আপডেট : ১৪ মার্চ, ২০১৬ ১২:১২
লক্ষ্য ভিয়েতনামের আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ

ক্ষুদে জীববিজ্ঞানীদের মিলনমেলা শেষে নির্বাচিত হলো চার বিজয়ী

অনলাইন ডেস্ক
ক্ষুদে জীববিজ্ঞানীদের মিলনমেলা শেষে নির্বাচিত হলো চার বিজয়ী
১১ মার্চ শুক্রবার দিনের শুরুটাই যেন অন্যরকম ছিলো তাদের জন্য। সকাল আটটা বাজার আগেই সাভারের গণস্বাস্থ্য পিএইচএ কনভেনশন সেন্টারে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সমাগম শুরু হয়ে গেছে। দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্প শুরু হতে যাচ্ছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। ভিয়েতনামে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্রতিযোগী বাছাইয়ের জন্য গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় জীববিজ্ঞান উৎসব। সেখানে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিতদের নিয়ে জীববিজ্ঞান বিষয়ক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও চূড়ান্ত বাছাইয়ের জন্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্প। সেখান থেকেই প্রশিক্ষণোত্তর মূল্যায়ণের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কারা ভিয়েতনামে এবছর বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে।
অতিথিদের সঙ্গে বায়োক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী ক্যাম্পাররা
বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো এ বছর আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচিত হলো চার খুদে বিজ্ঞানী। ১৩ মার্চ রবিবার বিকেলে আশুলিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি মিলনায়তনে দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্পে যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে তাদের নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচিত চার শিক্ষার্থী হলো সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী আইমান ওয়াদুদ, মাস্টারমাইন্ডের ওয়াসিক হাসান, অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের মাইশা এম প্রমি এবং স্কলাস্টিকার ওয়াসি রহমান চৌধুরি। আশুলিয়ার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি প্রতিষ্ঠানে গত ১১ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্প-২০১৬। এ ক্যাম্পের আয়োজন করে বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড কমিটি। গতকাল ছিল ক্যাম্পের সমাপনী দিবস এবং বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় সমাপনী অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ’র নির্বাহী সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড কমিটির চেয়ারম্যান ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শাহিদুর রশীদ ভূইয়ার সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির মহাপরিচালক ড. মো. সলিমুল্লাহ, বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস, বিজ্ঞানী ড. জাহাঙ্গীর আলম ও কেশব চন্দ্র দাস। প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোস্তফা কামাল দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্পে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই ক্যাম্পে যারা এসেছে তারা স্বপ্ন দেখে। এদের মধ্য থেকেই কেউ কেউ একদিন নোবেল প্রাইজ পাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এই ক্যাম্পে যারা এসেছে তারা কিছু শেখার জন্য বা বড় একটি আগ্রহ নিয়ে এসেছে। এটাই বিশাল, এরা অনেক দূর যাবে। বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এরা টিকে যাবে।’ তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের কাজ নিজে করার মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করার পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানের সভাপতি ড. মো. শাহিদুর রশীদ ভূইয়া বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে জীববিজ্ঞানে। অন্যগুলো ধার করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মৌলিক গবেষণা ও আবিষ্কার সর্বত্রই জীববিজ্ঞানের সাফল্য। তিনি শিক্ষার্থীদের এই পথ চলার জন্য এবং জীববিজ্ঞানকে ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ জানান। বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী বলেন, আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের পূর্ণ সদস্য দেশ ৬১টি। আর প্রাথমিক সদস্যপদ পাওয়া চারটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ গত বছর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। প্রতিটি জাতীয় দল থেকে চারজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেবে। ডা. সৌমিত্র চক্রবর্তী জানান, গত ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে দ্বিতীয় জাতীয় জীববিজ্ঞান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। ওই উৎসবে ৪৭টি জেলা থেকে এক হাজার ১৫০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। অষ্টম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এ উৎসবে অংশ নেয়। এদের মধ্য থেকে ৬০ জনকে নির্বাচিত করা হয় দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্পে অংশগ্রহণের জন্য। তাদের মধ্য থেকে ৪১ জন তিন দিনের এই বায়োক্যাম্পে অংশ নেয়। এই ৪১ জনের মধ্যে ২৩ জন ছেলে ও ১৮ জন মেয়ে শিক্ষার্থী। এই ক্যাম্প থেকেই এবার চার শিক্ষার্থীকে নির্বাচন করা হয়েছে, যারা আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশ নেবে। দ্বিতীয় জাতীয় বায়োক্যাম্পের মিডিয়া পার্টনার হচ্ছে কালের কণ্ঠ এবং অনলাইন পার্টনার বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম।
ব্যবহারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ক্যাম্পাররা
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে বাংলাদেশ এই প্রথমবারের মতো জীববিজ্ঞানের সর্ববৃহৎ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাচ্ছে। সেই প্রত্যয় নিয়ে অভিভাবকদের বিদায় জানিয়ে একটুখানি ফ্রেশ হয়েই সবাই উঠে পড়লো নির্ধারিত বাসে। গন্তব্য ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজি। সেখানেই হবে মূল প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। সাড়ে আট কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস সেখানে পৌঁছালো। শুরু হলো মলিকুলার বায়োটেকনোলজি ল্যাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচী। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজির বিজ্ঞানীদের সান্নিধ্যে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া এই ক্ষুদে জীববিজ্ঞানীরা হাতে-কলমে শিখলো কীভাবে কোষ থেকে ডিএনএ পৃথক করে তা নিয়ে নানা ধরণের গবেষণা করা যায়। এসব বিষয়ে এদেশে সাধারণত হাতেখড়ি হয় মাস্টার্স বা পিএইচডি করার সময়। আর ক্ষুদে জীববিজ্ঞানীরা সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই। কেননা আন্তর্জাতিক মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে উজ্জ্বল করতে চাইলে অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা চাই। প্রশিক্ষণের মাঝে মাঝে হাসি-গল্প-আড্ডা-গান আর খেলাধূলারও কমতি ছিল না। দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। শেষ হয় সেদিনকার প্রশিক্ষণ। বাসে করে সবাই আবার ফিরে যায় গণস্বাস্থ্য পিএইচএ কনভেনশন সেন্টারে। দ্বিতীয় দিন (১২ মার্চ) দ্বিতীয় দিনে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে সবাই যথারীতি বাসে উঠে পড়ে। গন্তব্য আবারও ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজি।এদিনের প্রশিক্ষণ শুরু হয় চিংড়ি ব্যবচ্ছেদের মধ্য দিয়ে। এমনিতে চিংড়ি খেতে ভালোই লাগে কিন্তু তার ভেতরকার অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জটিলতা নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না। তাই চিংড়ি কেটে তার ভেতরটা আবিষ্কার করাটা শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা ছিল। তারপর উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরীক্ষা। সালোক সংশ্লেষণের মাধ্যমে গাছ অক্সিজেন উৎপাদন করে - এটা সবাই জানে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি হাতে-কলমে পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা লাভ করে এসম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান। কতখানি অক্সিজেন কী সময়ে কেমন আলোতে উৎপাদিত হয় তা-ও মাপতে শেখে তারা। এছাড়াও পাতা-ফুল-মূল প্রভৃতি অংশের বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করা হয়। অণুবীক্ষণ যন্ত্রে সেগুলো কেমন দেখায় সেটাও শিক্ষার্থীদেরকে দেখানো হয়। শুধু তাই নয় অণুবীক্ষণে দেখার জন্য কীভাবে স্লাইড বানাতে হয় - তা শেখাও এই প্রশিক্ষণের অংশ ছিল। সবশেষে যে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা জীববিজ্ঞানের অন্যতম আধুনিক এক প্রযুক্তি - বায়োইনফরমেটিক্স। এখানে জীবের ডিএনএ ও অন্যান্য অণুসমূহের গঠন এবং ক্রমবিন্যাসের তুলনা করে তাদের মধ্যে বিবর্তনগত সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়। শিক্ষার্থীরা নিজ হাতে কম্পিউটারে অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রজাতির জীনের মধ্যে তুলনা করে দেখে। এই বিষয়টি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক গবেষকের হয়েছে। কিন্তু ক্যাম্পের এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীরা এত কম সময় ব্যাপারটা রপ্ত করে ফেলে যে প্রশিক্ষক নিজেই অবাক হয়ে যান। সারাদিনে প্রশিক্ষণের ধকল যেমন ছিল তেমনি ছিল আপন প্রতিভা মেলে ধরার সুযোগ। প্রশিক্ষণের ফাঁকে ফাঁকে কেউ গেয়ে ওঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত, কেউ শোনায় কৌতুক আর কারও কণ্ঠে কবিতা। এভাবেই যবনিকা পড়ে দ্বিতীয় দিনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচীর। বাসে করে গণস্বাস্থ্য পিএইচএ কনভেনশন সেন্টারে ফিরে চলে সবাই। তৃতীয় দিন (১৩ মার্চ ২০১৬) প্রশিক্ষণের শেষ দিনে শুরুতেই হয় মূল্যায়ণ পরীক্ষা। গত দুই দিনের প্রশিক্ষণের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষাটি নেওয়া হয়। এই পরীক্ষার ফলের উপর নির্ভর করবে কারা এবার বাংলাদেশ দলের হয়ে জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক আসরে লড়াই করতে যাবে। পঞ্চাশ মিনিটের পরীক্ষা শেষে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজির বিজ্ঞানীরা এবং বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের একাডেমিক টিম একদিকে যখন পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে ব্যস্ত তখন অন্যদিক প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলছে বিশেষ সেমিনার - জীবপ্রযুক্তির বর্তমান ও ভবিষ্যত। এখানে জীবপ্রযুক্তির নানা দিক তুলে ধরেন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব বায়োটেকনোলজির মহাপরিচালক ড. মো: সলিমুল্লাহ এবং প্ল্যান্ট বায়োটেকনোলজি ডিভিশনের প্রধান এবং সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার আবদুন নূর মো: ইফতেখারুল আলম।
উপরে