আপডেট : ১৭ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৫:৫৩

যৌনদাসীদের করুণগাঁথা ও একটি কোরিয়ান মেয়ের মূর্তির গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যৌনদাসীদের করুণগাঁথা ও একটি কোরিয়ান মেয়ের মূর্তির গল্প
সিউলে জাপানি দূতাবাসের সামনে কোরিয়ান মেয়ের বিখ্যাত মূর্তি

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে জাপানি দূতাবাসের উলটো দিকে যে ছোট্ট মেয়েটার মূর্তি রয়েছে, সেটাকে হটিয়ে দিতে চায় জাপান। কিন্তু কেন?

২০১১ সালে, এক নাগরিক সংগঠনের উদ্যোগে, জাপানি দূতাবাসের সামনে একটি কোরিয়ান বালিকার মূর্তি বসানো হয়। কোলের ওপর হাত দুটো রাখা, তার বিষণ্ণ মুখ। এ মূর্তিটিই আরামের মেয়েদের প্রতীক! স্থির নয়নে, অভিব্যাক্তিহীন এই মেয়ে মূর্তিটিই বয়ে চলেছে যৌনদাসত্বের এক করুণ ইতিহাস।

দূতাবাস থেকে বেরোবার সময় প্রত্যেক জাপানী যেন ওই মূর্তিটি দেখে মনে রাখে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোরিয়ান মেয়েদের প্রতি কী সাংঘাতিক অন্যায় তারা করেছিলো।

কোরিয়ান কিমিকো কানেদা এমনই এক যৌনদাসী। যুদ্ধকালীন সময়ে নিজের জীবনের দু:খগাথা বলছিলেন এভাবেই-

‘আমার তখন কতই বা বয়স হবে, সতেরো-আঠারো। আমায় বলেছিল কাজ দেবে। চারদিকে তখন বড্ড অভাব। রোজ ঠিক করে খেতেও পাই না। সেনাদের ছাউনিতে কাজ। ওদের জামাকাপড় কাচা, রান্না করে দেওয়া, সেলাই করা, ছাউনি পরিষ্কার রাখা। আমার মতো আরও অনেকে নাকি যাচ্ছে। আমরা গিয়েছিলাম। ওই সব কাজ করেওছিলাম।

তবে আসল কাজ ছিল জাপানি সৈনিকদের কাছে ধর্ষিত হওয়া। কপাল ভাল থাকলে দিনে পাঁচ বার, আর খারাপ থাকলে দিনে কুড়ি বার। ওরা একেবারে ক্ষুধার্ত বন্য কুকুরের মতো হয়ে থাকত। সকাল থেকে হয়তো কুড়ি জন এসে পর পর ধর্ষণ করত। করেই যেত। কী যে কষ্ট হত, কী যে কষ্ট, বাপ রে! মনে পড়লে মনে হয় এখুনি আবার দম আটকে যাবে। আমার যোনি সব সময় ছেঁড়া ছেঁড়াই থাকত। হাঁটতে পারতাম না ঠিক করে। গর্ভপাত হয়েছে আমার দু-তিন বার। আর কুড়ির কোঠা পেরোতে না পেরোতে জরায়ু বাদ হয়ে গেছে। আমি আর মা হতে পারিনি।’

অবিরাম ধর্ষনে গর্ভবতী এক যৌনদাসীকে নিয়ে হাস্যরসে মেতে ওঠেছে জাপানি সৈনিক। অসহায় অন্য দাসীরা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সেনাদের ‘কমফর্ট’-এর জন্য, লক্ষ লক্ষ কোরিয়ান মেয়েকে যৌন দাসী করে পাঠানো হয়েছিল। যার জন্য জাপান ক্ষমা চাইল এই সে দিন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এশিয়ায় জাপান তখন অক্ষশক্তির টেক্কা। হিটলারের প্রিয় দোসর। দখল করেছে চীন, কোরিয়া, ফিলিপাইনসহ বেশ কয়েকটি দেশ। দেশটির সেনারা ঘাঁটি গেড়েছে সেসব দেশে। বোমা-কামান-গোলা-গুলি দিয়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে প্রতিপক্ষকে। দিনের শেষে সেনা ছাউনিতে ফিরেও তো ছিঁড়ে খাওয়ার কাউকে চাই।

জাপান এ ব্যাপারে বেশ উদার ছিল। সে দেশে যৌনবৃত্তি আইনসম্মত। আর তাই যুদ্ধের সময় জাপানের যৌনকর্মীরা বিদেশে যেসব জায়গায় জাপানি সেনারা রয়েছে, সেখানে গিয়ে সেনাদের পরিতৃপ্ত করত। দলে দলে ‘কমফর্ট উইমেন’ হিসেবে রওনা দিত সেনাদের ‘কমফর্ট স্টেশন’-এ।

কিন্তু এক সময় জাপানের মনে হল এতে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। অতএব যেখানে যেখানে ঘাঁটি গাড়া হয়েছে, সেখান থেকেই মেয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই লোকাল মেয়েদের চাহিদা বাড়ল, আর তাই দালাল জুটল, আর তাই যৌনক্রীতদাসী হয়ে গেল দখল-নেওয়া দেশগুলোর বছর বারো-তেরোর মেয়েরাও।

বিশেষ করে কোরিয়া আর চীনের বারো বছর থেকে শুরু করে যৌবনবতীরা হাজারে হাজারে পাচার হয়ে গেল আরামদাত্রী হিসেবে। বেশির ভাগ মেয়েকেই লোভ দেখানো হয়েছিল, কাজ দেওয়া হবে। যুদ্ধের বাজার। মেয়েরা ফাঁদে পা দিয়েছিল। অনেককে আবার তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মায়ানমারের ইয়াঙ্গুনে চীনা এক যৌনদাসী মিত্রবাহহিনীর এক অফিসারের কাছে জাপানি সৈনিকদের নির্মম অত্যাচারের কাহিনী বর্ণনা করছেন। ছবিটি ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্টে তোলা।

ফিলিপাইনের মারিয়া রোজা হেনসন বলেন, তার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে অসহ্য ক্লান্তিটা। ‘এতটুকু বিশ্রাম পেতাম না। হয়তো বারো জন ধর্ষণ করল, তার সামান্য পরেই আবার বারো জন। ওরা বোধহয় প্রত্যেক মিনিটেই যৌনতা চাইত।’

তাইওয়ানের এক নারী জানান, ‘সকালটায় সৈনিকদের জন্য ব্রেকফাস্ট তৈরি করতে হত, তারপর ওদের জামাকাপড় কাচতাম আর সেলাই-ফোঁড়াই করতাম। সেটা সহজ ছিল। কিন্তু রাত্রে আমাদের একটা ঘরে ডেকে নেওয়া হত... আমি সারা ক্ষণ কাঁদতাম। রাত্রে আমি মরে যেতাম। প্রত্যেক রাত্রে আমি মরতাম। পালানোর কথা ভাবতাম, কিন্তু সৈন্যরা গেট পাহারা দিত। এত ছোট ছিলাম, কিছু বুঝতাম না। কখন প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছি, বুঝতেই পারিনি। যখন বমি করছি, এক মহিলা আমায় বোঝালেন। দু’মাসের মধ্যে মিসক্যারেজ হয়ে গেল। যুদ্ধের পর আমার প্রেমিক ফিরে এল, আমরা বিয়ে করলাম। কোনও দিনই ওকে এসব বলতে পারিনি। কী করে বলব? পঞ্চাশ বছর পর, যখন এই অভিজ্ঞতাগুলো বলা হচ্ছে, আমি আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। স্বামীকে প্রথমে সব বললাম। ভেবেছিলাম, ও আমাকে ক্ষমা করবে না। কিন্তু ও অবাক হয়ে গেল। বলল, যুদ্ধে আমরা অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি, কিন্তু তোমার যন্ত্রণা, তোমাদের যন্ত্রণা তো তার চেয়ে অনেক বেশি!’

তবে জাপান সবচেয়ে বেশি এই অত্যাচার চালিয়েছে কোরিয়ান মেয়েদের ওপরেই। জাপানি সেনাদের যৌনদাসী হতে হয়েছে সেদেশের প্রায় তিন-চার লাখ মেয়েকে।

সৈন্যরা স্থানীয় লোকদের দিয়ে কিছু খড় বিছিয়ে নিত সেই সব ট্রেঞ্চে। সেখানে সাপ্লাই হত বারো-তেরো বছরের মেয়েরা। তাদের যোনি তখনও ঠিক মতো তৈরি হয়নি। কিন্তু তাতে তো আর ধর্ষণ আটকায় না। সেই সব বাচ্চা মেয়েরা রাতে কাঁদত জোরে। ‘মা গো আমার বড্ড জ্বালা করছে, মা গো আমার বড্ড খিদে পেয়েছে।’

কিমিকো কানেদা বলেছিলেন, ‘আমরা ওদের কান্না শুনতে পেতাম, কিন্তু ওখানে গিয়ে খাবার দেওয়ার সাহস হয়নি। আমার ভয় করত, যদি খাবার দিতে যাই আর আমাকেও ট্রেঞ্চের মধ্যে টেনে নেয়?’ ওখানে অনেকের টিবি হত। যখনই কোনও মেয়ে মারা যেত, সঙ্গে সঙ্গে অসুখ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ট্রেঞ্চের বাকি সবাইকে বিষ দিয়ে মেরে ফেলা হত। আর ওই ট্রেঞ্চটা বন্ধ করে আবার একটা ট্রেঞ্চ কাটা হত, আবার সেখানে ফুটফুটে মেয়েরা তাদের অস্ফুট যোনি নিয়ে উপস্থিত হতো। আর এই অপরিসীম অত্যাচারে বেশির ভাগ ‘কমফর্ট উইমেন’ মরে গেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে ১৯৪৫ সালে। তখন থেকেই কোরিয়া তার মৃত ও জীবিত, ক্ষতবিক্ষত মেয়েদের জন্য ন্যায় দাবি করে এসেছে জাপানের কাছে। বলেছে, নিঃশর্ত ক্ষমা চাও। বলো, অন্যায় করেছ। ক্ষমতার জোরে এতগুলো মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছ, তার প্রতিদান দাও। স্বীকার করো, যা করেছ তা মানবিকতার অপমান।

পাঠকরা এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন ঠিক কি কারণে কোরিয়ান মেয়ের মূর্তিটি জাপানীদের এত অস্বস্থির কারণ।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/পিএম

উপরে