার দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যশাসন করছেন।আরব নৃপতিদের মধ্যে ওমানের সুলতান কাবুস বিন সঈদ আল-সঈদ এক ধরনের ব্যতিক্রম বলা চলে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য যে কোনো রাজার চেয়ে বেশিদিন রাজত্ব করছেন তিনি । ১৮ই নভেম্বর তারিখে ৭৫ বছর পূর্ণ করলেন সুলতান কাবুস, সেই সঙ্গে তাঁর রাজত্বের ৪৫ বছর।

সুলতান কাবুস ওমানকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে গেছেন অধীর গতিতে। ৪৫ বছর আগে ওমান ছিল আরব বিশ্বের সবচেয়ে পিছনে পড়ে থাকা দেশগুলির মধ্যে একটি। অপরদিকে বিশ্বের যে সব দেশ সবচেয়ে বেশি প্রগতি করেছে, জাতিসংঘের হিসেবে আজ ওমান সেই তালিকার শীর্ষে।

সুদূর অতীতে ওমানের খ্যাতি ছিল তার ধূপধুনার জন্য, পরে তামার ব্যবসায় সেইরকম নাম করে ওমান। সতেরো আর আঠেরো শতাব্দীতে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের একটা বড় অংশ ছিল ওমানের সুলতানের তাঁবে, এমনকি তিনি কিছুকাল করে জাঞ্জিবারেও বাস করতেন। উপনিবেশবাদের আগমনের পর ওমান তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব হাবিয়ে ফেলে।

৪৫ বছর আগে শুধুমাত্র রাজধানী মাস্কাট-এ বাঁধানো পাকা রাস্তা ছিল। কলে খাবার পানি কিংবা বিদ্যুৎও যে সবসময় পাওয়া যেতো, এমন নয়। আজ ওমানের রাস্তাঘাট দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তগুলি অবধি চলে গেছে। সবচেয়ে দূরের বসতিগুলিতেও স্কুল ও হাসপাতাল আছে। সারা দেশে ২০টির বেশি কলেজ ও ইউনিভার্সিটি...।

ওমান সরকার বিশেষ করে নারী প্রগতিতে উৎসাহী। ওমানে মহিলারা স্বচ্ছন্দে চলাফেরা ও পড়াশুনা করতে পারেন। রাষ্ট্রীয় সুলতান কাবুস বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরুষ ছাত্রদের জন্য কোটা রাখা রয়েছে, কেননা স্কুলকলেজে মেয়েরাই সাধারণত ভালো ফলাফল করে থাকে।

ওমানের আয়তন সাবেক পশ্চিম জার্মানির সমান, অথচ জনসংখ্যা মাত্র ৪০ লাখ৷ সে হিসেবে ওমানকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বসতির দেশগুলির মধ্যে ফেলা চলে। দেশের একটা ব্যাপক অংশ মরুভূমিতে ঢাকা৷ দেশের তেলসম্পদ সীমিত, কাজেই সরকার অর্থোপার্জনের অন্যান্য পথ খুঁজছেন – যেমন পর্যটন।

মাস্কাট বন্দরে যেমন একদিকে বড় বড় ক্রুইজশিপ বাঁধা, অন্যদিকে তেমন পুরনো আমলের ঢাউস নৌকা দেখা যায়৷ সেই সঙ্গে রয়েছে নানা লাক্সারি হোটেল। আপাতত মাস্কাট বিমানবন্দরকে বাড়ানো হচ্ছে৷ সব মিলিয়ে পর্যটকদের সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

খনিজ তেল থেকে আয় যেভাবে কমে আসছে, পর্যটনশিল্পের পক্ষে তা পূরণ করা সম্ভব নয়৷ আজ ওমানের জিডিপি-র ছয় শতাংশেরও কম আসে পর্যটন থেকে৷ ওদিকে জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে, বাড়ছে তাদের চাহিদা ও দাবিদাওয়া।

প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ ওমানি বেরচ্ছেন স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি থেকে – কাজের খোঁজে৷ আর তাদের সকলেই যে চাকরি পাচ্ছেন, এমন নয়৷ বিশেষ করে তরুণ জনতার মধ্যে বেকারত্ব বেশি৷ অধিকাংশই সরকারি চাকুরি করেন, কেননা সেখানে বেতন ও সুযোগসুবিধা বেশি।

আরব বসন্তের টানে ওমানেও বিক্ষোভ মাথা চাড়া দিয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আর জীবনযাত্রার উন্নতির দাবিতে আন্দোলন করেন৷ সরকার বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেবার পর বিক্ষোভ থামে৷ তবে বিক্ষোভে একজন মানুষের প্রাণহানি বিশেষভাবে শান্তিপ্রিয় বলে পরিচিত ওমানকে সচকিত করে।

ওমানের মুসলিমদের অধিকাংশ হলেন ইবাদি মুসলমান। ইবাদিরা নিজেদের সুন্নি বা শিয়াপন্থিদের অংশ বলে মনে করেন না – যে কারণে সুলতান কাবুস তাঁর দেশকে উপসাগরীয় এলাকার যাবতীয় শিয়া-সুন্নি বিরোধ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন।

সুলতান কাবুস-এর শাসনের পঁয়তাল্লিশতম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে টি-শার্ট থেকে শুরু করে টাইপিন অবধি সর্বত্র তাঁর ছবি দেখতে পাওয়া যাবে। বহু দশক ক্ষমতায় থাকার পরও নৃপতি ঠিক আগের মতোই জনপ্রিয়৷ তবে ৭৫ বছর বয়সি সুলতানের উত্তরাধিকারী নিয়ে চিন্তা মানুষের মনে উঁকিঝুঁকি মারছে৷ সন্তানহীন নৃপতির পর কে সুলতান হবেন, তা পুরোপুরি অজ্ঞাত৷ ওদিকে সামনে রয়েছে অতীত ও ভবিষ্যতের নানা প্রশ্ন...।

উপরে