আপডেট : ১৬ মার্চ, ২০১৬ ১৪:০০

ভালোবাসার উন্মাদনা ও জুনায়েদ

মাকসুদ-উন-নবী
ভালোবাসার উন্মাদনা ও জুনায়েদ

কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেকে খুব ধার্মিক কিংবা ব্যক্তিত্ত্ববান প্রমাণ করার জন্য বলেন, আমি কোনোদিন প্রেমে পড়িনি। বস্তুত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটা মিথ্যা কথা। কৈশোর, তারুণ্য কিংবা প্রাপ্তবয়সের যেকোনো স্তরে প্রতিটি পুরুষের জীবনে এক টুকরো হলেও প্রেমের গল্প থাকে। থাকাটাই স্বাভাবিক। নারী, প্রেম, ভালোবাসা, জীবনে সুখানুভূতি আনে। মন রাঙায়, জীবন সাজায়। তাই, যুগে যুগে ভালোবাসার মানুষকে ঘিরে বহু ত্যাগ, চেষ্টা কিংবা যুদ্ধের গল্প কম নয়।

আধুনিককালেও ভালোবাসার রং ছড়িয়েছে সর্বব্যাপী। তবে, ভালোবাসার ছড়াছড়ির সঙ্গে বাড়াবাড়িও চলছে হাতে হাত রেখে। সম্প্রতি, জুনায়েদ নামের এক কিশোরের প্রেমসংঘাত সংক্রান্ত ভিডিওটি ভালোবাসার চরম উন্মাদনার কথাই জানান দিচ্ছে। জুনায়েদের মতো এমন অপরিণত ও খামখেয়ালি প্রেম অহরহই তৈরি হয়, ঝরেও যায়। এ যেন ভালোবাসার যথেচ্ছ ব্যবহার।

আত্মসম্মান, ক্যারিয়ার, পরিবার সব কিছুর ওপর এখন একটি মেয়েকে পাওয়াটাই যেন তরুণদের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধ্যয়ন, অধ্যবসায়, জীবনে বড় হওয়ার লক্ষ্য কিংবা মা-বাবার স্বপ্ন পূরণের দায় পেছনে ফেলে কোনো মেয়ের পেছনে ছুটে চলেছে বহু তরুণ। ক্লাস, পরীক্ষা, মা-বাবা ও ভাইবোনদের নিয়ে ভাবনার চেয়ে ওই মেয়েটির মন জয় করতেই ভীষণ প্রয়াসে মত্ত! প্রয়োজনে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে হলেও তাকে পেতেই হবে। কখনো বা অপরিণত বয়সে হুটহাট বিয়ে করে লেখাপড়ার ইতি টানে। স্বল্প পরিচিত মেয়েটির জন্য দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে অপমান কিংবা মারধর করতেও হাত কাঁপে না! আবার কখনো, ভালোবাসার উসিলায় কোনো রকমে মেয়েটির শারীরিক সান্নিধ্য লাভ করাটাই জীবনের চরম অর্জন মনে করে। সত্যিই! ভালোবাসার উন্মাদনাই বটে। কিন্তু, এগুলো কী আসলেই ভালোবাসা? সম্ভবত না।

সাম্প্রতিক সময়ে মেয়েদের বাহ্যিক সৌন্দর্য কিংবা শারীরিক স্পর্শের মোহটাই বেশি কাজ করে টগবগে তরুণ মনে। জুনায়েদের ওই ভিডিওটিতে একটি মেয়ে সম্পর্কে বলতে শোনা যায়-খায়া ছাইরা দে। যতই অস্বীকার করুন, ইদানীংকার উঠতি তরুণ বা কিশোরদের মাঝে ভালোবাসার নামে এসব নোংরামির চর্চাই বেশি হচ্ছে। আর ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেরা এ ক্ষেত্রে বোধয় এগিয়েই আছে।

তরুণ বয়সে কোনো সুন্দর মেয়েকে ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু ছাত্র থাকা অবস্থায় সেই ভালোলাগাটাকে কতখানি গুরুত্ব ও প্রশ্রয় দেওয়া উচিত কিংবা কীভাবে দেওয়া উচিত, সেই বোধের জায়গাটা কোথায়? আসলে সমাজের লক্ষ্যবিহীন চলমান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যে পথ দেখায়, ওরা সেই পথেই হাঁটে। কাজেই দায়টা একতরফা কিশোর বা তরুণদের নয়।

একটি মেয়েকে পাওয়াই যখন আধুনিক নাটক-সিনেমার গল্পের মূল উপজীব্য, তখন একেকজন জুনায়েদ ব্যতিক্রম কিছু নয়। সাম্প্রতিক সময়ে টিভি নাটকগুলোর বেশির ভাগেরই নির্মাতা কমবয়সী। সস্তা প্রেমের গল্পে তরুণ মনকে ব্ল্যাকমেইল করাই এসব নাটকের অর্জন।

১৪ ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস এলেই সাহসী প্রেমের গল্প নিয়ে কয়েকটি নাটক প্রচার করা হয়। কমবেশি সেগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে। কয়েকটি নাটকের গল্প বেশ সুন্দর শিক্ষনীয় বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু, বেশির ভাগই অন্তসারশূন্য কথিত সাহসী গল্প। এই সাহসী হওয়া মানে দেখানো হয়েছে, মা-বাবাকে উপেক্ষা করে একটি মেয়ের জন্য বেরিয়ে পড়া। এবারের ভালোবাসা দিবসে শতডানার প্রজাপতি নাটকটিতে দেখা যায়, মাত্র অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ পড়ুয়া দুই শিক্ষার্থী উচিত-অনুচিত বিবেচনা না করে, কেবল ভালোবাসার মোহে পালিয়ে যায় অভিভাবকদের অগোচরে। এ ধরনের অপরিপক্ব ভালোবাসার পরিণতি কী? তা বোঝা কারোর জন্য কঠিন নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব কাঁচা  ভালোবাসার গল্প থেকে অবচেতনভাবে শিক্ষা নিচ্ছে কিশোর-তরুণদের অনেকেই। তাই পছন্দের মেয়েটির পেছনে ছুটে চলেছে পাগলা ঘোড়ার মতো। মা-বাবা কত কষ্টের টাকা খরচ করে কত আশা নিয়ে ছেলেমেয়েদের শহরে পাঠাচ্ছে লেখাপড়া করতে। আর ওই সব ইয়ো ইয়ো কিডস্ মার্কা নয়া নাট্যনির্মাতারা কেবল একটা বার্তাই দিয়ে চলেছে: প্রেম কর, শুধুই প্রেম করো।   

আজকাল কমবেশি সব সিনেমাতেও ওই একই কাহিনী। একটা মেয়েকে পাওয়ার জন্য মারামারি, গোলাগুলি, খুনাখুনি, মা-বাবাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা ইত্যাদি।

বলা হয় সংস্কৃতি সমাজের দর্পণ। আমাদের খাপছাড়া সংস্কৃতি চর্চার ভাঙ্গা দর্পণের প্রতিবিম্বই হয়ে উঠছে তরুণসমাজ। তাই হয়তো নিজের প্রতি দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করাটা ভুলতে বসেছে তারা। সঙ্গে আত্মসম্মান বোধটুকুও।

তরুণদের কাজ শুধু মেয়েদের পেছনে ছুটে বেড়ানো নয়। তাদেরও আছে বিস্ময়কর উদ্ভাবনী ক্ষমতা। আছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধও। তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন নিজের দিকে খেয়াল রাখা। খামখেয়ালী নাট্য-সিনেমা নির্মাতাদের বাই প্রোডাক্টে পরিণত না হয়ে, জীবনের লক্ষ্য অর্জন করা।

জীবনে প্রেম আসবে, ভালোবাসা আসবে। কিন্তু তার জন্য মনুষ্যত্ব ও চারিত্রিক গুণাবলি বিসর্জন দেয় কেবল কূপমণ্ডুকরাই। জীবনে প্রতিষ্ঠা ও অভিভাবকদের আশীর্বাদ না পেলে, ওই সব মোহাবিষ্ট প্রেম নামের চোরাবালিতেই হারিয়ে যেতে হবে। এই বোধটুকু ফিরিয়ে আনতে হলে ঘুম ভাঙ্গাতে হবে সমাজ ও সংস্কৃতির অভিভাবকদের, যাঁরা জেগে জেগে ঘুমায়, সব দেখেও দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম

উপরে