আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২০:২৯

তোদের পতিতালয়ে রেট কতো? প্রশ্নের উত্তরে বদলে গেলো জীবন!

বিডিটাইমস ডেস্ক
তোদের পতিতালয়ে রেট কতো? প্রশ্নের উত্তরে বদলে গেলো জীবন!

১৯ বছরের তরতাজা তরুণ করন (ছদ্মনাম)। ছেলেবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন পতিতালয়ে। ছোট বেলায় স্কুলের সহপাঠীর একটি প্রশ্নের উত্তরে বদলে দেয় তার জীবন। প্রশ্নটি হলঃ ‘তোদের পতিতালয়ে রেট কতো?’

নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন করন। মারামারি করলেন একচোট এবং স্কুল থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ওই দিন তারা (স্কুল কর্তৃপক্ষ) কেউ আমার কথা শোনেনি। আমার দিক থেকে কেউ ঘটনাটি দেখার চেষ্টা করেনি। আমি স্কুল থেকে বেরিয়ে গেছি এবং আর ফিরিনি। এতে আমি গর্বিত নই। তবে এ নিয়ে আমার কোনো অনুতাপও নেই।

সেদিন স্কুল থেকে পালিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন করন? তিনি সোজা চলে এসেছিলেন সেই পতিতালয়ে। করনের মা এটার মালকিন। সেখানে তার চারপাশে হাজারো বিশৃঙ্খলতা। কিন্তু একটা শান্তি ছিল। কারণ সেখানে তিনি নিজের স্বপ্নটাকে লালন করছিলেন। তিনি হয়ে উঠবেন একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার।

এ বছরই সিনিয়র সেকেন্ডারি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানালেন করন। এখনো আছেন মায়ের পতিতালয়ে। মা নিজেও একজন পতিতা, বয়স ৪০-এর আশপাশে। এটা করনের কাছে তার বাড়ি। আর বাড়ির বর্ণনা বলতে দোতলার বান্দারা থেকে তার একদল ‘বোন’ খদ্দেরদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। দিল্লির এই পতিতালয়টি বেশ নামকরা জিবি রোড-এ অবস্থিত। করনের বাড়ির দেয়ালে নীল রং করা। বাড়ির এক পাশে দেবতা শিবের বিশাল একট ছবি রয়েছে। এ বাড়িতে আরো ৪ জন শিশু রয়েছে। এরা অন্যান্য পতিতার সন্তান। এরা সবাকে করন নিজ পরিবারের সদস্য বলেই মনে করেন।

পশ্চিম ভারতের এমন এক সমাজে করন বেড়ে উঠেছেন যেখানে নারীরা স্বাভাবিকভাবেই পতিতা হবে বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে এসব ধারণা এখন অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। তার মায়ের ছোট বোন এই পারিবারিক ব্যবসার বাইরে থেকেছেন সব সময়। বর্তমানে তিনি বিয়ে করে সুখের সংসার করছেন। তার ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যায় এবং তাদের জন্যে দারুণ গর্বিত করন। অন্তত তাদের শুনতে হবে না যে, তুই একটা পতিতালয়ের সন্তান।

করন কখনোই এমন এক ধারণা নিয়ে জীবন কাটাচ্ছিলেন, যেখানে এই পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো উপায় নেই বলেই মনে হতো। তার বেশ কয়েকজন বন্ধু ছিল তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছে। আবার অনেকে বাজে কথা বলে। মানুষের কাছ থেকে আমাকে অসংখ্যবার যে প্রশ্নটা শুনতে হয়েছে তা হলো, তোমাদের পতিতালয়ের রেট কত? চোখ নামিয়ে সেই প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চলে আসাই ছিল তার একমাত্র কাজ।

কিন্তু এখন মানসিকতা বদলেছে করনের। তিনি এখন এ প্রশ্নের জবাবে চোখে চোখ রেখে বলেন, আমি আমার নিজ চেষ্টায় অন্য কিছু করছি। এই মানুষগুলো আমার। কিন্তু আমি তাদের জন্যেই নতুন কিছু করছি।

একটা সময় ছিল যখন করন রাস্তায় রাস্তায় হাঁটতেন এবং রাতে মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরতেন। তবে এক সময় একটা চাকরি জোগাড় করতে সক্ষম হন। কিন্তু অন্যের অধীনে কাজ করতে নিজের পরিচয় সম্পর্কে নানা প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।

এখন থেকে বছর তিনেক আগে নতুন এক বন্ধুর সন্ধান পেলেন করন। একটি ক্যামেরা। তার সঙ্গে এখন পর্যন্ত বন্ধুত্ব রয়েছে। প্রতিদিন সব সময় এই ক্যামেরাটি সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন করন।

জিবি রোডের পতিতাদের জীবন নিয়ে একটি এনজিও’র হয়ে ক্যামেরা নিয়ে কাজ করেছিলেন করন। ওটাই তার জীবনটাকে বদলে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। সেখান থেকেই করন পেশাদার ফটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ২০১৩ সালে যখন তিনি হাতে একটি নিকনের ডিজিটাল ক্যামেরা পান, তখন তার আনন্দ দেখে কে?

বর্তমানে তিনি এনজিও’র হয়ে বিভিন্ন প্রজেক্টে কাজ করছেন। জীবনের নানা সময় বন্দি করছেন ক্যামেরায়। গত বছরের শেষ দিকে দিল্লির আরেক ক্যামেরাম্যান নিতিন উপাধ্যয়ার কাছে ইন্টার্ন করেছেন। সেখানে পেয়েছেন কিছু মৌলিক শিক্ষা। এখন তিনি হার্দিক গৌরবের কাছ থেকে ক্যামেরা চালানো শিখছেন। এই মানুষটি স্টোরিগ্রাফারের মূল চালিকাশক্তি। এটি একদল পেশাদার ফটোগ্রাফারের সংগঠন।

শুধু তাই নয়। করন ইতিমধ্যে তার চারপাশের সমাজে পরিবর্তন আনছেন। সমাজটাকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি তরুণ নেতা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। নিজ পরিবার ও সমাজের অন্যদেরও বদলে যেতে সহায়তা করছেন করন।

সম্প্রতি করন দিল্লির ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেছেন। জিবি রোডে আরো বেশি নার পুলিশ দেওয়ার জন্যে আলোচনা করতে যান করন। আলোচনা সফল হয়েছে।

তার মা এখন ছেলের কর্মকাণ্ডে গর্বিত। তিনি চান, ছেলে সমাজের জন্যে করছে, তার পাশাপাশি এবার নিজের জন্যেও যেন করে। পতিতালয়ের বহু শিশু সেখান থেকে পালিয়ে যায়। মায়েদের রেখে যায় এই পচনধরা জীবনে। কিন্তু করন তা করেননি। তার স্বপ্ন আরো বড় হবেন, মাকে নিয়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যাবেন। সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে