আপডেট : ৮ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৫:০৯

জাঞ্জিবারের গোপন কাহিনী

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাঞ্জিবারের গোপন কাহিনী

সুদূর আফ্রিকার এক দ্বীপভূমি জাঞ্জিবার।

বছর তিনেক আগে ওই এলাকার বাসিন্দা আইশার জীবনে যখন বিপর্যয় দেখা দেয়, সে তখন অ্যালকোহলে নিজের দুঃখ ভোলার উপায় খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হয়। তার স্বামী গোরু চুরির কারণে জেলে গেলে সে অসহায় আবস্থায় পড়ে। তার কোলে তখন ১৮ মাসের বাচ্চা। আর শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রাও তার প্রতি মোটেও সদয় ছিলোনা। পরিস্থিতি এমন দিকে এগোয় যে, আইশাকে নেশার জগৎ একটা পরিবর্তনের সন্ধান দেয়।

জাঞ্জিবারের মতো এক দ্বীপভূমিতে মদের চাইতে হেরোইনের দাম কম। এক বোতল জাঞ্জিবার বিয়ারের দাম যেখানে ২০০০ শিলিং (১ মার্কিন ডলার), হেরোইন সেখানে ১০০০ শিলিং (০.৫০ মার্কিন ডলার)। আইশার দুঃখ ভোলার পন্থাটা স্বভাবতই  সস্তার দিকেই ঝোঁকে। জাঞ্জিবার সিটির কাছে এক গোপন আস্তানায় আইশা একদিন মাদকে দীক্ষিত হয়!

ইউনেস্কোর সংরক্ষিত জাঞ্জিবার স্টোনটাউনে কিউরিও শপ এবং সোয়াহিলি প্রত্নাবশেষের গোলোকধাঁধা ঐ এলাকার প্রধান পর্যটনক্ষেত্র। রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্রিক বেলাভূমিও অসংখ্য পর্যটককে আকর্ষণ করে। কিন্তু এর পাশাপাশি এটাও সত্যি যে, এই দ্বীপ প্রচুর পরিমাণে হেরোইনের আমদানিকেও আকর্ষণ করে।

জাতিসংঘের মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মাদক আমদানির ক্রমবৃদ্ধি পূর্ব আফ্রিকাকে ইরান, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের দক্ষিণ থেকে ইউরোপ পর্যন্ত প্রসারিত ‘স্ম্যাক ট্র্যাক’ বা ‘মাদক পথ’-এর সঙ্গে যুক্ত রাখে।

২০১৪ সালে কম্বাইনড মেরিটাইম ফোর্স জানায়, ২২০০ কেজিরও বেশি হেরোইন ভারত মহাসাগর থেকে তারা উদ্ধার করেছে। ওই পরিমাণটি সমগ্র আফ্রিকা থেকে ২০১১-১৫ সালের মধ্যে উদ্ধারকৃত হেরোইনের চাইতেও বেশি। এ কথা জাতিসংঘের মাদক সংক্রান্ত অপরাধ বিভাগও ২০১৫’র ওয়ার্ল্ড ড্রাগস রিপোর্টে স্বীকার করেছে।

৩০টি রাষ্ট্রের দ্বারা পুষ্ট কম্বাইনড মেরিটাইম ফোর্স গত মে মাস থেকে পূর্ব আফ্রিকান জলরাশিতে ১.৭ টন হেরোইনের হদিশ পেয়েছে। তা সত্ত্বেও এই ড্রাগ জাঞ্জিবারের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। এখানকার ১.৩ মিলিয়ন বাসিন্দার ৫ শতাংশই গ্রাম প্রতি ১৫ মার্কিন ডলারের এই নেশায় তনুমন সমর্পণ করেছে।

আয়শা জানাল, প্রথম যখন সে ড্রাগ নেয়, তার তখন প্রায় মৃত্যুর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কিন্তু সে এটাতে অভ্যস্ত হতে শুরু করে। একটা সময়ের পর থেকে হেরোইন তার সব দু:খ ভুলিয়ে দেয়। এমন একটা পর্যায় আসে, সে এই নেশার খরচ সংগ্রহের তাগিদে ২.৫০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে দেহ ব্যবসাও আরম্ভ করে। এই মুহূর্তে আইশা মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট এক চিকিৎসালয়ে রয়েছে। জাঞ্জিবারের ‘রিকভারি কমিউনিটি’-র দ্বারা নির্ধারিত ১২টি পর্যায়যুক্ত এক কার্যক্রমে সে তার নেশা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে।

হেরোইন এবং কোকেনের মতো নেশার প্রকোপ থেকে জনগণকে বাঁচাতে জাঞ্জিবার ও তানজানিয়ার সরকার ‘মেথাডোন প্রোগ্রাম’ও চালু করেছে।

জাঞ্জিবারের তট পার হয়ে তানজানিয়ার মূলভূমির বাগামোয়ো নামের পুরনো বন্দর শহরটিতে নৌকার খালাসিরা জানান, দিনে সাদামাটা পণ্যের খালাসের কাজ করলেও রাতে তাঁরা ‘অন্য রকম’ মালের খালাস করেন।

বাগামোয়োর বাসিন্দা মহম্মদ হাজির মতে, এই ধরনের খালাসের কাজ কিন্তু গোপনেই হয়ে থাকে। তবে, তিনি এটাও জুড়ে দিলেন যে, বাগামোয়োতে ড্রাগ অ্যাডিক্টদের সংখ্যা কিছু কম নয়।

গডফ্রে তানজানিয়ার অ্যান্টি-নারকোটিকস ইউনিটটি চালান। ২০১১ সালের একটি হিসেব থেকে তিনি জানালেন, সে সময় বাগামোয়োতে ১৮০ কিলোগ্রাম হেরোইন আটক হয়।

১ হাজার মাইল লম্বা তটভূমির সমস্ত গ্রাম তল্লাশি করে ড্রাগের ছোট ছোট প্যাকেট খুঁজে বার কারাটাও তো সহজ কাজ নয়! বস্তুত, সমুদ্র-তীরবর্তী এই সব গরিব গ্রামগুলো থেকেই হেরোইন বা কোকেনের মতো মাদক অনায়াসে দেশের ভিতরে প্রবেশ করে।

গডফ্রে জানান, সোর্স কান্ট্রি থেকে বড় জাহাজেই হেরোইন পাচার হয়ে আসে। দরিয়ার কোনও একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে ছোট নৌকা বা স্পিডবোটে তা নামিয়ে নেওয়া হয়। তবে, তার নিজের প্রতিষ্ঠান এবং তার জাঞ্জিবার কাউন্টারপার্ট ঠিক কীভাবে কাজ করে, তার বিশদ তিনি দিতে পারেননি।

জাঞ্জিবারের ‘রিকভারি কমিউনিটি’-র ম্যানেজার কাশিম নয়ুনি জানান, দ্বীপের পুলিশ এই সব কাজে ঠিক কতটা দক্ষ, তা বলা শক্ত।

তিনি আরো জানান, দ্বীপ পুলিশের গাড়ি নেই, কম্পিউটার নেই, তেমন প্রশিক্ষণও নেই। সর্বোপরি তারা আদৌ সিরিয়াস নয়। এ ব্যাপারে যে টাকা আর লোকবলের অভাব তাদের অসহায় করে রেখেছে, তাও ঠিক নয়। আসলে ড্রাগের ব্যবসায় জড়িত ক্ষমতাবানদের মোকাবিলা করার সামর্থ তাদের নেই। মাদক ব্যবসায়ীদের হাত অনেকটাই লম্বা। সরকারেও তাদের প্রতিপত্তি যথেষ্ট।

গডফ্রে অক্লান্তভাবে কাজ করে চলেছেন, যে কথা অস্বীকার করা যায় না। তবে মাদক পাচার রুখতে যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ইনফর্মারের, সেটা তিনি বার বার বলেছেন। এমনই এক ‘ইনফরম্যান্ট’ হংকংয়ের এক ক্যাথলিক যাজক জন উদারস্পুন জানালেন, হংকংয়ের জেলে ড্রাগ পাচারের দায়ে অভিযুক্ত তানজানিয়ানের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান!

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/পিএম

উপরে