আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৬:১৬

বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে বিমান দূর্ঘটনায় নিহত সঙ্গীদের কাঁচা মাংস!

পরাগ মাঝি
বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে বিমান দূর্ঘটনায় নিহত সঙ্গীদের কাঁচা মাংস!

দূর্ধষ্য জীবন সংগ্রাম! বিধ্বস্ত বিমানের কয়েকজন যাত্রী প্রাণে রক্ষা পেলেও আন্দিজের চূড়ায় তখন মাইনাস ৫৬ ডিগ্রী তাপমাত্রা। খাবারও শেষ। নেই পানিও। কিন্তু বেঁচে তো থাকতে হবে। অবশেষে বাধ্য হয়েই তারা খেতে শুরু করলেন মৃত সঙ্গীদের কাঁচা মাংস। বেঁচে যাওয়া যাত্রী রবার্তো ক্যানেসার স্বাক্ষ্য অনুসরণ করে জেনে নিই সেই কাহিনী-

১৯৭২ সালের ১৩ অক্টোবর; সেদিন ছিলো শুক্রবার। ওইদিন আন্দিজ পর্বতমালায় ঐতিহাসিক বিমান দূর্ঘটনায় সৌভাগ্যবান বেঁচে যাওয়াদের একজন রবার্তো ক্যানেসা। সে তখন উরুগুয়ের ১৯ বছরের এক মেডিক্যালের ছাত্র। মন্টেভিডিও শহরের এক ডক্তারের সুন্দরী কন্যা লাউরি সারাকো’র প্রেমে সে তখন হাবু-ডুবু খাচ্ছে। যদিও এ বয়সেই সে রাগবির পোকা হয়ে উঠেছিলো। দেশের হয়ে চিলির মাটিতে বিশ্বকাপ খেলার জন্য সেও ওই দূর্ঘটনা কবলিত বিমানের যাত্রি ছিলো। সব মিলিয়ে বিমানে আরোহী ছিলো ৪৫ জন।

বিমানের ভ্রমণটা ছিলো দারুণ খোশ মেজাজের। সবাই খেলোয়াড় হওয়ায় এবং কাছাকাছি বয়সের হওয়ায় মজার মজার সব গল্প আড্ডা বেশ জমে উঠেছিলো। কিন্তু এই আনন্দময় আড্ডাটি হঠাৎই এক বিপজ্জনক পথে মোড় নিলো। যখন তারা বুঝেলো নিদারুন এক গোলমাল ইতোমধ্যেই ঘটে গেছে!

ক্যানেসা বাইরে তাকিয়ে দেখলো তাদের বিমানটি পাহাড়ী এলাকার খুব নিচু দিয়ে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে কেবলই উঁচু নিচু পাহাড়ের চূড়ো অতিক্রম করে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পেল। সে বুঝলো বিপদ আসন্ন! আসন্ন মৃত্যু!

একটি হারিক্যানের কবলে পড়ে বিমানের পাইলটরা নিয়ন্ত্রন হারালো। তাদের বিশ্বস্ত যদিও অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইঞ্জিন থেকে একটি গোপন আওয়াজ বেরুতে শুরু করলো।

ক্যানেসা দ্রুততার সঙ্গে তার সিট বেল্টটি জুড়ে দিল এবং কোন অবিশ্বাস্য কোন মিরাকলের প্রত্যাশা করছিলো বেঁচে যাওয়ার জন্য। বিকট আওয়াজে বিমানটি একসময় একটি পাহাড়ের চূড়োতে গিয়ে আঘাত হানলো। ক্যানেসা তার সিট সহ বিমানের বাইরে গিয়ে ছিটকে পড়লো এবং নিজের নিশ্বাস নিতে পারার অনুভূতি সে অনুভব করলো। অনুভব করলো সে বেঁচে আছে। সে শুনতে পেল  আহতদের আর্তনাদ আর কান্নার শব্দ।

কোন এক অলৌকিক শক্তিতে ক্যানেসা তার শরীরের সঙ্গে বাধা বিমানের সিটটি ছাড়াতে চেষ্ঠা করলো। হঠাৎই তাকে পেছন থেকে এসে সাহায্য করলো তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু গুস্তাভো। সেও মেডিক্যালের ছাত্র।

গুস্তাভোর বিস্মিত চোখ তখন যেন এ কথাই বলতে চাইলো- তুমিও বেঁচে আছো?

বরফাচ্ছন্ন দূর্গম ওই পর্বতমালায় দূর্ঘটনা কবলিত বিমানের যাত্রিরা তখন সমতল এলাকা থেকে শত মাইল দূরে। যতদূর চোখ যায় কেবল বরফাচ্ছন্ন পাহাড়ের চূড়োই চোখে পড়ে।

দূর্ঘটনায় তাৎক্ষনিকভাবেই মারা গেল ১২ জন যাত্রি। পরদিন মরলো আহতদের মধ্য থেকে আরও ৬ জন। বেঁচে থাকাদের মধ্যে কম বেশি সবাই আহত। কিন্তু তার চেয়েও কঠিন আকার ধারণ করলো বিরূপ প্রকৃতি, জেঁকে বসলো প্রচন্ড ঠান্ডা। তাপমাত্রা ছিলো মাইনাস ১০ ডিগ্রীরও নিচে।

ঈশ্বরের কাছে সাহায্য প্রার্থনা ছাড়া তাদের আর কিছুই করার রইলো না। যদিও বেঁচে যাওয়ারা একে অপরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো।

সৌভাগ্যক্রমে বিমানের তেলের ট্যাংক বিস্ফোরিত না হওয়াই বেঁচে যাওয়াদের কারণ। মৃত এবং প্রায় মৃতদের রক্ত দিয়ে ক্যানেসার সারা শরীর তখন ভেজা। বিস্ময় কাটিয়ে ওঠার পর সে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর সঙ্গে মস্তিষ্কের সংযোগ ঘটাতে পারলো।

এমন পরিস্থিতিতে প্রথম রাতটিকেই তারা ভেবে নিচ্ছিল শেষ রাত। দূর্গম ওই এলাকা থেকে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিলোনা তাদের বেতার যন্ত্রগুলো। তারা ভাবছিলো খুব শিঘ্রই হয়তো উদ্ধারকারী দল এসে তাদের এ নরক থেকে উদ্ধার করবে। তারা জানতো গন্তব্যস্থান চিলি থেকে দূর্ঘটনাস্থল প্রায় ১০০ মাইল দূরে এবং প্রায় ৭ হাজার মাইল উপর দিয়ে তারা উড়ছিলো। যদিও ব্যাপরটা ছিলো আরও বিপর্য়কর!

ধ্বংসাবশেষের কাছেই তারা কিছু খাবার কুড়িয়ে পেল, যা পরিমানে খুবই সামান্য। সেটাই সমভাগে তারা ভাগ করে নিলো। একটা ব্যাপার তারা অনুধাবন করছিলো যে কোনক্রমেই হাল ছাড়া যাবেনা। তার পাশেই সবার আগে থাকতে হবে যে সবচেযে বেশি আহত!

সুটকেস গুলো খালি করে তারা এগুলোতে আগুন জালালো ধূয়া তৈরীর আশায়। তারা আশাহতের ন্যায় খেয়াল করলো; কোন উদ্ধারকারী দল তাদের উদ্ধার করতে আসছেনা। যদিও পরদিন সকালে তারা একটি জেট বিমান দেখতে পেল। তার পেছন পেছন আরও একটি ছোট্ট প্রপেলারের বিমান। তারা ভাবলো বিমানটি তাদের দেখতে পেয়েছে। বেঁচে থাকা ২৭ জনই একযোগে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিলে বিমান দুটি আবারও বাতাসে মিলিয়ে গেল। সেদিনের মতো উদ্ধারকারীদের কোন দেখা আর পাওয়া গেলনা। পরদিনও না, তার পরদিনও না। তারা একে অপরকে এই বলে সান্তনা দিচ্ছিলো যে এটি কোন সাধারন উদ্ধারকাজ নয় হয়তো কোন বিমান নিয়ে আসতে গেছে আগের বিমান দুটো। শীত থেকে বাঁচতে বিমানের ভাঙা ক্যাবিনের ভেতর জড়াজড়ি করে আস্তানা গাড়লো।

এ অবস্থায় সবারই একটাই লক্ষ হযে দাঁড়ালো। আর তা হলো- বেঁচে থাকা! কিন্তু যে ব্যাপারটি এ ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হলো; সে আর কিছু নয় খাদ্য! কয়েকদিনের মধ্যেই অনাহারে সবাই মৃতপ্রায় হয়ে উঠলো।

ক্যানেসা সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলো, ‘যদি আমার হৃদপিন্ড থেমে যায় তবে এই পাহাড়ী এলাকা থেকে বেরুবার জন্য আমার হাত-পা মাংস পিন্ডকেও যে সদ্যব্যবহার করা হয়।’

তারা তাদের মৃত বন্ধু ও খেলার সঙ্গীদের বরফে সংরক্ষন করলো, যাতে বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত উপযোগী প্রোটিন এগুলো থেকে পাওয়া যায়। মৃত বন্ধুদের শরীরের মংস খাওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা রইলো না।

তারা প্রত্যেকেই খেয়াল করলো যে তারা সবাই স্বাভাবিকতা হারিয়েছে এবং তাদের বলা যায় ‘পাগল’!

দূর্ঘটনার নয়দিন পর, গুস্তাভো, ফিতো স্ট্রচ এবং দানিয়েলকে সঙ্গে নিয়ে ক্যানেসা মৃত জমাটবাধা সঙ্গীদের শরীর থেকে মাংস কেটে নিল একটি রেজর ব্লেড দিয়ে।

এভাবে তাদের দিনের পর দিন কাটতে লাগলো। কিন্তু একদিন এক তুষার ধ্বসে তাদের সংরক্ষিত সব মৃতদেহগুলো কয়েকশো ফিট বরফের তলে হারিয়ে গেল। এ অবস্থায় তারা হতবাক হয়ে পড়লো। তাদের আর কিছুই করার রইলো না শুধু একটি নতুন মৃতদেহের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া!

একমাসেরও বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ১৭ নভেম্বর বেশকিছুটা দূরে তারা তাদের বিমানের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ খুজে পেল। যেখানে পাওয়া গেল রামের বোতল, সিগারেট আর এক কেজি চিনি। ক্যানেসা তার সুটকেসটাও পেল।

নতুন রসদ তাদের আরো কিছুদিন বেঁচে থাকার অনুপ্রেরনা জোগালো। পাওয়া গিয়েছিলো কয়েকটি ব্যাটারিও। এগুলো দিয়ে তারা তাদের বিমানের রেডিওটাকে সচল করার চেষ্ঠা করলো।

কিন্তু টানা কয়েকদিনের একই শ’শ’ শব্দ একদিন হঠাৎ কথায় রূপপান্তিরীত হলো। সে দিনটা ছিলো ডিসেম্বরের ৮ তারিখ। তাদের উদ্ধার প্রকৃয়া সম্পর্কীত ঝাপসা কিছু শব্দও তারা আবিষ্কার করতে পেরেছিলো। এ ঘটনার তিনদিন পর গুস্তাভো ক্যোনেসার কানে কানে প্রিয় নুমার মৃত্যুর খবরটা দিল। দুইদিনের মধ্যে রয়’ও একই গন্তব্যে চলে গেল।

এভাবে একেকটা মৃত্যুর পর ক্যানেসা গুস্তাভোকে বলতো আমি পরের দিনের জন্য তৈরি।

টানা ৭২ দিন পর উদ্ধারকর্মীরা তাদের কাছে পৌঁছানোর আগ পর‌্যন্ত ২৭ থেকে আরও ৮ জন কমে অবশিষ্ট ছিলো মাত্র ১৬ জন।

ক্যানেসাস ২০০৮ সালে উরুগুয়েতে মৃত্যুবরণ করে।

ডেইলি মেইল অবলম্বনে

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে