আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২০:৩৮

উচ্চ শিক্ষা যখন জার্মানিতে

উচ্চ শিক্ষা যখন জার্মানিতে

দেশের বাইরে যারা একা পড়তে আসবে তাদের সব্যসাচী হতে হবে এটা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নেয়া উচিৎ। দেশের বাইরে উচ্চ শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি  প্রস্তুতি আছে। প্রস্তুতির কোথাও  ত্রুটি হলে সব কিছু কেঁচে গণ্ডূষ। তখন উচ্চশিক্ষা আশীর্বাদ না হয়ে বিপদ ও হতে পারে। তাই আগে থেকেই জেনে শুনে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হওয়া ভাল।

জার্মানি তে খুব ভাল বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে টিউশন ফি নেই বলে এখানে অনেক দেশ থেকে প্রচুর শিক্ষার্থী পড়তে আসে। সেটা যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ইউরোপ এর অন্যান্য দেশ, মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়া তো আছেই। তবে জার্মানিতে শুধু কেবল উচ্চশিক্ষা মুল লক্ষ্য হলে শুধু ইংরেজি  দিয়ে চালিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু প্রফেশনাল চাকরি অসম্ভব। জার্মানি কে বলা হয় ল্যান্ড অফ টেকনোলজি। এখানে যাদের কম্পিউটার সায়েন্স,  প্রোগ্রামিং,  ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে প্যাশন আছে তাদের সম্ভাবনা খুব ভাল। সেক্ষেত্রেও ভাষার দক্ষতা বি২ বা সি১ লাগে।

আমাদের পাশের দেশ ভারতে ছেলেমেয়েদের স্কুল থেকে বিদেশি ভাষা শেখানো হয়। তাদের একটা কম্পিউটার সায়েন্স  এর ব্যাচেলার এর ছাত্র অনেক আগে থেকে জার্মানি আসার পরিকল্পনা মাথায় রেখে প্রতি সেমিস্টার এ জার্মান ভাষার কিছু ক্রেডিট করে। ব্যাচেলার পড়া চলাকালেই অনলাইনে জার্মানির চাকরির বাজার বা  ইন্টার্নশিপ এর খোজ নিজেকে সেই মাপকাঠি বা যোগ্যতা অনুযায়ী প্রস্তুত করে তাই সরাসরি ব্যাচেলার করে ইন্টার্নশিপ শেষ করে চাকরির সুযোগ ও পেয়ে যায় মাস্টার্স না করেই । জার্মান অনেক  ছেলেমেয়ে আউসবিল্ডুং করে চাকরি করে  আমরা যাকে আমাদের দেশে বলি ডিপ্লোমা। এদের অনেক লোক আইসবিন্ডুং করে যাদের উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার মত এত মেধা নেই। দেশে যেমন গবেষক লাগে তেমনি শ্রমিক ও লাগে। শতভাগ গবেষক বা শ্রমিক দিয়ে দেশ চালানো যায়না। তাই বিদেশে ডিপ্লোমা পড়ার ও সুযোগ আছে । এখানে এক বছর  ফ্রিতে কোন বাসায় বেবিসিটার বা বাচ্চা দেখাশোনা করে মেয়েদের নার্সিং এ ডিপ্লোমা পড়ার সুযোগ আছে। নেপালে অনেক মেয়ে ভাষা শিখে এসে এখানে নার্সিং এ ডিপ্লোমা পড়ছে ।  

অন্য দিকে মাস্টার্স এ যারা আসে ব্যাচেলর থেকে আগেই বি২ হয়ে গেলে এখানে এসে পার্ট টাইম  চাকরি পেতেও সুবিধা।

 

কিছু সাবজেক্ট এ উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পেলেও চাকরির সম্ভাবনা জার্মানিতে একেবারেই নেই ভাষা না জানলে। যেমন সাংবাদিকতার কথা যদি বলি খুব ভাল সুযোগ পড়াশোনার কিন্তু সংবাদ মাধ্যম হল ভাষার খেলা সেখানে ইংরেজি দিয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা গেলেও চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্র খুব সীমিত।  একই রকম আর্কিটেক্ট বা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এর বেলায়। ইংলিশ এবং জিআরই দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির সুযোগ  পাওয়া গেলেও জার্মানিতে জার্মান লাগবে। আর যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য অনেক টিউশন ফি সেক্ষেত্রে স্কলারশিপ আগেই ব্যবস্থা  করতে হয় কেননা স্কলারশিপ খুব সীমিত তাও রেজাল্ট জিআরই বা আইইএল্টিএস স্কোর  মোটিভেশন প্রমানে পাব্লিকেশান লাগে স্কলারশিপ পেতে । তাই উচ্চশিক্ষা  বিনাবেতনে জার্মানিতে হলে ভাষা জানা থাকলে অনেক দার উন্মোচন হয়ে যায়।

মানবিক এবং  বাণিজ্য বিভাগের ছেলেমেয়েদের জন্য বলবো খুব ভাল করে জানার সুযোগ আছে। পরিবেশ নিয়ে জানতে হলে ইউরোপের গবেষণা রিসার্চ এখনো বিশ্বসেরা।  এখানে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারদেরও  সারাদিন মেশিন নিয়ে বসে বসে শিখতে হয়। বিজনেস এর ছেলেমেয়েদের ব্যচেলর পড়ার সময় বাধ্যতামূলক ইন্টানিশিপ করতে হয় যাতে বাস্তবজীবনে প্রয়োগ এর দক্ষতা ও যোগ্যতা গড়ে ওঠে।  কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয়ে গাছ নিয়ে মাঠে ল্যাবে এক্সপেরিমেন্ট চালাতে হয় হাতে কলমে শিক্ষার জন্য। ।ইউরোপের ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়াশোনা অনেক শেখার সুযোগ আছে সেটা পরবর্তি জীবনে কাজে লাগানো যায়। তবে এখানে ভাষা ছাড়া চাকরির সম্ভাবনা খুব কম। আবার যারা ব্যাচেলর করতে আসে ভাষা শিখে পরে এদের চাকরি বা ক্যারিয়ার  খুব ভাল করার সুযোগ আছে কিন্তু শুরুতা তাদের ও খুব সহজ না ।  তাই উচ্চশিক্ষায় আগ্রহীদের ভাষা শেখা ও প্রস্তুতি শুরু করা উচিত স্কুল থেকে।

কারণ চাকরি বা পড়াশনায়  এখানে প্রতি্যগিতা সব দেশের ছেলেমেয়েদের  সাথে যাদের আগে থেকে অনেক ভাল ব্যাকগ্রাউন্ড বা বেসিক যেমন চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এমনকি ইউরোপ এর অন্য দেশ  থেকেও ছেলেমেয়েরা জার্মানিতে আসে । আবার জার্মানি থেকে অন্যদেশে যারা  যায় তাদের ও অন্য ভাষার পরীক্ষা দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র হলে জিআরই বা ইউরোপের ফ্রান্স বা ব্রিটেন হলে ফ্রেঞ্চ এবং ইংলিশ লাগে কেননা এখন গ্লোবালাইজেশন এর যুগ। আন্তর্জাতিক ব্যবসা বানিজ্য উচ্চশিক্ষা গবেষণা সব কিছুতে ভাষার আদান প্রদান খুব জরুরী কেননা একা একটা দেশ তার নিজের ভাষা নিয়ে আগাতে পারেনা।  ভাষা শেখা শুধু আমাদের দেশের জন্য না সারা বিশ্বের মানুষের জন্য চালেঞ্জ। ব্রিটেনে স্কুলে শিশুদের ফ্রেঞ্চ, জার্মান ভাষা শেখানো হয়।  ভারতে বেশীর ভাগ মানুষ কমপক্ষে দুতিনটি ভাষা জানে কারণ দেশে ১০০ টির মত ভাষা সবাই হিন্দি আর ইংরেজিতে এক প্রদেশের মানুষ অন্যপ্রদেশের মানুষের সাথে কথা বলে।

এবারে প্রবাস জীবনজেপ্রবাসে পড়াশোনা ও জীবন  দেশের মত রান্না, কাটাকাটি বা বাসন ধুয়ে ঘর দোর পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য কোন কাজের বুয়া নেই সব নিজেকেই করতে হয়,  তা সে  কোন সোনার চামচ মূখে নিয়ে জন্মানো রাজকন্যা হোক বা কোন মিলিয়নিয়ার এর মেয়ে হোক ।ইউনিভার্সিটিতে পড়তে হলে সে ডরমে থাকুক  বা বাড়িতেই থাকুক রান্না, বাজার, ঘরদোর, বাথরুম, বেসিন, রান্নাঘর, ময়লার  বালতি পরিষ্কার সবকিছু নিজেরই করতে হয়।

আর রাস্তার মোড়ে মোড়ে আমাদের দেশের মত রেস্টুরেন্ট পাওয়া যায় না যেখানে ক্লাসের ফাকে একটু খেয়ে নেওয়া যায় । রাতে ঘুমোতে যাবার আগে ভেবে নিতে হয় সকালে কি খেয়ে ক্লাসে যাবে আর সে খাওয়ারটা ঘরে আছে কিনা। ঘুম ভেঙ্গে ওভেনে বা টোস্টারে ব্রেড ঢুকিয়ে দিয়ে সাথে সাথে নিজের তৈরি হয়ে নিতে হয়। প্রবাসে সব কিছু ঠিক সময় মত করতে পারা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখানে বাস, ট্রেন সব ঘড়ি ধরে চলে, এক মিনিট এদিক ওদিক হবার উপায় নেই।

আবার সারাদিনের জন্য বাইরে গেলে বা  ক্লাসে থাকলে  খাওয়ার, কফির মগ, পানির বোতল সব ব্যাগে ভরে নিতে হয়। কেননা চাইলেই রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে চা খেয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের এত বড় ক্যামপাসে একটি মাত্র ক্যাণ্টিন রয়েছে।সেখানে দুপুরে খাবার  এবং চা কফির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সে খাবার পয়সা দিয়ে শুধু কেনা হয় আমি খুব ক্ষিধে নিয়েও পু্রোটা খেতে পারিনি কোনদিন এই এক বছরে।

 আর ক্যাম্পাসে ওয়ান টাইম কাপ বা মগ আতিরিক্ত বর্জ্য তৈরি করে বলে একে খুব নিরুৎসাহিত করা হয়।তাই সবাই ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার আগে একটা ব্যাগপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে তাতে পানির বোতল, কফির মগ, জুস, চকলেট এবং সাথে দুপুরের খাওয়ার ভরে নিয়ে বেরিয়ে পরে। ক্লাস লাইব্রেরী পড়াশোনা, পার্ট-টাইম কাজ সব করে ঘরে এসে আবার চলে পরদিনের প্রস্তুতি। এখানে টানা ৪ ঘণ্টা করে ক্লাস দিনে ৮ ঘণ্টা বা তার বেশীও ক্লাস করতে হতে পারে যদি পাশাপাশি ভাষা শেখা বা অন্য কোন ক্লাস থাকে। শহর- বাজার, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যম্পাসে কোথাও রিকশা নেই, ছেলে মেয়ে, ছোট বড় সবাই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পরে আর বাস স্টপ বা ট্রেন ষ্টেশনের পাশে সাইকেল রাখার ভাল ব্যবস্থা থাকে সব জায়গাতে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ঘরগুলোতে ইচ্ছে মত ফার্নিচার, কার্পেট, সোফা, বা নানা রকম পেন্টিং দিয়ে সাজানোর সুযোগ আছে। কিন্তু ঘরে থাকবার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে আবার ঘর ধুয়ে মুছে রং করে দিয়ে যেতে হয়।আমার জার্মানিতে গত অক্টোবরে এক বছর হল ।ডরমিটরিতে আমার ঘরের মেয়াদ শেষ হল তখন আমাকেও ঘরে রং করে দিতে হয়েছে। বিদেশে বাসা খুঁজে পাওয়া সে আর এক বিপদ। আমি খুব চিন্তায় ছিলাম কিভাবে সব করব একা  ঘরের ফার্নিচার সাত তলা আট তলায় টেনে তোলা তো আর চাট্টীখানি কথা নয়। এখানে বন্ধুরা খূব সাহায্য করে।আমার ঘরের রং করা থেকে শুরু করে সব কিছুতেই আমাকে ওরা বার বার জিজ্ঞেস করেছে কী সাহায্য লাগবে। একজন বন্ধু তো একা একা নিচ তলা থেকে ৬ তলা পর্যন্ত একটা ছোট ফ্রিজ টেনে তুলে নিয়ে পৌছে দিয়ে গেল।জার্মান মেয়েরা আমাকে বাসায় আপ্লিকেশন লিখতে ও বাসা খুঁজে পেতে অনেক সাহায্য করেছে।

ছেলেমেয়েগুলোকে দেখতে খুব শুকনো কাঠি কাঠি, রোগা-পাতলা দেখা গেলেও এদের কর্মক্ষমতা যে অনেক বেশী সেটা পার্টটাইম কাজ করতে গেলেই টের পাওয়া যায়। প্রথম দিকে খুব কষ্ট হত এখন আস্তে আস্তে শিখে নিয়েছি অনেকটা এই এক বছরে।আর এখানে সব চেয়ে বেশী স্বাধীনতা রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সেটা দিনে কি মাঝ রাতে।প্রকৃতির রং-রুপ ও খুব ভাল করে উপলব্ধি করা যায় অদ্ভুত এক ভাষা রয়েছে এর।যেটা শহরের কোলাহলে পাওয়া যায় না।

 

এত দায়িত্ব আর ব্যস্ততা হয়ত শুনতে খুব কঠিন মনে হচ্ছে কিন্তু  এগুলো আমাকে নিজের দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছে।জার্মানিতে পড়তে এসে আমার মনে হয়েছে এখানে মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই ।  ধনী –গরীব সবাই সমান, সাদার উপরে কালো বা কালোর উপরে সাদার কোন বৈষম্য নেই।

উচ্চশিক্ষা পরিকল্পনা  যে দেশেই হোক দেশে ফিরে আসা আর সেখানে চাকরি খোজা দু রকম প্রস্তুতি লাগে। সুতরাং উচ্চ শিক্ষা শেষ করে চাকরির প্রত্যাশা থাকলে প্রস্তুতি হতে হবে স্কুল থেকে। সেটা ইউরোপ বা আমেরিকা যেটাই হোক। আইএল্টিএস এ হুট করে ৭ পাওয়া যায়না বা জিআরই এর কাঙ্ক্ষিত স্কোর পেতে লম্বা সময় প্রস্ততি দরকার। তাহলে জেনে বুঝে হোক প্রবাসে সফল উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার।

রাশা বিনতে মহিউদ্দীন 

স্টুডেন্ট অফ মাস্টারস ইন

ইনভাইরনমেন্ট প্রটেকশন এন্ড এগ্রিকালচারাল ফুড প্রডাকশন,

ইউনি ভার্সিটি অফ হোয়েনহেইম স্টুটগার্ট জার্মানি।

ইমেইলঃ  rashabinte.mohiuddin@uni-hohenheim.de

 

 

উপরে