আপডেট : ২৭ মার্চ, ২০১৬ ১৪:৩৪

রাজধানীর ২৩ প্রাথমিক বিদ্যালয় অবৈধ দখলে

বিডিটাইমস ডেস্ক
রাজধানীর ২৩ প্রাথমিক বিদ্যালয় অবৈধ দখলে

গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। গত ৯ বছর ধরে স্কুলের সামনে ভাঙ্গারির দোকান ভাড়া দিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। স্কুল ঘেঁষে চারপাশে তৈরি হয়েছে দেয়াল। চারপাশে অন্ধকার, ঘিঞ্জি পরিবেশ। রাত-দিন কলকারখানার শব্দ।

বর্তমানে এই স্কুলে ১০০-র মতো শিক্ষার্থী। পরিবেশের কারণে বছর বছর শিক্ষার্থী কমছে স্কুলটিতে। গত এক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৩৯ জন। শিক্ষকদের অভিযোগ, এভাবে চলতে থাকলে একসময় স্কুল বন্ধ করে দিতে হবে। স্কুলটি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের একটি বিল্ডিং ঘেঁষে ৫ তলা ভবন করেছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। সামনের গেট বন্ধ করে কয়েকটি দোকান ভাড়া দিয়েছে মহিলা  সমিতি।

কয়েক বছর ধরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এগুলো সরিয়ে নিতে কয়েক দফা নোটিশ দিলেও সাড়া মিলেনি। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সরজমিন পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসককে দখল উচ্ছেদ করার সুপারিশ করেন। প্রয়োজনে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ল্যান্ড ট্রাইব্যুনালে মামলা করার কথাও বলেন। তাতে কী। টনক নড়েনি দখলবাজদের। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এক বছরের বেশি ধরে কাগজে-কলমে আটকে আছে। উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো একদিনেও জন্য যায়নি প্রতিষ্ঠানে। এমনকি কোন খোঁজখবর পর্যন্ত নেয়নি। স্কুলের শিক্ষকরা জানান, গরিবের স্কুল বলে কেউ অ্যাকশন নেয় না। বড় লোকের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করলে ঠিকই এতদিনে উদ্ধার হয়ে যেত।

শুধু গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি প্রাথমিক স্কুল নয়, রাজধানীতে ৩০টি বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একই কায়দায় প্রভাবশালীদের দখলে। তবে ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ২৩টি স্কুল দখলের তথ্য দিয়েছে। গত বছর প্রাথমিক ও গণ শিক্ষামন্ত্রণালয় সর্ম্পকিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কর্তৃক গঠিত ৩নং সাব-কমিটির সদস্যরা এসব স্কুল সরেজমিন পরিদর্শন করে অবৈধ দখলের প্রমাণ পান। এসব স্কুল দখলমুক্ত করতে স্থানীয় জেলা প্রশাসক, থানা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের কাছে সুপারিশ পাঠায়। সংসদীয় কমিটির সুপারিশের এক বছর পার হয়ে গেলেও একটি স্কুলও দখলমুক্ত করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট বিভাগ।

 
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শাহিন আরা বেগম বলেন, গত বছর ১৫ই নভেম্বর সংসদীয় কমিটির সুপারিশগুলো আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছি। এর আগে কয়েক দফা নোটিশ করা হয়েছিল। কিন্তু একটি স্কুলও দখলমুক্ত হয়নি। তিনি জানান, আমাদের সুপারিশ করা ছাড়া কিছু করার নেই। কারণ স্কুলের জায়গা দখলমুক্ত করবে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা।

এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন বলেন, কয়েকটি কারণে স্কুলের দখল হওয়া জায়গা উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। এরমধ্যে অন্যতম জমি নিয়ে মামলা, কোর্টের স্থগিতাদেশ, প্রভাবশালীদের হাত, স্কুল প্রতিষ্ঠাতা নিজেই দখল করে রাখার মতো ঘটনা। তারপরও আমরা জেলা প্রশাসককে দখলমুক্ত করার সুপারিশ করেছি। তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্কুলের মোট ২৫ শতাংশ জমি দখল করেছে রেখেছে শিশুদের নিয়ে গঠিত একটি সংগঠন। আর স্কুলের সামনে ৩টি দোকান চালাচ্ছেন গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি। এই দোকানগুলো স্কুলের সামনে ব্যারিকেট তৈরি করেছে।

পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ের সাড়ে ৫ শতাংশ জায়গা নিজেদের দাবি করে পুরোটাই দখল করেছে পাশে অবস্থিত আরেকটি বেসরকারি বিদ্যালয় নাজিরাবাজার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। এ বিষয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়র সাঈদ খোকনকে দায়িত্ব দিলেও একদিনের জন্য কেউ যায়নি সেখানে। এছাড়া স্কুলের নামে কোনো বিদ্যুতের মিটার না থাকায় পাশের স্কুল থেকে বিদ্যুতের লাইন নিতে হয় তাদের। জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।

গত বছর বেইলি রোডের সামাজিক শিক্ষাকেন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬ শতাংশ জমি দখল করে বিদ্যালয় ভবন গুঁড়িয়ে দেয় গার্লস গাইড অ্যাসোসিয়েশন। স্কুলের প্রায় সব শিক্ষার্থী এখনও খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করে। মিরপুরের শম্পা চম্পা পারুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন ভেঙে দখল নিয়েছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের এখন খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৭৪ সালে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। গত বছর জুলাই মাসে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি দুটি ক্লাস রুম গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই দুই শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা এখন খোলা আকাশের নিচে ক্লাস করছেন। এতে পুরো স্কুলের শিক্ষা কার্যত্রুমে ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানান তিনি।

ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এক প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে, জমি বেদখল হওয়ায় রাজধানীর কাপ্তানবাজারের খোদাবক্স সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ডেমরার ব্রাহ্মণচিরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেক জমি দখলদারদের হাতে। তারা সেখানে টিনের ঘর তৈরি করে ভাড়া দিয়েছেন। মোহাম্মদপুরের টাউন হলসংলগ্ন শাহীন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬ শতাংশের জমির মধ্যে ৩১ শতাংশ জমিতে দখল হয়ে আছে। শেরেবাংলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৯৫ শতাংশ জমির মধ্যে ৩৩ শতাংশ জমি এক ব্যক্তি পূর্বপুরুষের জমি দাবি করে বস্তি বানিয়ে ভাড়া দিয়েছে। কাজী ফরিদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮৫ শতাংশ জমির ১৬৯ শতাংশ জমিতে বস্তি ঘর গড়ে উঠেছে। এফ কে এম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারতলা ভবনের তিনটি তলাই দখল করে রেখেছে বংশাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও স্থানীয়রা। সুরিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবনের মধ্যে একটি দখল করে নিয়েছে ‘রমনা রেলওয়ে’ নামের একটি বেসরকারি বিদ্যালয় আর অবশিষ্ট ১০৮০ বর্গফুট জমি দখল করে ওয়াসার পাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। কামরাঙ্গীরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে ১৭ শতাংশ জমিতে স্থানীয় প্রভাবশালী এক জন ব্যক্তি ও তার দলবল মিলে ভবন তৈরি করছে।

পুরান ঢাকার বাংলাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনে এখনো বসবাস করছেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা। ছোটকাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ শতাংশ জমি একটি এনজিও দখল করেছে। শহীদ নবী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ দশমিক ০৩ শতাংশ দখল করে আছে শহীদ নবী উচ্চ বিদ্যালয়। শিশু রক্ষা সমিতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৬ শতাংশ জমি দখল করে ঘর তৈরি করেছে স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটি। গাবতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ শতাংশ জমিতে দোকান ও বিলবোর্ড করে ভাড়া দিয়েছে ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠানির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। পল্লবী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের দ্বিতীয় তলা দখল করেছে একটি বেসরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। ধানমন্ডি ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২টি কক্ষে চলছে ধানমন্ডি ল কলেজ আর ১১৯০ বর্গফুট জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে ওয়াসা পাম্প। এদিকে মাতুয়াইল ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ শতাংশ জমিতে, গুলশানের মেরাদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ জমিতে ও মতিঝিলের আইডিয়াল মুসলিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ দশমিক ০৫ শতাংশ জমিতে ওয়াসার পাম্প নির্মাণ করা হয়েছে। মতিঝিলের মাদারটেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৯ শতাংশ জমিও ওয়াসার দখলে চলে গেছে। মতিঝিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২১ শতাংশ জমি দখল করে আছে মতিঝিল কলোনি।

এছাড়া পিএন্ডটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭.৫ শতাংশ জমি পিএন্ডটি উচ্চ বিদ্যালয় আর খিলগাঁও স্টাফ কোয়ার্টার প্রাথমিক বিদ্যালয় ৮.৯২ শতাংশ জমি খিলগাও স্টাফ কোয়ার্টার উচ্চ বিদ্যালয় ব্যবহার করছে। দক্ষিণ বাসাবো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩.৫০ শতাংশ জমিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি নির্মাণ করেছে স্থানীয় এক ব্যক্তি। খিলগাও মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩.৩ শতাংশ জমি দখল করে গ্যারেজ করেছে পার্শ্ববর্তী ভবনের মালিক।

বিষয়টিতে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আইন শাখার একজন কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর বেইলী রোড ও কাপ্তানবাজারের স্কুল যে অজুহাতে দখল হয়েছে সেই অজুহাত দেখালে সারা দেশে ৩৭ হাজার স্কুল দখল করা যায়। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে প্রাথমিক স্কুল জাতীয়করণ সংক্রান্ত প্রেসিডেন্সিশিয়াল অর্ডার মানলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জায়গা কারও নামে থাকলেও তিনি প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া দখল বা ভবন ভাঙতে পারেন না। কিন্তু দখলদাররা ভাঙছেন।

এজন্য সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের গাফিলতিকে দায়ী করেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মতে, রাজধানীর ২৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৬৯ শতাংশ জমিসহ কয়েকশ’ কোটি টাকার সম্পত্তি বেদখল হয়ে আছে। এসব স্কুল দখলমুক্ত করতে হলে প্রশাসনের চেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা প্রয়োজন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে