আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৯:২৩

‘বুনো গোলাপ’ কেউ কাউকে দেবেনা ভারত আর পাকিস্তান!

বিডিটাইমস ডেস্ক
‘বুনো গোলাপ’ কেউ কাউকে দেবেনা ভারত আর পাকিস্তান!

সিয়াচেন কথার অর্থ ‘বুনো গোলাপ’। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর মতো এটাও যেন এক মেরু অঞ্চল! সে কারণে অনেকে এটাকে তৃতীয় মেরু বলেও ডাকেন। সম্প্রতি সেখানে হনুমান্থাপ্পাসহ বেশ কয়েকজন ভারতীয় সেনার প্রাণহানির ঘটনায় গোলযোগপূর্ণ ওই এলাকাটি আবারো আলোচনায় এসেছে।

সিয়াচেনে যত দূর চোখ যায় আদিগন্ত বরফ আর তার ফাঁকে ফাঁকে কারাকোরাম পর্বতমালার বরফ মোড়া শৃঙ্গ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কমবেশি ২০ হাজার ফুট উচ্চতায় প্রায় ২৭০ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে থাকা এই জায়গাটাই সিয়াচেন হিমবাহ।

এখানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর হাতছানি। এখানে প্রতিবছর গুলি বিনিময়ে যত সেনা মারা যান, তার থেকে অনেক বেশি সেনার মৃত্যু হয় প্রকৃতির রোষে। অনেকে সারা জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যান। দেখা দেয় মানসিক সমস্যাও।

তুষারধসে চাপা পড়ে মৃত হনুমন্থাপ্পা কোপ্পাড়সহ দশ জওয়ান সেই তালিকাতেই শেষতম সংযোজন। ৩৫ ফুট বরফের নীচে ছ’দিন পরও বেঁচে থাকায় হনুমন্থাপ্পাকে নিয়ে তা-ও হইচই হয়েছে। তার বাকি সঙ্গীদের দেহ বরফে জমে এতটাই শক্ত হয়ে গিয়েছিল যে রীতিমতো হাড়গোড় ভেঙে উদ্ধার করতে হয়েছে তাদের! গোটা দেশ যখন হনুমন্থাপ্পাদের জন্য শোক পালন করছে, তখন সিয়াচেনে নতুন বহাল হওয়া জওয়ানদের সেই শোক পালনেরও সময় নেই!

স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন, এমন জায়গায় এ ভাবে সেনা রেখে কী লাভ?

বুনো গোলাপ খ্যাত সিয়াচেন সমস্যার শুরু ১৯৪৯-এর করাচি চুক্তি থেকে। ১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত শিমলা চুক্তিতেও যে সমস্যা মেটেনি।

ভারতীয় সেনা অফিসারদের বক্তব্য, পাকিস্তান সিয়াচেন থেকে কারাকোরাম পাস পর্যন্ত নিজেদের এলাকা বলে দাবি করে। সে ক্ষেত্রে নুব্রা ভ্যালি থেকে লে পর্যন্ত রাস্তা, কারাকোরাম হাইওয়ে, লাদাখ পর্যন্ত আকসাই চীনের রাস্তা— সবটাই পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

পাকিস্তান বরাবরই চায়, সিয়াচেন থেকে সেনা সরাক ভারত। গত বছর জতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে নওয়াজ শরিফও সিয়াচেন থেকে দু’দেশেরই সেনা সরানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

এদিকে ভারত কিন্তু সিয়াচেন থেকে সেনা সরাবে না। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পর্রীকর তুষারধসে সেনা নিহতের পরও বলেছেন, ‘দেশের নিরাপত্তার কারণেই সিয়াচেনে সেনা রাখা দরকার। এই ধরনের ঘটনা যন্ত্রণাদায়ক ঠিকই, কিন্তু এর কোনও সমাধান নেই।’

নয়াদিল্লির বক্তব্য, সিয়াচেন হিমবাহে পাকিস্তানের থেকে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ভারত। এবং ওই জায়গাটিকে যতক্ষণ না ভারতের এলাকা বলে আন্তর্জাতিক স্তরে সিলমোহর বসছে, ততক্ষণ দিল্লি সেখান থেকে সেনা সরাবে না।

১৯৮৪ সালে সেনাবাহিনীর ‘অপারেশন মেঘদূত’-এর পর থেকেই সলতোরো রেঞ্জের সবক’টি শৃঙ্গ ভারতের দখলে। যেখান থেকে গোটা নুব্রা উপত্যকার উপর নজর রাখা যায়।

কার্গিল যুদ্ধের সময় এবং এর আগে-পরেও পাক সেনারা ওইসব এলাকা দখল করার বহু চেষ্টা করেছে। কিন্তু ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে থাকায় প্রতিবারই তারা ব্যর্থ হয়েছে।

নয়াদিল্লির আশঙ্কা, ইসলামাবাদ মুখে সিয়াচেন থেকে দু’পক্ষের সেনা সরানোর কথা বললেও ভারতীয় সেনা ওখান থেকে সরে এলেই পাকিস্তান ওই এলাকা দখল করবে।

ধারণা করা হয়, দুর্গম এই এলাকাটি দেশীয় নিরাপত্তা ব্যাবস্থা, আন্ত:মহাদেশীয় আধিপত্য এবং ভাবমূর্তি সংহত রাখা এই কারণ গুলোর জন্যই পাক-ভারতের কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নয়। এছাড়াও দুর্গম এই এলাকাটিতে গুরুত্বপূর্ন প্রাকৃতিক সম্পদের আধার থাকার সমূহ সম্ভাবনা।

তা না হলে কি, এত ক্ষয়-ক্ষতি এবং খরচ সত্ত্বেও টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পরমানু শক্তিধর দুটি দেশ।

জানা যায়, সিয়াচেনে সেনা মোতায়েনে ভারতের দৈনিক খরচ ৫ কোটি টাকা! এখনও পর্যন্ত ৯০০ ভারতীয় সেনা মারা গিয়েছে সেখানে। তাদের সিংহভাগই খারাপ আবহাওয়ার জন্য।

প্রায় একই সংখ্যক পাক সেনারও মৃত্যু হয়েছে ওখানে। চার বছর আগে সিয়াচেনে তুষারধসে পাকিস্তানের ১২৯ জন সেনা ও ১১ জন ঠিকাদার মারা যান।

তারপরও ‘বুনো গোলাপ’-এর দখল ছাড়তে নারাজ এ দুইয়ের ‘কেউ’।

বিডিটােইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে