আপডেট : ২৪ মার্চ, ২০১৬ ১৭:৪৩

স্টার জলসার দাপটে বদলে যাচ্ছে বাংলার নারী

পরাগ মাঝি
স্টার জলসার দাপটে বদলে যাচ্ছে বাংলার নারী

গ্রাম বাংলার নারীদের চিরায়ত রূপটির কথা একবার ভেবে দেখুন। কি দেখছেন?

দেখছেন, পরম মমতাময়ী এক মায়ের মুখ। সরল আনন্দে উদ্ভাসিত এক বোনের মুখ। লাজুক লতার মতো পাপড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোন প্রিয় রমনীর চোখ! তাই নয় কি?

এবার ভেবে দেখুন, বর্তমান বাস্তবতার দিকটি। কি দেখলেন, মিলেছে কি? জানি, মিলবেনা। না মিলার কি তবে কারণ? অনেকেই হয়তো যুক্তি দেখাবে আধুনিকতার কথা বলে। তবে আধুনিকতা আর যাই হোক, ভারতীয় সিরিয়ালগুলো যে শিক্ষা দিচ্ছে, তাতে যে আধুনিকতার কোন ছোঁয়া নেই, বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন যে কোন লোকই চোখ বন্ধ করে তা মেনে নেবেন। কারণ, পরনিন্দা, পরচর্চা কিংবা পরকীয়ার মতো সভ্যতার উল্টোমুখী এই দিকগুলো কোনক্রমেই আধুনিকতার অংশ হতে পারেনা। আধুনিকতার বসবাস মানুষের মেধা ও মগজে। কোনভাবেই তা শারীরিক বেশ-ভূষা কিংবা অঙ্গভঙ্গী এবং আচরনের অংশ হতে পারে না।

দু:খজনক হলেও সত্য যে, ভারতীয় বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের কাল্পনিক কিছু চরিত্র সারাদিনই দাপাদাপি করে বেড়ায় আমাদের দেশের নারীদের মন ও মগজে। আর তাই এসব সিরিয়ালের মতই নাটকীয় মোড় নিচ্ছে তাদের জীবনও। ফলে বাড়ছে সামাজিক দূর্ঘটনা থেকে শুরু করে নানাবিধ অশান্তি।

বাংলাদেশে শহুরে সুশিক্ষিত মেয়েদের মধ্যে এসব সিরিয়ালের প্রভাব অনেকটা কমই বলা যায়। কিন্তু বর্তমান সময়ে এদেশের গ্রাম বাংলার রূপটি সম্পূর্ন ভিন্ন। সর্বনাশা নেশার মতোই সেখানে বিস্তার লাভ করেছে এসব বিজাতীয় টিভি সিরিয়াল।

সিরিয়ালে বুঁদ হয়ে থাকা গ্রামীন নারীরা আসলে ধীরে ধীরে তাদের নিজস্বতা হারাচ্ছেন। কাজে অমনোযোগের পাশাপাশি হয়ে ওঠছেন সমাজ এবং পরিবারের বোঝাও। কারণ নিজেকে হারিয়ে ফেলা কোন মানুষ কখনো সৃষ্টিশীল হতে পারেনা। তখন চেতন কিংবা অবচেতনে অন্যের কাঁধে ভর করেই সাধারণ হাসি আনন্দে তাদের সময়গুলো কেটে যায়। ফলে কু-চিন্তা, কু-অভ্যাস এসব অবক্ষয়ে নিজের অজান্তেই ডুবে যাচ্ছে তারা। এ জীবনের মূল্য কি তবে?

এবার আসি সিরিয়াল প্রসঙ্গে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, ভারতীয় সিরিয়াল তো নয়, যেন সিরিয়াল কিলার!

তা নয়, তো কি?

এদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার দিকে চোখ রাখলেই ব্যপারটা পরিষ্কার হবে আপনার কাছে। সাধারণ গাল-গপ্প এবং নির্মাণশৈলীর দিক থেকে নিম্নমানের এই সিরিয়ালগুলোর প্রভাব এমনই যে, দু-এক বছরের মধ্যেই এদেশে ঘটে গেছে বেশ কয়েকটি আত্মহত্যা থেকে শুরু করে হত্যাকান্ড পর্যন্ত! আর নারীদের পরচর্চা, পরকীয়ার পালেও লেগেছে দারুণ হাওয়া।

এবার কয়েকটি ঘটনার পর্যালোচনা করা যাক-

শুনে অবাক হবেন, ভারতীয় সিরিয়াল দেখতে না দেয়ায় নাকি ইমন আলী (৭) নামে এক শিশু গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ইমন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার দড়ি রাজনগর গ্রামের বাউলশিল্পী শের আলীর ছেলে। তার মা ঘরের বাইরে থেকে দরজা আটকিয়ে পাশের বাসায় সিরিয়াল দেখতে গিয়েছিলেন।

গত বছরের মাঝামাঝিতে ভারতীয় সিরিয়াল দেখতে না দেওয়ায় কীটনাশক খেয়ে মরে যেতে চেয়েছিলো মনিরা (১২) নামে এক শিশু গৃহ পরিচারিকাও। রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকার একটি বাসায় মনিরা থাকতো। তার মনিব দম্পতি জানায়, মনিরা ভারতীয় সিরিয়াল দেখার পাগল। অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও সে সিরিয়াল দেখছিল। এ সময় তাদের ছেলে নীরব স্কুল থেকে এসে চ্যানেল বদলে কার্টুন দেখতে শুরু করে। এই অভিমানেই মনিরা ছারপোকা মারার ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

তবে এমন অভিমানে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যায় সফল হয়েছিল সাভার পৌর এলাকার বাড্ডা মহল্লায় বসবাস করা রিয়া আক্তার নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী। স্টার জলসার সিরিয়াল নাটক ‘বোঝে না সে বোঝে না’ দেখতে না দেওয়ায় মায়ের ওপর অভিমান করে তিনি অন্যভূবনে পাড়ি জমান। সে ছিল কিশোরগঞ্জের তাড়াইল এলাকার মাহবুবুর রহমানের একমাত্র সন্তান। মাহবুবুর রহমান সাভারে আণবিক শক্তি কমিশনে চাকরি করেন।  

এ তো গেল সিরিয়াল দেখতে না পারার দু:খের কথা। ঝিলিক এবং পাখি জামা কিনতে না পারার দু:খেও আত্মাহুতি দিয়েছে এদেশের একাধিক শিশু!

সিরিয়ালজনিত কারণে নি:স্ব হওয়ার গল্পটি আরও চমকপ্রদ। সে তালিকায় নাম লিখিয়েছিল ১৬টি পরিবার। ভারতীয় সিরিয়াল কিরণমালায় এইসব পরিবারের সদস্যরা এমনই বুঁদ হয়েছিলেন যে, রান্না ঘর থেকে আগুন লেগে পুড়ে যায় তাদের বাড়ি-ঘর।

একটি রোমহর্ষক গল্পও জেনে নিন।নাটোরে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপনের দাবিতে এক কিশোরকে হত্যার ঘটনায় আটক করা হয় তার তিন সহপাঠীকে। পরে তাদের স্বীকারোক্তি থেকে জানা যায়, ভারতীয় সিরিয়ালের আদলে তারা তাদের বন্ধুকে অপহরণ করে ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করতে চেয়েছিলো। তারা তাদের বন্ধু তুষারকে মেরে সেপটিক টেংকে লুকিয়ে রেখেছিলো।

পোশাকের পর নাকি বিভিন্ন টিভি সিরিয়ালের প্রভাব পড়ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের লেখার খাতায়ও। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার বিভিন্ন স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের হাতে দেখা যায় ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের নায়ক-নায়িকাদের রঙ্গিন ছবিযুক্ত মলাটের খাতা। সে এলাকার বিভিন্ন দোকানীরা জানায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই বেশীর ভাগ সময় দোকানদারের কাজ থেকে এইসব খাতা চেয়ে নিচ্ছে। এসব খাতার নাকি ব্যাপক চাহিদা।

এবার একটি মজার খবর! যশোর শহরের ঘোপ বেলতলা এলাকায় স্টার জলসা সিরিয়াল কিরণমালা দেখা নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক দম্পতি।

সিরিয়ালের মতো এসব কাহিনী বলেও শেষ করা যাবে না।

তবে কথা হলো এই যে, বাংলাদেশে প্রায় ২৩ টি টিভি চ্যানেল রয়েছে। কিন্তু তারপরও দেশের দর্শকরা দেশি চ্যানেলের নাটকের চেয়ে ভারতীয় চ্যানেলের বাংলা নাটকগুলোই বেশি দেখছেন। এর প্রধান কারণগুলো কি?

এক জরীপে জানা গেছে, মূলত দেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে বিঞ্জাপন আধিক্যের কারণের দর্শকরা বিদেশি এই চ্যানেলগুলোতে চোখ দিচ্ছে। ভারতীয় জি বাংলা, স্টার জলসা এখন বাসার ড্রইংরুমে খুব জনপ্রিয়। নাটকের সিরিয়াল ও বিভিন্ন রিয়েলিটি শোই তাদের মূল আকর্ষণ। মূলত পরিবারের সুখ দূ:খ নিয়ে এসব নাটকগুলোর ঘটনা সাজানো হয়। এছাড়া নাটকগুলোতে লাইট ও মেকআপের ব্যবহার করে গ্লামারসভাবে উপস্থাপন করাও দর্শক আকর্ষণের মূল কারণের একটি। এছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড, মিউজিক ও গানের ব্যবহার করে নাটকগুলোতে থ্রিল ধরে রাখা হয়। তাই দর্শকরা সব সময়ই উম্মুখ হয়ে থাকে এর পর কি ঘটবে তা দেখার আশায়।

আর আমাদের দেশে এর ফল কী হতে পারে, তা তো জানাই আছে। হয়তো অচিরেই ঘটে যাবে আরও একটি দুর্ঘটনা, যা আমাদের ছিলোনা আশায়।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে