আপডেট : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৭:৪৯

পিরিতি কাঁঠালের আঠা (চতুর্থ পর্ব): রাধা-কৃষ্ণ!

উম্মে জান্নাত
পিরিতি কাঁঠালের আঠা (চতুর্থ পর্ব): রাধা-কৃষ্ণ!

প্রেম মানুষের একটি ‘দৈব গুণ’। দেবকুলেও এই প্রেমের রয়েছে সদর্প পদচারনা। যার বিরহ ব্যাথায় কাতর হয়েছিলেন রাধা-কৃষ্ণও। পিরিতি কাঁঠালের আঠায় আজ শুনুন তাদেরেই কথা-

কৃষ্ণ ও রাধা উভয়ই ঈশ্বরের ইচ্ছায় মর্তে মানবরূপে জন্ম নিয়েছিলেন। কৃষ্ণ পাপী কংস রাজাকে বধ করার জন্য দেবকী ও বাসুদেবের সন্তান হিসেবে জন্ম নেয়। কংস কৃষ্ণকে হত্যা করতে পারে এই ভয়ে, কৃষ্ণের জন্মমাত্র বাসুদেব গোপনে তাকে অনেক দূরে বৃন্দাবনে জনৈক নন্দ গোপের ঘরে রেখে আসেন। সেখানেই দৈব ইচ্ছায় আরেক গোপ সাগর গোয়ালার স্ত্রী পদ্মার গর্ভে জন্ম নেয় রাধা!

দৈব নির্দেশেই বালিকা বয়সে নপুংসক (ক্লীব) অভিমন্যু বা আইহন বা আয়ান গোপের (ঘোষের) সঙ্গে রাধার বিয়ে হয়। আয়ান গোচারণ করতে গেলে বৃদ্ধা পিসি বড়ায়িকে রাধার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

রাধা ঘর থেকে বের হয়ে অন্য গোপীদের সঙ্গে মথুরাতে দই-দুধ বিক্রি করতে যায়। বড়ায়ি তার সঙ্গে যায়। বৃদ্ধা বড়ায়ি পথে রাধাকে হারিয়ে ফেলে এবং রাধার রূপের বর্ণনা দিয়ে কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করে, এমন রূপসীকে সে দেখেছে কিনা। এই রূপের বর্ণনা শুনে রাধার প্রতি কৃষ্ণ পূর্বরাগ অনুভব করে। সে বড়ায়িকে বুঝিয়ে রাধার জন্য পান ও ফুলের উপহারসহ প্রস্তাব পাঠায়।

কিন্তু বিবাহিতা রাধা সে প্রস্তাব পদদলিত করে।

এরপর একদিন দই-দুধ বিক্রির জন্য মথুরাগামী রাধা ও গোপীদের পথ রোধ করে কৃষ্ণ। তার দাবী নদীর ঘাটে পারাপার-দান বা শুল্ক দিতে হবে, তা না হলে রাধার সঙ্গে মিলিত হতে দিতে হবে।

রাধা কোনোভাবেই এ প্রস্তাবে রাজী হয় না। এদিকে তার হাতে কড়িও নেই! সে নিজের রূপ কমাবার জন্য চুল কেটে ফেলতে চাইল এবং বেয়ারা কৃষ্ণের হাত থেকে বাঁচার জন্য বনে দৌড় দিল! এরপর থেকেই রাধা, কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে।

কৃষ্ণ নদীর মাঝির ছদ্মবেশ ধারণ করে। একজন পার করা যায় এমন একটি নৌকাতে রাধাকে তুলে সে একদিন মাঝ নদীতে নিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেয় এবং রাধার সঙ্গ লাভ করে। নদী তীরে উঠে লোকলজ্জার ভয়ে রাধা সখীদের বলে যে, নৌকা ডুবে গিয়েছে, কৃষ্ণ না থাকলে সে নিজেও মরত, কৃষ্ণই তার জীবন বাঁচিয়েছে।

এ ঘটনার পর, রাধা আর বাড়ির বাইরে আসে না। শাশুড়ি বা স্বামীকে কিছু বলেওনা লজ্জায়।

এদিকে রাধা অদর্শনে কৃষ্ণ কাতর। সে বড়ায়িকে দিয়ে রাধার শাশুড়িকে বোঝায়, ঘরে বসে থেকে কি হবে, রাধা দুধ-দই বেচে কটি পয়সা তো আনতে পারে।

শাশুড়ির নির্দেশে রাধা বাইরে বের হয়। প্রচণ্ড রোদে কোমল শরীরে দই-দুধ বহন করতে গিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ে কৃষ্ণ ছদ্মবেশে মজুরী করতে আসে। পরে ভার বহন অর্থাৎ মজুরির বদলে রাধার আলিঙ্গন কামনা করে!

রাধা এই চতুরতা বুঝতে পারে। সেও কাজ আদায়ের লক্ষ্যে মিথ্যা আশ্বাস দেয়। কৃষ্ণ আশায় আশায় রাধার পিছু পিছু ভার নিয়ে মথুরা পর্যন্ত চলে। দুধ-দই বেচে এবার মথুরা থেকে ফেরার পালা। কৃষ্ণ তার প্রাপ্য আলিঙ্গন চাইছে। রাধা চালাকি করে বলে, ‘এখনো প্রচণ্ড রোদ। তুমি আমাদের ছাতা ধরে বৃন্দাবন পর্যন্ত চলো। পরে দেখা যাবে’। কৃষ্ণ ছাতা ধরতে লজ্জা ও অপমান বোধ করছিল। তবুও আশা নিয়ে ছাতা ধরেই চলল। কিন্তু তার আশা পূর্ন করেনি রাধা।

রাধা ও গোপীরা যমুনাতে জল আনতে যায়। কৃষ্ণ যমুনার জলে নেমে হঠাৎ ডুব দিয়ে আর উঠে না। সবাই মনে করে কৃষ্ণ ডুবে গেছে। এদিকে কৃষ্ণ লুকিয়ে কদম গাছে বসে থাকে। রাধা ও সখীরা জলে নেমে কৃষ্ণকে খুঁজতে থাকে। কৃষ্ণ নদী তীরে রাধার খুলে রাখা হার চুরি করে আবার গাছে গিয়ে বসে। পরে কৃষ্ণের চালাকি রাধা বুঝতে পারে। হার না পেয়ে রাধা কৃষ্ণের পালিতা মা যশোদার কাছে নালিশ করে। কৃষ্ণও মিথ্যে বলে মাকে। সে বলে, আমি হার চুরি করব কেন, রাধাতো পাড়া সম্পর্কে আমার মামি।

এদিকে বড়ায়ি সব বুঝতে পারে এবং রাধার স্বামী আয়ান হার হারানোতে যাতে রাগান্বিত বা ক্ষুব্ধ না হয় সেজন্য বলে যে, বনের কাঁটায় রাধার গজমোতির হার ছিন্ন হয়ে হারিয়ে গেছে।

মায়ের কাছে নালিশ করায় কৃষ্ণ রাধার উপর ক্ষুব্ধ। রাধাও কৃষ্ণের প্রতি প্রসন্ন নয়।

বড়ায়ি বুদ্ধি দিল, কৃষ্ণ যেন শক্তির পথ পরিহার করে মদনবাণ বা প্রেমে রাধাকে বশীভূত করে। সে মতো কৃষ্ণ পুষ্পধনু নিয়ে কদমতলায় বসে। রাধা, কৃষ্ণের প্রেমবাণে মূর্চ্ছিত ও পতিত হয়। এরপর কৃষ্ণ রাধাকে চৈতন্য ফিরিয়ে দেয়। রাধা কৃষ্ণপ্রেমে কাতর হয়ে কৃষ্ণকে খুঁজে ফেরে। রাধাকে আকৃষ্ট করার জন্য সময়-অসময়ে কৃষ্ণ বাঁশিতে সুর তোলে। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার রান্না এলোমেলো হয়ে যায়, মন কুমারের চুল্লির মতো পুড়তে থাকে, রাত্রে ঘুম আসে না, ভোর বেলা কৃষ্ণ অদর্শনে রাধা মূর্চ্ছা যায়।

বড়ায়ি রাধাকে পরামর্শ দেয়, সারারাত বাঁশি বাজিয়ে সকালে কদমতলায় কৃষ্ণ বাঁশি শীয়রে রেখে ঘুমায়। তুমি সেই বাঁশি চুরি কর, তাহলেই সমস্যার সমাধান হবে। রাধা তাই করে। কৃষ্ণ বুদ্ধিমান। বাঁশি চোর কে তা বুঝতে তার কোনো কষ্ট হয় না। কৃষ্ণ রাধার উপর উদাসীন। এদিকে মধুমাস সমাগত। রাধা বিরহ অনুভব করে। রাধা বড়ায়িকে বলে কৃষ্ণকে এনে দিতে। দই-দুধ বিক্রির ছল করে রাধা নিজেও কৃষ্ণকে খুঁজতে বের হয়। অবশেষে বৃন্দাবনে বাঁশি বাজানো অবস্থায় কৃষ্ণকে খুঁজে পাওয়া যায়। কৃষ্ণ রাধাকে বলে, ‘তুমি আমাকে নানা সময় লাঞ্ছনা করেছো, ভার বহন করিয়েছো, তাই তোমার উপর আমার মন উঠে গেছে’। রাধা বলে, ‘তখন আমি বালিকা ছিলাম, আমাকে ক্ষমা করো। আমি তোমার বিরহে মৃতপ্রায়। তির্যক দৃষ্টি দিলেও তুমি আমার দিকে তাকাও’। কৃষ্ণ বলে, ‘বড়ায়ি যদি আমাকে বলে যে তুমি রাধাকে প্রেম দাও, তাহলে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে পারি’। অবশেষে বড়ায়ি রাধাকে সাজিয়ে দেয় এবং রাধা কৃষ্ণের মিলন হয়।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/মাঝি

উপরে