আপডেট : ১৪ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৫:১০

রাজধানীর যানজটে ভাঙ্গছে প্রেম!

প্রভাব পড়ছে সামাজিক সম্পর্কেও
মির্জা শ্রাবন
রাজধানীর যানজটে ভাঙ্গছে প্রেম!

সম্পর্ক! কেবল একটি শব্দ নয়। এতে জড়িয়ে থাকে আবেগ, অনুভূতি, ভালোলাগা, শ্রদ্ধা, স্নেহ। সম্পর্কটি হতে পারে প্রেম-ভালোবাসার, হতে পারে বন্ধুত্বের কিংবা আত্মীয়তার। তবে সম্পর্কগুলো যখন মজবুত হয়, পারস্পরিক সহযোগিতা বা বোঝাপড়া ভালো হয় অথবা মায়া-মমতার মিশেলে তৈরি হয়, তখন মনের মধ্যে এক ধরনের স্বর্গীয় অনুভূতি জাগে। নিজেকে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।

কিন্তু কোনো কারণে সম্পর্কে তিক্ততা এলে, আগের মতো হৃদ্যতা না থাকলে, সেই ‘মধুমাখা’ সম্পর্কটির চেয়ে বিরম্ভনা আর নেই। তখন প্রতিটি সম্পর্কে যেমন একদিকে থাকে  প্রচন্ড মায়া, অন্যদিকে তিক্ততা। নানা কারণেই এমন সম্পর্কগুলো ভেঙে যায়। সব সময় যে ভেঙে যায় তেমনটি নয়, অনেক সময় খারাপ হয়ে যায়। দুরত্ব নামক দৈত্যটি বাসা বাঁধে। দেখা যায়, যে মানুষগুলোর সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানোর কথা, তারাই সবচেয়ে দূরে সরে যায়। এটা প্রেমিক যুগল থেকে শুরু করে বন্ধু-আত্মীয়-প্রতিবেশীর সঙ্গেও ঘটতে পারে। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি, একে অন্যের প্রতি  শ্রদ্ধাবোধ হারানো, আস্থা বা বিশ্বাসের অভাবসহ নানান কারণে এমনটি হয়। তবে সম্পর্কচ্ছেদের একটি অন্যতম কারণ পরস্পরকে সময় না দেয়া।

অদ্ভুদ শোনালেও সত্য, অতিরিক্ত যানজটের কারণে রাজধানীতে অনেক সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে বন্ধুদের সঙ্গে সেই আগের সোনালি সম্পর্ক, আত্মীয়র সঙ্গে কেটে যাচ্ছে অটুট বন্ধনের রেশ। একে অপরকে সময় না দিতে পারার অভিযোগে বা অযুহাতে চ্ছেদ হচ্ছে দীর্ঘদিনের কাঙ্খিত-যত্নের ভালোবাসার সম্পর্কটিও। রাজধানীর অনেক যুগলের অভিযোগ তারা সঙ্গীকে সময় না দিতে পারায় সম্পর্কটি ভেঙে গেছে। কারণ সময় না দেয়ায় প্রেমিকার ধারণা হয়েছে, প্রেমিকের কাছে তিনি গুরুত্বহীন। সে তাঁকে ভালোবাসে না। অথবা সম্পর্কটি নিছক ছলনার। নতুবা কেন সঙ্গী তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না, কেন একসঙ্গে সময় কাটাতে চাইবে না।

এ বিষয়ে প্রেমিকের দাবি বিষয়টি এমন নয়। তিনি বলেন, আমি নগরের এক কোণায় থাকতে থাকতে এমন অভ্যেস করে ফেলেছি। এখন আর মূল ঢাকায় আসতে ইচ্ছে করে না। এ কারণেই আমার প্রেমিকার সঙ্গে আমার দেখা করতে আসতে ইচ্ছে করত না। তখন বিষয়টি বুঝতে পারিনি। এখন বুঝি। তাঁর প্রতি অবহেলা বা অনীহা ছিলো না। এখনও ওকে ভালবাসি। যদিও আমাদের সম্পর্কটি ভেঙে গেছে। আবার এই অভিযোগ প্রেমিকার প্রতি রয়েছে প্রেমিকেরও।

যানজটের কারণেই সম্পর্কের অবনতি। প্রেম ভেঙে যাচ্ছে। মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। শুধু প্রেম ভালোবাসা নয় বৈবাহিক জীবনেও এ নিয়ে অশান্তির শেষ নেই। যদিও বিষয়টা একটু অবিশ্বাস্য লাগে। বউয়ের আবদার পদ্মায় যাবে ইলিশ খেতে। প্রায় বছরখানিক বলার পরেও স্বামী আবদারটি রাখেননি। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে কম তিক্ততা-ঝগড়া হয়নি। এছাড়া বউ পছন্দ করেন বেড়াতে। কিন্তু স্বামী কখনোই তাঁকে নিয়ে বের হননি। এ বিষয়ে বউয়ের অভিযোগ, আমাকে অবহেলা করে বলেই এ রকম করছে। আমার কোনো চাওয়ার মূল্য ওর কাছে নেই। অথচ স্বামী বলছে, এ জ্যাম ঠেলে কোথাও গেলেই আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা, গরম, শব্দ। আরেক দম্পতির ক্ষেত্রে ঘটনা ঠিক উল্টো। স্বামী বউ-বাচ্চাসহ প্রায়ই বেড়াতে যেতে চান। অথচ সারাদিন অফিস চাকরি সামলে কোনভাবেই বাইরে যাবেন না বউ। শুরু হয় ঝগড়া, তিক্ততা। এ থেকেই তাঁদের সম্পর্কে প্রথম টানাপোড়ন শুরু হয়। এখন সম্পর্কটা অনেকটা ভাঙনের মুখে। তাঁরা জানেন না এখান থেকে আর আগের সেই সুখের দিনে ফিরতে পারবেন কিনা।

এছাড়া আত্মীয়-স্বজন, বন্ধ-বান্ধবদের মধ্যেও যানজটের কারণে সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। সন্ধ্যায় বন্ধুর মেয়ের জন্মদিন। অথচ রাজনৈতিক সমাবেশের কারণে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজটের। সিদ্ধান্ত নিলেন আজ কোনভাবেই এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। অথচ বন্ধু হয়তো পথ চেয়ে বসে আছেন। শুরু হলো বন্ধুত্বের গভীরতা নিয়ে সংশয়, পরিণতি দুরত্ব। অনেকে জানান, যানজটের কারণে এখন আর আগের মতো বিয়ে-জন্মদিনসহ সামাজিক-পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা হয় না। এ থেকে মান-অভিমান, শেষে সম্পর্কের গভীরতা হালকা হয়ে যায়। অথচ কেউ জানেন না ‘যানজট’ নামক এই অভিশাপ থেকে রাজধানীবাসীর মুক্তি মিলবে কবে, আদৌ মুক্তি মিলবে কিনা!

উপরে