আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৪:১৯

শিক্ষক স্বল্পতায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দুই শতাধিক সরকারি স্কুল

অনলাইন ডেস্ক
শিক্ষক স্বল্পতায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দুই শতাধিক সরকারি স্কুল
দেশের মোট ৩৩৩টি সরকারি হাইস্কুলের দশ হাজার ৬টি সহকারী শিক্ষকের পদের মধ্যে এক হাজার ৬৯১টি পদই শূন্য দীর্ঘদিন ধরে।  উপজেলা পর্যায়ের ১৪১টি হাইস্কুল চলছে মাত্র ৩/৪ জন শিক্ষক দিয়ে। ৮২টি ডাবল শিফটের স্কুলে প্রভাতী শাখায় অফিস সহকারী ও এমএলএসএস নেই। প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে ৮৩টি হাইস্কুল। কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে প্রায় দুই হাজার।অনেক বিদ্যালয়েই ইংরেজি, গণিত, হিসাব বিজ্ঞানসহ জটিল বিষয়ের কোন শিক্ষক নেই। কোনক্রমে জোড়াতালি দিয়ে দুই শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষক-কর্মচারী স্বল্পতায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে দেশের  শতাধিক সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। 
 
এছাড়াও বিদ্যালয় পরিদর্শক, সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মোট ৯৪৯টি পদের মধ্যে মাত্র ৪১৭ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকি ৫৩২টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে সরকারি হাইস্কুলে একাডেমিক তদারকি ও নজরদারি প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে।
 
বাগেরহাট মোড়েলগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে  ছাত্রী আছে ৪৮০ জন। কিন্তু ১৮টি শিক্ষকের পদের মধ্যে শিক্ষক আছেন মাত্র ১১ জন। ইংরেজি, শারীরিক শিক্ষা, চারুকারু বিষয়ে কোন শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষক ও অফিস সহকারী (দুটি পদ) নেই। চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর ৫টি পদের মধ্যে মাত্র একজন কর্মরত আছে। জনবল স্বল্পতার কারণে শ্রেণী কার্যক্রম দারুণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রশাসনিক কার্যক্রমও কোনক্রমে চলছে।'
 
এ বিষয়ে মাউশির পরিচালক প্রফেসর এলিয়াছ হোসেন বলেন, 'নতুন নিয়োগ বিধিমালা না থাকায় পিএসসি শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে না। আবার শিক্ষা, অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদিত হলেও নতুন নিয়োগ বিধিমালা সচিব সভায় উত্থাপন হচ্ছে না। কিন্তু শিক্ষকদের এলপিআরে (অবসরকালীন ছুটি) যাওয়াও ঠেকাতে পারছি না। এজন্য শিক্ষক স্বল্পতা খারাপ পর্যায়ে যাচ্ছে।'
 
শিক্ষক নিয়োগে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) জানায়, সর্বশেষ ২০১০ সালে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২০১২ সালে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মোট এক হাজার ৯০৩ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। পরে ২০১২ সালের ১৫ মে সরকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের 'সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড' মর্যাদা প্রদান করে। আগে সহকারী শিক্ষকরা 'থার্ড ক্লাস গেজেটেড' মর্যাদা পেতেন।
 
শিক্ষকদের 'সেকেন্ড ক্লাস গেজেটেড' মর্যাদা প্রদানের পর তাদের নিয়োগ এখতিয়ার সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) অধীনে চলে যায়। এতে নতুন নিয়োগ বিধিমালা প্রণয়নের প্রয়োজন হয়। পিএসসিতে নিয়োগের জন্য আবেদন করলে সংস্থাটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানায়, নতুন বিধিমালা না হলে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যাবে না। সেই অনুযায়ী ২০১৩ সালের প্রথমদিকে খসড়া নিয়োগ বিধিমালা তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায় মাউশি কর্তৃপক্ষ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও তা অনুমোদন করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠালে অনেক বিলম্বে তা অনুমোদন হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেখানেও আটকে যায়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাগাদা দেয়ার পর এক পর্যায়ে তা অনুমোদন করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু সচিব কমিটির সভায় সেটা আর উত্থাপন হচ্ছে না বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
 
নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় উপজেলা পর্যায়ের স্কুলগুলোর একাডেমিক কার্যক্রমে চরম বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। দিনদিন এ সংকট চরম আকার ধারণ করছে। তবে ঢাকাসহ অন্যান্য মহানগর, বিভাগীয় শহর ও জেলা সদরের স্কুলে শিক্ষক স্বল্পতা কিছুটা কম।
 
কর্মচারী নিয়োগও বন্ধ
সর্বশেষ ২০১০ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এক হাজার ৯৬৫ জন তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণীর সরকারি কর্মচারী নিয়োগের উদ্যোগ নেয় মাউশি। ২০১২ সালের ৯ মার্চ কয়েকটি সংবাদপত্রে নিয়োগের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়।
 
পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী উচ্চমান সহকারী পদে ২০১৩ সালের ১৪ জুন ৩৯টি কেন্দ্রে লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন করে মাউশি। অন্যান্য পদেও একই বছরের ২১ জুন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২৮ জুন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠায় শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে তা স্থগিত রাখা হয়। এক পর্যায়ে পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হয়। এতদিনে সারাদেশের হাইস্কুল ও কলেজের প্রায় চার হাজার কর্মচারীর পদ শূন্য হয়ে গেছে, যাতে স্বল্পতার মধ্যেই শিক্ষকদের পিয়ন-কর্মচারীর কাজও করতে হচ্ছে বলে মাউশির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
 
আপাতত সমাধানের উপায়
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানায়, বিসিএসের সর্বশেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, কিন্তু পদ স্বল্পতার কারণে নিয়োগ দেয়া যায়নি- এমন প্রার্থীদের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে সরকারি হাই স্কুলের শিক্ষক স্বল্পতা কিছুটা হলেও নিরসন হবে।
 
এ বিষয়ে মাউশি'র উপপরিচালক একেএম মোস্তফা কামাল বলেন, 'উপজেলা পর্যায়ের স্কুলের অবস্থা বেশি খারাপ। শিক্ষক না থাকায় প্রধান শিক্ষকরা আমাদের কাছে বিষয়ভিত্তিক নূন্যতম একজন করে হলেও সহকারি শিক্ষক পদায়নের জন্য নিয়মিত তদবির করছেন। কেউ কেউ মন্ত্রণালয়ে ভিড় করছেন। শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও আমাদের ওপর চাপ আসছে। এজন্য আমরা চাচ্ছি- আপাতত বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পদ স্বল্পতার কারণে যারা নিয়োগ পায়নি তাদের সহকারি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলে স্কুলের শিক্ষক স্বল্পতা কিছুটা হলেও লাঘব হতো।'
 
জোড়াতালির শিক্ষা প্রশাসন:
৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে মাউশি সারাদেশে শিক্ষা কার্যক্রম দেখভাল করে। এসব কার্যালেয়র প্রধান হলেন উপপরিচালক। এসব পদের একটিও বর্তমানে খালি নেই। কিন্তু ৯টি কার্যালয়ের বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের মধ্যে চারটি ও সহকারি বিদ্যালয় পরিদর্শকের ১৬টি পদের মধ্যে ১২টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের ৩২৩টি পদের (জাতীয়করণ ছাড়া) মধ্যে ৮৩টি পদ খালি ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের ৪৫৭টি পদের মধ্যে ৩৬৩টিই শূন্য রয়েছে।
 
এছাড়া জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৬৪টি পদের মধ্যে ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। আর সহকারী জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার ৬৪টি পদের মধ্যে ৫৮টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।

 

উপরে