আপডেট : ৩০ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৯:৩২

দেবী কালীর রূপের রহস্য!

বিডিটাইমস ডেস্ক
দেবী কালীর রূপের রহস্য!

ব্রহ্মযামল তন্ত্র বলে, কালী এই বঙ্গদেশের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তা হবেনা কেন? অবিভক্ত কিংবা বিভক্ত যাই হোক না কেন- বঙ্গে কালীর যত মন্দির আছে, তত সারা ভারতেও দেখা যায় না।

এক একটি মন্দিরে শুধু যে আলাদা আলাদা নামেই পুজো পান দেবী, কেবল তা নয়। নামের সঙ্গে দেবীর রূপও অনেক!

সাধারণত, আটটি রূপে কালী উপাসনা করা হয়ে থাকে। কালীর এই আট প্রকার রূপরহস্যকে তন্ত্রে অষ্টধা কালী নামে বর্ণনা করা হয়েছে।

দক্ষিণাকালী

আমাদের দেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে যে মূর্তিতে কালীর উপাসনা সবচেয়ে বেশি হয়, তিনি ‘দক্ষিণাকালী’। লোকমুখে ইনি শ্যামাকালী নামেও পরিচিত।

দক্ষিণাকালী দেখতে করালবদনা, ঘোরা, মুক্তকেশী, চতুর্ভুজা এবং মুণ্ডমালাবিভূষিতা। তার দুই বাম হাতে সদ্যছিন্ন নরমুণ্ড ও খড়গ থাকে; দুই ডান হাতে থাকে বর ও অভয় মুদ্রা। তার গায়ের রং মহামেঘের মতো ঘন নীল; তিনি দিগম্বরী। তার গলায় পিশাচদের কাটা মাথা দিয়ে বানানো হার শোভা পায়। দুই শব তার কানের গয়না; কোমরে নরহস্তের কটিবাস। তার দন্ত ভয়ানক; তার স্তনযুগল উন্নত; তিনি ত্রিনয়নী এবং শিবের বুকে দণ্ডায়মানা। তার ডান পা শিবের বক্ষে স্থাপিত। তিনি মহাভীমা, হাস্যযুক্তা ও মুহুর্মুহু রক্তপানকারিণী।

তাত্ত্বিকেরা বলেন, দক্ষিণদিকের অধিপতি যম যে কালীর ভয়ে পলায়ন করেন, তার নাম দক্ষিণাকালী। তার পূজা করলে ত্রিবর্ণা তো বটেই সর্বোপরি সর্বশ্রেষ্ঠ ফলও দক্ষিণাস্বরূপ পাওয়া যায়।

সিদ্ধকালী

সিদ্ধকালী কালী’র একটি অখ্যাত রূপ। গৃহস্থের বাড়িতে সিদ্ধকালীর পুজো হয় না। তিনি মূলত সিদ্ধ সাধকদের ধ্যান আরাধ্যা। কালীতন্ত্রে তাকে দ্বিভুজা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। অন্য মতে, তিনি ব্রহ্মরূপা ভুবনেশ্বরী। সিদ্ধকালীর মূর্তি আমরা যে রকম কালী মূর্তি দেখে অভ্যস্ত, তেমনটা নয়। তিনি অলঙ্কার পরিধান করেন। তার ডান পা শিবের বুকে ও বাম পা শিবের উরুদ্বয়ের মধ্যস্থলে সংস্থাপিত। তিনি রক্তও পান করেন না। খড়গ দিয়ে সিদ্ধকালী আঘাত হানেন চাঁদে। সেই চাঁদ থেকে নিঃসৃত অমৃত পানে তুষ্ট হন এই দেবী।

গুহ্যকালী

গুহ্যকালী বা আকালীর রূপ গৃহস্থের দেখা বারণ। তিনি সাধকদের আরাধ্য। তার রূপ অতীব ভয়ংকর। গুহ্যকালীর গায়ের রং গাঢ় মেঘের মতো। তিনি লোলজিহ্বা ও দ্বিভুজা; গলায় পঞ্চাশটি নরমুণ্ডের মালা। কটিতে ক্ষুদ্র কালো-বস্ত্র। স্কন্ধে নাগযজ্ঞোপবীত; মস্তকে জটা ও অর্ধচন্দ্র; কর্ণে শবদেহরূপী অলংকার; হাস্যযুক্তা, চতুর্দিকে নাগফণা দ্বারা বেষ্টিতা ও নাগাসনে উপবিষ্টা। বামকঙ্কণে তক্ষক সর্পরাজ ও দক্ষিণকঙ্কণে অনন্ত নাগরাজ; বামে বৎসরূপী শিব; তিনি নবরত্নভূষিতা। নারদাদিঋষিগণ শিবমোহিনী গুহ্যকালীর সেবা করেন; তিনি অট্টহাস্যকারিণী, মহাভীমা ও সাধকের অভিষ্ট ফলপ্রদায়িনী। গুহ্যকালী নিয়মিত শবমাংস ভক্ষণে অভ্যস্তা।

মুর্শিদাবাদ-বীরভূম সীমান্তবর্তী আকালীপুর গ্রামে মহারাজা নন্দকুমার প্রতিষ্ঠিত গুহ্যকালীর মন্দিরের কথা জানা যায়। মহাকাল সংহিতা মতে, নববিধা কালীর মধ্যে গুহ্যকালীই সর্বপ্রধানা। তার মন্ত্র বহু– প্রায় আঠারো প্রকারের।

মহাকালী

তন্ত্রসার গ্রন্থমতে, মহাকালী পঞ্চবক্ত্রা ও পঞ্চদশনয়না। তবে শ্রীশ্রীচণ্ডী-তে তাকে আদ্যাশক্তি, দশবক্ত্রা, দশভুজা, দশপাদা ও ত্রিংশল্লোচনা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। তার দশ হাতে রয়েছে যথাক্রমে খড়গ, চক্র, গদা, ধনুক, বাণ, পরিঘ, শূল, ভূসুণ্ডি, নরমুণ্ড ও শঙ্খ। ইনিও ভৈরবী; তবে গুহ্যকালীর সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। ইনি সাধনপর্বে ভক্তকে উৎকট ভীতি প্রদর্শন করলেও অন্তে তাকে রূপ, সৌভাগ্য, কান্তি ও শ্রী প্রদান করেন।

ভদ্রকালী

ভদ্র শব্দের অর্থ কল্যাণ এবং কাল শব্দের অর্থ শেষ সময়। যিনি মরণকালে জীবের মঙ্গলবিধান করেন, তিনিই ভদ্রকালী। ভদ্রকালী নামটি অবশ্য শাস্ত্রে দুর্গা ও সরস্বতী দেবীর অপর নাম রূপেও ব্যবহৃত হয়েছে। কালিকাপুরাণ মতে, ভদ্রকালীর গায়ের রং অতসীপুষ্পের ন্যায়, মাথায় জটাজুট, ললাটে অর্ধচন্দ্র ও গলদেশে কণ্ঠহার। তন্ত্রমতে অবশ্য তিনি মসীর ন্যায় কৃষ্ণবর্ণা, কোটরাক্ষী, সর্বদা ক্ষুধিতা, মুক্তকেশী; তিনি জগৎকে গ্রাস করছেন; তার হাতে জ্বলন্ত অগ্নিশিখা।

গ্রামবাংলায় অনেক স্থানেই ভদ্রকালীর বিগ্রহ নিষ্ঠাসহকারে পূজিত হয়। এই দেবীরও একাধিক মন্ত্র রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ চতুর্দশাক্ষর মন্ত্রটি হল ‘হৌঁ কালি মহাকালী কিলি কিলি ফট স্বাহা।’

চামুণ্ডাকালী

চামুণ্ডাকালী বা চামুণ্ডা ভক্ত ও সাধকদের কাছে কালীর একটি প্রসিদ্ধ রূপ। দেবীভাগবত পুরাণ ও মার্কণ্ডেয় পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, চামুণ্ডা চণ্ড ও মুণ্ড নামের দুই অসুর বধের জন্য দেবী দুর্গার ভ্রুকুটিকুটিল ললাট থেকে উৎপন্ন হন। তার গায়ের রং নীল পদ্মের মতো, হাতে অস্ত্র, দণ্ড ও চন্দ্রহাস; পরিধানে ব্যাঘ্রচর্ম; অস্তিচর্মসার শরীর ও বিকট দাঁত। দুর্গাপূজায় মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে আয়োজিত সন্ধিপূজার সময় দেবী চামুণ্ডার পূজা হয়। পূজক অশুভ শত্রুবিনাশের জন্য শক্তি প্রার্থনা করে তার পূজা করেন। অগ্নিপুরাণে আট প্রকার চামুণ্ডার কথা বলা হয়েছে। তার মন্ত্রও অনেক। বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণে বর্ণিত চামুণ্ডা দেবীর ধ্যানমন্ত্রটি এইরূপ- ‘নীলোৎপলদলশ্যামা চতুর্বাহুসমন্বিতা।

শ্মশানকালী

কালীর এই রূপটির পূজা সাধারণত শ্মশানঘাটে হয়ে থাকে। এই দেবীকে শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মনে করা হয়। তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ রচিত বৃহৎ তন্ত্রসার অনুসারে এই দেবীর ধ্যানসম্মত মূর্তিটি নিম্নরূপ:

শ্মশানকালী দেবীর গায়ের রং কাজলের মতো কালো। তিনি সর্বদা শ্মশানে বাস করেন। তার চোখদুটি রক্তপিঙ্গল বর্ণের। চুলগুলি আলুলায়িত, দেহটি শুকনো ও ভয়ংকর, বাঁ-হাতে মদ ও মাংসে ভরা পানপাত্র, ডান হাতে সদ্য কাটা মানুষের মাথা। দেবী হাস্যমুখে নরমাংস খাচ্ছেন। তার গায়ে নানারকম অলংকার থাকলেও, তিনি উলঙ্গ এবং মদ্যপান করে উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন।

শ্মশানকালীর আরেকটি রূপে তার বাম পা’টি শিবের বুকে স্থাপিত এবং ডান হাতে ধরা খড়গ। এই রূপটিও ভয়ংকর রূপ। তন্ত্রসাধকেরা মনে করেন, শ্মশানে শ্মশানকালীর পূজা করলে শীঘ্র সিদ্ধ হওয়া যায়। রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্ত্রী সারদা দেবী দক্ষিণেশ্বরে শ্মশানকালীর পূজা করেছিলেন।

কাপালিকরা শবসাধনার সময় কালীর শ্মশানকালী রূপটির ধ্যান করতেন। সেকালের ডাকাতেরা ডাকাতি করতে যাবার আগে শ্মশানঘাটে নরবলি দিয়ে শ্মশানকালীর পূজা করতেন। পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রাচীন শ্মশানঘাটে এখনও শ্মশানকালীর পূজা হয়। তবে গৃহস্থবাড়িতে বা পাড়ায় সর্বজনীনভাবে শ্মশানকালীর পূজা হয় না। রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছিলেন, শ্মশানকালীর ছবিও গৃহস্থের বাড়িতে রাখা উচিত নয়।

শ্রীকালী

গুণ ও কর্ম অনুসারে শ্রীকালী কালীর আরেক রূপ। অনেকের মতে এই রূপে তিনি দারুক নামক অসুর নাশ করেন। ইনি মহাদেবের শরীরে প্রবেশ করে তার কণ্ঠের বিষে কৃষ্ণবর্ণা হয়েছেন। শিবের ন্যায় ইনিও ত্রিশূলধারিণী ও সর্পযুক্তা।

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/পিএম

 

উপরে