আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৫:০৭

এসএসসির প্রশ্নপত্রে ভুলের ছড়াছড়ি

বিডিটাইমস ডেস্ক
এসএসসির প্রশ্নপত্রে ভুলের ছড়াছড়ি

চলমান মাধ্যমিক পরীক্ষায় (এসএসসি) যশোর বোর্ডে গণিতের প্রশ্নে ১১টি ভুল হয়েছে। ঢাকা বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নে ভুল হয়েছে পাঁচটি। রাজশাহী বোর্ডে বাংলা প্রথম পত্রে তিনটি এবং দ্বিতীয় পত্রে চারটি ভুল পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বোর্ডে গণিতের প্রশ্নে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম মিলিয়ে ১১টি ভুল আছে।
 
এসব ভুলের পাশাপাশি দেশের বেশ কিছু এলাকায় দুই বছর আগের প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকেরা এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছে। পরীক্ষার্থীদের ভয়, ভুলের কারণে তারা নম্বর কম পেতে পারে, ফেলও করতে পারে। এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে ১ ফেব্রুয়ারি, শেষ হবে ৮ মার্চ।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা বলেছেন, প্রশ্নের ভুলের কারণে কোনো পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
 
এবার আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষার জন্য মোট ৩২ সেট প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে এসব প্রশ্ন থেকে লটারি করে প্রতি বোর্ডের জন্য চার সেট প্রশ্ন নেওয়া হয়। তাই কার তৈরি করা প্রশ্নে কোন বোর্ড পরীক্ষা নিচ্ছে, তা চট করে জানতে পারেনি বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তবে এটি জানার উপায়ও আছে।
শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, প্রতিটি প্রশ্ন তৈরি ও পরিমার্জনে জড়িত থাকেন চারজন অভিজ্ঞ শিক্ষক, যাঁরা এ কাজের জন্য সম্মানী পান। যদিও এসব শিক্ষক নির্বাচন করা নিয়ে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আছে।
 
২৫ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বোর্ডে গণিতের প্রধান পরীক্ষকদের নিয়ে সভা করে বোর্ড কর্তৃপক্ষ। একাধিক পরীক্ষক জানান, ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বহুনির্বাচনী প্রশ্নগুলোর মধ্যে যেগুলোতে ভুল আছে সেগুলোর নম্বর সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। সৃজনশীল অংশের ভুল প্রশ্নের জবাব কেউ দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হবে।
 
তবে ভুল প্রশ্নের জন্য সবাইকে গড়ে নম্বর দেওয়া সম্ভব হলেও পুরোনো প্রশ্নে যেসব পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে দেওয়া হবে, তার সুরাহা হয়নি। এ পর্যন্ত অন্তত আটটি পরীক্ষাকেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষে ২০১৪ সালের পুরোনো প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের।
 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শ্রীকান্ত কুমার চন্দ বলেন, প্রশ্নের যেকোনো ভুলের জন্য পরীক্ষার্থীর ক্ষতি হবে না। পরীক্ষা শেষে সব বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকেরা বসে ভুলত্রুটিগুলো পর্যালোচনা করে পরীক্ষার্থীদের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেবেন। এর পাশাপাশি যেসব শিক্ষকের তৈরি করা প্রশ্নে ভুল পাওয়া গেছে, তাঁদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 
যশোরে গণিত প্রশ্নে ১১টি ভুল: যশোর বোর্ডে সাধারণ গণিতের বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্রের ৪০টি প্রশ্নের মধ্যে ১১টিতে ভুল ধরা পড়েছে। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাধব চন্দ্র রুদ্র বলেন, পরীক্ষার্থীরা ভুল করেনি। তাই খাতা মূল্যায়নের সময় তারা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আন্তবোর্ডের সভায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
 
গণিতের ‘ক’ সেটে ২ নম্বর প্রশ্নে বলা হয়েছে, ‘রুট ৫-এর চার দশমিক স্থান পর্যন্ত আসন্ন মান কোনটি?’ সঠিক উত্তর হবে ২.২৩৬১। কিন্তু প্রশ্নের নিচে দেওয়া চারটি বিকল্পের মধ্যে এই উত্তরটি নেই। ৩ ও ২৮ নম্বর প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দেওয়া নেই।
১২ ও ১৩ নম্বর প্রশ্নে ত্রিভুজের লম্বের মান দেওয়া হলেও ভূমির মান দেওয়া নেই। কিন্তু যে প্রশ্ন করা হয়েছে তার উত্তর করতে হলে ভূমির মান থাকতে হবে।
২৪ ও ২৫ নম্বর প্রশ্নের জন্যও একটি চিত্র দেওয়া আছে। এই দুই প্রশ্নের সঠিক উত্তরের জন্য চিত্রটির ত্রিভুজের অতিভুজের ওপরে অর্ধবৃত্ত থাকতে হবে। কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। ৩০ নম্বর প্রশ্নে ক্ষেত্র কত জানতে চাওয়া হলেও উত্তরে ‘একক’ শব্দ উল্লেখ নেই। ৩৮ ও ৩৯ নম্বর প্রশ্নের জন্য দেওয়া চিত্রে ভুল রয়েছে। ৪০ নম্বর প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে রোমান সংখ্যার সব কটি, যা উত্তরে দেওয়া নেই।
 
যশোর জিলা স্কুলের গণিত বিষয়ের শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, গণিতের প্রশ্নপত্রে ১১টি প্রশ্নে ভুল থাকা দুঃখজনক।
 
এদিকে বোর্ডের ভুলের খেসারত যাতে পরীক্ষার্থীদের দিতে না হয়, সে জন্য সচেতন ছাত্র ও অভিভাবক সমাজ নামে একটি সংগঠন গত বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করেছে। এতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি ও শিক্ষক তাপস কুমার বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক মাস্উদ জামান প্রমুখ।
রাজশাহীতে বাংলায় সাতটি ভুল: রাজশাহী বোর্ডে বাংলা প্রথম পত্রের বহুনির্বাচনী অভীক্ষায় ‘ক’ সেটের প্রশ্নের দুই নম্বরে কবিতার লাইনটি ভুল। প্রশ্নে বলা আছে, ‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় প্রভু, আমার ক্ষুধার অন্ন তা বলে বন্ধ করনি তবু।’ প্রকৃতপক্ষে ‘প্রভু’ শব্দের বদলে হবে ‘কভু’ এবং তবু শব্দের বদলে হবে ‘প্রভু’।
 
একই প্রশ্নের ১৩ নম্বরে কবিতার লাইনে বলা হয়েছে, ‘করোনা সুখের আশ, পড়ো না দুখের ফাঁস।’ প্রশ্নে ‘পড়ো না’ বলা হলেও এটি হবে পরিধান করা অর্থে ‘পরো না’।
 
১৮ নম্বর প্রশ্নের কবিতার লাইনটি হচ্ছে, ‘জীবে দয়া করে যেই জন/ সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।’ জানতে চাওয়া হয়েছে উদ্দীপকের সত্যতা মেলে কোন চরণে? যে চারটি জবাব দেওয়া আছে তার কোনোটিই সঠিক নয়।
 
বাংলা দ্বিতীয় পত্রের বহুনির্বাচনী প্রশ্নের ‘ঘ’ সেটে তিন নম্বর প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়েছে, নিচের কোনটি মধ্যপদলোপী সমাসের উদাহরণ? প্রকৃতপক্ষে এটা হবে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় অথবা বহুব্রীহি। প্রশ্ন সঠিক না হওয়ায় এর জবাবও সঠিক হবে না।
 
ছয় নম্বর প্রশ্নে পূজক শব্দের সঠিক প্রকৃতি প্রত্যয় নির্ণয় করতে বলা হলেও যে চারটি জবাব দেওয়া আছে, তার কোনোটিই ঠিক নয়। ১০ নম্বর প্রশ্নে ‘মরি মরি! কী সুন্দর প্রভাতের রূপ।’ বাক্যটিতে অন্বয়ী অব্যয় দ্বারা কী প্রকাশ পেয়েছে। এখানে প্রশ্নটি ভুল, হবে অনন্বয়ী অব্যয়। ৩১ নম্বর প্রশ্নেও ভুল আছে।
 
রাজশাহী গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের বাংলা বিষয়ের শিক্ষক আজমিরা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভুলের ধরন দেখে অবাক হয়েছি। এমন ভুল আর যাতে না হয়, সে জন্য শিক্ষা প্রশাসনকে কঠোর হওয়া উচিত।’
 
চট্টগ্রামে গণিতের প্রশ্নে ভুল: চট্টগ্রাম বোর্ডে গণিত পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম মিলিয়ে ভুলের সংখ্যা ১১টি। বাংলা মাধ্যমের প্রশ্নপত্রের সৃজনশীল অংশের চার নম্বর প্রশ্নে সমান চিহ্ন না থাকায় এর উত্তর মেলাতে পারেনি পরীক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বাংলা মাধ্যমের বহুনির্বাচনী প্রশ্নে চারটি ভুল আছে। আর ইংরেজি মাধ্যমের প্রশ্নে বহুনির্বাচনী অংশে ভুল আছে ছয়টি।
 
জানতে চাইলে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান প্রথম আলোকে বলেন, এই ১১টি ভুলের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এ জন্য শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তাদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
 
পুরোনো প্রশ্নে নতুনদের পরীক্ষা: দেশের বিভিন্ন স্থানে পুরোনো প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দায়ী করা হচ্ছে। বেশ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা এখন দুশ্চিন্তা নিয়ে বাকি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
 
ঢাকার ধামরাইয়ে আবদুস সোবাহান মডেল হাইস্কুল পরীক্ষাকেন্দ্রে ব্যবসায় উদ্যোগ বিষয়ে ৭১ জন নতুন পরীক্ষার্থীকে ২০১৪ সালের পুরোনো নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পরীক্ষাকেন্দ্রের সহকারী কেন্দ্রসচিব, হল সুপারসহ ১১ জনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
 
গাজীপুরের শ্রীপুর মাওনা বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় পরীক্ষাকেন্দ্রে পুরোনো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ২০ পরীক্ষার্থী। তাদের জন্য ‘বিশেষ বিবেচনা’ করতে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছে সুপারিশ পাঠিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। জেলার কাপাসিয়া পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ৪৪ জন পরীক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু তাদের ২০১৪ সালের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন বিলি করা হয়। চাপের মুখে কেন্দ্রসচিব পরীক্ষা শুরুর ৩৫ মিনিট পর ওই উত্তরপত্র প্রত্যাহার করে নেন।
 
যশোরের মনিরামপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি কক্ষে কিছু পরীক্ষার্থীকে ২০১৪ সালের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করার অভিযোগে কেন্দ্রসচিব ও দুই কক্ষ পরিদর্শককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফলে কালাইয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভুল প্রশ্নপত্রে অনিয়মিত তিন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। কক্ষ পরিদর্শকের অবহেলায় নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে বাণিজ্য বিভাগের চার ছাত্র পুরোনো প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে।
 
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর রামদিয়া কেন্দ্রে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ৭৯ জন এসএসসি পরীক্ষার্থী দুই বছর আগের সিলেবাস অনুযায়ী করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে।

ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, যেসব কেন্দ্রের নির্দিষ্ট কিছু কক্ষে এমন ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো বোর্ডকে জানাতে বলা হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের আন্তবোর্ড সভায় আলোচনা করে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে। সূত্র: প্রথম আলো

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

উপরে