আপডেট : ১৩ মার্চ, ২০১৮ ১২:০৬

৫০ হাজার এসএসসি পরীক্ষার্থীর ফল বাতিল হচ্ছে!

অনলাইন ডেস্ক
৫০ হাজার এসএসসি পরীক্ষার্থীর ফল বাতিল হচ্ছে!

ফাঁস হওয়া প্রশ্নে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার দায়ে ৫০ হাজার শিক্ষার্থীর ফল নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। বিষয়টি প্রমাণিত হলে এসব পরীক্ষার্থীর ফলাফল বাতিল করা হতে পারে। ইতোমধ্যে ওই সব শিক্ষার্থী চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এসব শিক্ষার্থীর ফল বাতিলের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটিও সুপারিশ করেছে।

গতকাল সোমবার ওই কমিটির প্রতিবেদন মাধ্যমিক ও শিক্ষা বিভাগের সচিবের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরীক্ষা শুরুর আগে মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস বিকাশ এবং রকেটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা লেনদেনকারীদের সন্দেহে এনে দোষী পরীক্ষার্থীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এ ছাড়া ফেসবুকের সংশ্লিষ্ট গ্রুপ এবং গ্রেপ্তার ও বহিষ্কৃত ব্যক্তি, শিক্ষক-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে দোষী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এদিকে আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস রোধে ব্যাপক পদক্ষেপ নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ওই সব পদক্ষেপ নিয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব। বৈঠকে কয়েকটি বিষয় চূড়ান্ত হলে আগামী ১৯ মার্চ আট বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৮ জন অতিরিক্ত সচিব। বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের সব প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে থাকতে বলা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদন পেশ : প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে গঠিত মন্ত্রণালয়ের কমিটির প্রতিবেদন গতকাল সোমবার বিকেলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কমিটির সদস্য সচিব আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন কমিটির পক্ষে খামবদ্ধ প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন। তিন পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনসহ ৮ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে চারটি সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো হল- এক. ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে তাদের ফলাফল বাতিল করা। এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর পাস করা কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেও যদি ফাঁস প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তখনো তার ফল বাতিল হবে। পাশাপাশি এসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। দুই. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে প্রশ্নপত্র নেয়ার দায়ে যারা বহিষ্কৃত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া। তিন. ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের সঙ্গে যেসব পরীক্ষার্থীর লিঙ্ক ছিল তাদের চিহ্নিত করে পরবর্তীতে তাদের ফল বাতিলসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। চার. কমিটি প্রশ্নফাঁসের কারণে কোনো পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে নয়। কেননা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উš§ুক্তভাবে প্রশ্নফাঁস হয়নি। কাছাকাছি কিছু লোকের মধ্যে (ক্লোজ গ্রুপ) প্রশ্ন শেয়ার হয়। ফলে পরীক্ষার আগমুহূর্তে অতি নগণ্যসংখ্যক

পরীক্ষার্থীর প্রশ্ন পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। ২০ লাখ সাধারণ পরীক্ষার্থীর হাতে প্রশ্ন পৌঁছায়নি। যারা আগ মুহূর্তে সঠিক বা ভুয়া প্রশ্ন পেয়েছে তারা ওই সময় পরীক্ষা কেন্দ্রের পথে বা কেন্দ্রের সামনে ছিল। এ সময় প্রশ্ন পেয়ে থাকলেও তারা তেমন লাভবান হতে পারেনি। এ কারণে পরীক্ষা বাতিল করা সমীচীন হবে না।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কেনার জন্য যারা বিকাশ কিংবা রকেটে টাকা লেনদেন করেছিল তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। টাকা লেনদেন হওয়া পরীক্ষার্থীদের ফলাফল বাতিল করা হবে। এ ছাড়া এবার ১৭টি বিষয়ে এসএসসি পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি বিষয়ের এমসিকিউ অংশের শুধু ‘খ’ সেট প্রশ্ন পরীক্ষার সর্বোচ্চ একঘণ্টা আগে ফাঁস হয়েছে বলে কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে। আর সর্বোচ্চ ৫০ হাজার শিক্ষার্থী সেই প্রশ্ন পেয়েছে। তাদের কারণে বাকি সাড়ে ১৯ লাখ শিক্ষার্থীকে কষ্ট দেয়া ঠিক হবে না। এ কারণে আমরা গোটা পরীক্ষা বাতিল করছি না।

কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, পরীক্ষা বাতিল করা হলে ২০ লাখ পরীক্ষার্থী, তাদের বাবা-মা ও অভিভাবককে বিপদে ফেলা হবে। তা ছাড়া পরীক্ষা বাতিল করে প্রচলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা নিতে গেলে আবারো যে প্রশ্নফাঁস হবে না সে নিশ্চয়তা নেই। বরং এতে নিরপরাধ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকসহ কোটি মানুষের ভোগান্তি বাড়বে। তাই পরীক্ষা বাতিল না করাই অধিক যুক্তিযুক্ত বলে কমিটি মনে করছে।

কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্নফাঁসের যে অভিযোগ করা হচ্ছে এর অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা আগে ‘কিছু বিষয়ের’ প্রশ্নপত্র প্রকাশিত হয়েছে, তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্লোজ গ্রুপে ছড়িয়ে পড়ে। ওই প্রশ্নের সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল আছে। তবে এ ধরনের গ্রুপে সর্বোচ্চ ১০০ সদস্য থাকতে পারে। মোট কটি গ্রুপের হাতে প্রশ্ন পৌঁছেছে সে তথ্য কমিটি বের করতে পারেনি। কমিটি মনে করছে, ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা আগে ফাঁস হলেও যারা প্রশ্ন পেয়েছে তারাও খুব বেশি লাভবান হতে পারেনি। কেননা, ৩০ মিনিট আগে কেন্দ্রে প্রবেশ বাধ্যতামূলক ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও মোবাইল ফোনে দেশের দু-এক স্থানে অতি নগণ্যসংখ্যক পরীক্ষার্থী প্রশ্ন পেয়েছে। তবে ওই প্রশ্ন সঠিক কিনা, তা যাচাই করা দুরূহ। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু ভুয়া প্রশ্নও ছড়িয়েছে। সেগুলোর পেছনে ছুটে লেখাপড়া না করা কিছু শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত ১ ফেব্রুয়ারি এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। শুরুর দিন এসএসসিতে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে ৪ ফেব্রুয়ারি কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীরের নেতৃত্বে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সূত্র জানায়, গত ১ মার্চ প্রতিবেদন চূড়ান্ত হলেও সদস্যদের স্বাক্ষরে সময় লাগে ৯ দিন। এরপরও দুজন সদস্যের স্বাক্ষর ছাড়াই গতকাল সোমবার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

এইচএসসিতে নেয়া পদক্ষেপ : আসন্ন এইচএসসির প্রশ্নফাঁস রোধে ৮ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের প্যাকেটে সিকিউরিটি ট্যাপ লাগানো। নির্ধারিত সময়ের আগে প্যাকেট খোলা হলেই সিকিউরিটি ট্যাপের মাধ্যমে চিহ্নিত করা যাবে। পরীক্ষার হলে সব সেটের প্রশ্নই কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হবে। যে সেটে পরীক্ষা হবে তা পরীক্ষা শুরু হওয়ার ২০ মিনিট আগে সংশ্লিষ্টদের জানানো হবে। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিটের আগে অবশ্যই পরীক্ষার্থীকে পরীক্ষার হলে আসন নিতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে ওই পরীক্ষার্থীকে আর পরীক্ষার হলে ঢুকতে দেয়া হবে না। জেলা এবং উপজেলার ট্রেজারি থেকে নির্ধারিত তিন সদস্যের কমিটি প্রশ্ন সংগ্রহ করবে। এতদিন এই নিয়মে উদাসীনতা ছিল। যে কোনো একজন গিয়েই ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে আসতেন। এবার থেকে এভাবে আর চলবে না। ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র আনতে তিনজনের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১৪৪ ধারার মধ্যে মোবাইল ফোনসহ যাকে পাওয়া যাবে, তাকেই গ্রেপ্তার করা। পাশাপাশি পরীক্ষার কেন্দ্রে স্মার্টফোন পেলেই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।

জানতে চাইলে মাধ্যমিক ও শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন গতকাল সোমবার বলেন, আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ব্যাপক পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর অংশ হিসেবেই আজ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রুমা

উপরে