আপডেট : ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৯:০৬

রূপালী জগতের ‘বিষফল’ শাকিব-অপু

অজয় দাশগুপ্ত
রূপালী জগতের ‘বিষফল’ শাকিব-অপু

সামাজিক মিডিয়ার যুগে গোপন কথাটি রবেনা গোপনে। যখন যেখানে যা ঘটে চাউড় হতে সময় লাগেনা। আমাদের দেশের চলচ্চিত্র শিল্প যে ভালো নাই সেটা আমরা সবাই কমবেশী বুঝি। একটা সময় ছিলো আমরা সিনেমাহলের সামনে ঘুরে বেড়ালেও মনে করতাম জীবন সার্থক। সেই দিন আজ বিগত। দেশে সিনেমাহল গুলো আলু পটলের আড়ত হয়ে গেছে। নামকরা হলগুলো কালের বির্বতনে আজ অন্য চেহারা ধারণ করেছে।

ঢালাওভাবে শুধু ভালো সিনেমার অভাব বা খুলে যাওয়া ডিজিটাল জগতকে দায়ী করে পার পাওয়া যাবেনা। পাশের বাংলায় আবার নতুন জোয়ার এসেছে বাংলা সিনেমায়। সৌমিত্র বা ধৃতিমান কিংবা অর্পণা সেনের মত অভিনেতা অভিনেত্রীরা ফিরে এসেছেন রুপালী পর্দায়। তাঁদের অভিনয় আর শিল্পগুণে সিনেমা এখন ফিরে পাচ্ছে হারাণো জায়গা।

আমাদের দেশে চলচ্চিত্রের স্বর্নযুগ ছিলো রাজ্জাকময়। কবরী শাবানা ববিতার পাশাপাশি আনোয়ার হোসেন রোজী হাসান ইমাম গোলাম মুস্তাফাদের কথা ভোলা যাবেনা কোনদিন। অভিনয়ের একটা শুদ্ধধারা তৈরী করেছিলেন তাঁরা। কালক্রমে নাটক ও ছোটপর্দার মানুষেরা সে ধারাটিকে এগিয়ে নিয়ে গেলেও নায়ক আর জন্মায়নি।

এইযে নায়কের অভাব বা নায়কোচিত নায়কের সংকট এটা কি খালি সিনেমায়? সিনেমাতো সমাজের দর্পণ। আপনি ইরানী সিনেমা দেখুন দেখবেন বসরার গোলাপ বা ধর্মীয় পোশাকের সুবাস পাচ্ছেন। হলিউড দেখুন  আপনার মন চলে যাবে বাদামী চোখের স্বল্পবসনা নায়িকার কাছে। আপনার হিরো খোঁচা দাড়িতে মাথায় টেক্সাস টুপি লাগিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে আরেক দুনিয়ায়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের দেশের ধারা কোনটি? একসময় আমরা গ্রাম বাংলার নামে কথ্য ভাষায় কথা বলা আর লোকজ গান গাওয়া নায়ক নায়িকাকে প্যাটার্ণ ধরে নিলেও এখন আর তা নাই। এখন দূর গ্রাম বা একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় ও আছে ডিশের লাইন। আছড়ে পড়ছে ভারতের অপসিনেমা বস্তাপঁচা নাটক আর সিরিয়াল। এই সিডনিতে কথা কাজে ঘোর ভারতবিরোধী এক বন্ধু এখন মজে আছে জি বাংলায়। তিনি আবার লাইভ ছাড়া দেখেননা। বোঝেন তবে রাতকে দিন দিনকে রাত বানিয়ে সময়ের ব্যবধান ঘুচিয়ে মজে আছেন জি বাংলার নাটকে। এমন বাস্তবতা দেশে দেশের বাইরে বলেই আমাদের হিরো হিরোইনেরা জেনে গেছেন স্ক্যান্ডাল ব্যতীত লাইমলাইটে আসার পথ খোলা নাই।

সমাজের যেসব রোগ সেগুলো তাদের ও আক্রমন করেছে বৈকি। সম্প্রতি সাকিব খান আর অপু বিশ্বাসকে নিবে যে হৈ চৈ বা তাদের যে বাদানুবাদ তাতে ভাগ হয়ে যাওয়া আমাদের মানসিকতা দেখে কেমন জানি লজ্জা লাগছে। প্রথম কথা হলো সাকিব খানকে আমি কয়েকবার হিন্দী সিনেমার নায়কদের অনুকরণে নাচ করতে দেখা ছাড়া আর কোথা ও দেখিনি। আর অপু বিশ্বাস যে নায়িকা সেটা তার বিবাহ সংক্রান্ত জটিলতা সামনে না এলে জানতাম ই না। সেলিব্রেটিদের জীবন নিয়ে দেশে দেশে কত ঘটনা ঘটে। সেগুলো মানুষকে আকর্ষন করে। তারা দলে দলে ভাগ হয়ে নিজেদের দিকে লড়াই করে। কিন্তু এদের বেলায় উল্টো। মানুষের আগ্রহ আছে কি নাই সেটা বিষয়না। বিষয় তাদের জীবন নিয়ে দেশ ও সমাজকে ভাবতে বাধ্য করা।

খবরে দেখলাম অপু নাকি ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। এখন বলছেন তাকে জোর করে তা করানো হয়েছিল । প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাওয়ার খবর ও দেখলাম। কী অসভ্য মেয়েরে বাবা। বিয়ের জন্য জাত বিসর্জন বা প্রেমের জন্য ধর্মান্তরিত হয়ে এখন বিচার চাইছে? তাকে কেউ একথাটা কেন বলছেনা, যদি শাকিবের সাথে তার মনোমালিন্য বা মনকষাকষি নাহতো সে কি এগুলো বলতো? নিজের ইচ্ছে আর নিজের মর্জিকে বিপদে পড়ে সমাজের বলে চালিয়ে দেয়া একটা রোগ। এটা যারা করে তারা নিজেদের অপমান ছাড়া আর কিছুই পায়না।

অপু বিশ্বাস বলেছে তার পিতা নাকি এনিয়ে মনকষ্টে চলে গেছেন। এদ্দিনে বোধোদয় হবার জন্য এই মেয়েটিকে পিতা মাফ করলেও মানুষ করবে? মূল কথা এইযে প্রবণতা এবং ইচ্ছেমত জীবন বদলানো সেখানেই আসলে সমাজ আটকে আছে। অন্যদিকে সাকিব কে যতটুকু বুঝলাম প্লে বয় টাইপ। ঐযে বলছিলাম দেশে অভিনয়ের আর কোন দরকার পড়েনা এখন। এটাযে একটা শিল্প এর জন্যযে মেধা ও চর্চার দরকার হয় সেটা আর মানেনা কেউ। কোনরকমে  পর্দায়  এসে পড়লেই হলো। হিট হলেতো আর কথাই নাই।

এরা যেভাবে হোক সেলিব্রেটি বলেই এত মিডিয়া কভারেজ পেয়েছে। বাস্তবে দেশে এমন অপু সাকিব ভুরিভুরি। এরসাথে ধর্ম অথর্ম বা ন্যায় নীতির কোন সম্পর্ক নাই।  বলগাহীন জীবন আর বোধহীন জীবনযাপনের সমাজে মানুষ এভাবেই চলছে। বিপদে পড়লে প্রধানমন্ত্রী বাঁচাবেন এটাই বা কেমন কথা? দেখুন অপু কিন্তু ঈশ্বরের কাছে বিচার চায়নি। কারন সে জানে স্বেচ্ছায় ঈশ্বর ছেড়ে আসা কাউকে হয়তো তিনি মাফ করবেন না। আর করলেও তা সময়ের ব্যাপার।

শাকিব অপুর এই কাহিনী দেখতে দেখতে রোজ মনে হয় কি জানছে আমাদের সন্তানেরা? কি শিখছে তারা? যে এভাবেই বড় হ ওয়া যায়? আর এভাবে চললেই আসা যায় লাইমলাইটে? বাচ্চা কোএ ছবিটা দেখে শুধু বাচ্চাটার জন্যেই মায়া জমেছে বুকে। জীবনের শুরুতেই মা বাবার এই বিচ্ছেদ এবং ভালোবাসাহীন বিয়ের পরিণতি বাচ্চাটিকে কি আসলে ভালোভাবে বড় হতে সাহায্য করবে? ওই যে বলছিলাম আমাদের দেশের রিয়েল হিরো রাজ্জাক উজ্জ্বল বুলবুল আহমেদ আনোয়ার হোসেন গোলাম মুস্তাফা কিংবা আরো যারা ছিলেন তাঁদের ও জীবন ছিল।  প্রেম ছিলো। ঘটনা ছিলো। উত্তম কুমারের আরেকটি বিয়ের খবর সুচিত্রা  সেনের সাথে মধুর সম্পর্কের খবর মধুময় হয়েই আসতো মানুষের কাছে। তাতে এমন কদর্যতা বা বিষ ছিলোনা।

শাকিব অপুর এই বিষময় সম্পর্ক চলচ্চিত্রের কি লাভ লোকসান করবে জানিনা তবে তারুণ্যের মনে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে সেটা ভেবেই বলি, এসব বিষয়ে ফোকাস করে নেগেটিভ সমাজ কে বেগবান না করলেই কি নয়? আমাদের ছায়াছবি বা রুপালী পর্দার জগতে এখন অনেক সংস্কার আর শুদ্ধতার দরকার। সেখানে এসব ঘটনা বিষতূল্য ই বটে।

লেখক: সিডনি প্রবাসী, কলামিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষক

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে