আপডেট : ১১ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৭:৫৯

এবার সদ্য বিদায়ী মন্ত্রীদের দুর্নীতির খোঁজে দুদক

অনলাইন ডেস্ক
এবার সদ্য বিদায়ী মন্ত্রীদের দুর্নীতির খোঁজে দুদক

মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বন্ধে এবার বিদায়ী মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিবদের (এপিএস) দুর্নীতি এবং অপকর্মের সন্ধানে নামবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এদের মধ্যে যেসব মন্ত্রী এসব অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাদের ব্যাপারেও খোঁজ নেবে কমিশন। এর জন্য ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগেই গঠিত একটি টেকনিক্যাল কমিটি প্রাথমিকভাবে কাজ শুরু করেছে। সার্বিক বিষয়ে তদারকি করতে কমিশনের উচ্চপর্যায়ের একটি শীর্ষ কমিটিও গঠন করতে যাচ্ছে কমিশন। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে দুদক চেয়ারম্যান দেশের বাইরে রয়েছেন। আগামী ১৭ জানুয়ারি তার দেশে ফেরার কথা। ফিরলে তার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে কমিশন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি কোনো ধরনের দুর্নীতির দায় নিতে চান না।

তবে প্রকাশ্যে কমিশনের কোনো কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কথা বলেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই কর্মকর্তা বলেন, আমাদের টেকনিক্যাল কমিটি কাজ করছে। শীর্ষপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথা শুনেছি। তবে কোনো নির্দেশনা পাইনি। সম্ভবত চেয়ারম্যান স্যার দেশে ফিরলে নির্দেশনা দেবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গত বুধবার দেশ ত্যাগের আগে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাব, আমরা অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেব। সেখানে মন্ত্রী, এপিএস বা পিএস বলে কথা নেই। কারণ এই সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পথ ধরেই দুদক এগোবে। কোথাও কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আগামী দুই মাসের মধ্যে সবকিছু দৃশ্যমান হবে। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, পিএস যেভাবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা ভালো। তবে আমি বলব এপিএসও খোঁজখবর নিয়ে ভালো সৎ ব্যক্তিদেরই দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই  নিয়োগ দিতে বলব। কারণ এসব পিএস ও এপিএসদের কারণে সরকারের দুর্নাম হয়। মন্ত্রীরাও বিপাকে পড়েন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রীরাও এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাই সবার ব্যাপারেই খোঁজ রাখা উচিত। এসব পিএস বা এপিএসরা সৎ না হলে সরকারের দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন হবে না।

বিগত সময়ের মন্ত্রীদের পিএস ও এপিএসদের ওপর যে সরকার ক্ষুব্ধ, তার প্রমাণ মিলেছে এবার পিএস নিয়োগ পদ্ধতি বদলানো থেকে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পিএসদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দৌরাত্ম্যের অভিযোগ ওঠায় এবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজ থেকেই তাদের জন্য পিএস ঠিক করে দিয়েছে। এর আগে মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের তার এলাকার ও পছন্দের কোনো কর্মকর্তাকে পিএস হিসেবে নিতেন।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও দুদকের কর্মকর্তারা জানান, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের তিন মাস আগে একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে মন্ত্রীদের পিএস ও এপিএসদের ব্যাপারে তথ্য নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে মন্ত্রীদের তথ্যও উঠে আসে। তাতে নানা দুর্নীতি ও অপকর্মের তথ্য পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসনকে পিএস নিয়োগের দায়িত্ব দেন। এমনকি ওই প্রতিবেদন মন্ত্রিসভায় রদবদলেও কাজে লাগান তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, গত ডিসেম্বরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে দুদক মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিরোধে একাধিক সুপারিশ পাঠায়। সেখানে মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বন্ধে রাজনৈতিক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) বাতিলের সুপারিশ করে। কারণ মন্ত্রীদের বিভিন্ন অপবাদের প্রধান কারণ এসব এপিএস। এপিএসদের ক্ষমতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের চেয়েও বেশি। মন্ত্রীদের ৭০ শতাংশ এপিএসই নানা দুর্নীতি এবং অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এরা মন্ত্রীদের নাম ভাঙিয়ে নানা অনিয়ম করে।

দুদকের কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সময়ে এপিএসদের বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কারণে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের সমালোচনার মুখে পড়তে দেখা গেছে। এপিএসদের ‘নিয়োগ বাণিজ্য’ ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার খবর বিভিন্ন সময়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। বিতর্ক এড়াতে এর আগে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নিজের সন্তানকে এপিএস হিসেবে নিয়োগ দিতে দেখা গেছে।

দুদকের কর্মকর্তারা অনুসন্ধানের বরাত দিয়ে জানান, বিগত সময়ে মন্ত্রীদের পিএস ও এপিএসরা অবৈধভাবে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। মন্ত্রীর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এবং কখনো কখনো মন্ত্রীর অগোচরে, নাম ভাঙিয়ে ও স্বাক্ষর জাল করে নানা ধরনের দুর্নীতি করেছেন। এর মাধ্যমে তারা সহজেই প্রভাব-প্রতিপত্তি, বিপুল অর্থবৃত্তের মালিক বনে গেছেন। বিভিন্ন জায়গায় চিরকুট পাঠিয়ে অনৈতিক ফায়দা লুটেছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনের সবাই কমবেশি অবগত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কখনোই তেমন কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এসবের সঙ্গে মন্ত্রীদের জড়িত থাকার তথ্যও দুদকের কাছে রয়েছে।

দুদক কর্মকর্তারা এমনও জানান, ক্ষমতাবহির্ভূত অতিরিক্ত আয় এবং নানান দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক মন্ত্রী ও সচিবের একান্ত সচিবরা এর আগেও দুদকের মুখোমুখি হয়েছেন। সাবেক একজন রেলমন্ত্রীর এপিএস ও গর্ণপূর্ত প্রতিমন্ত্রীর এপিএসসহ অনেকেই দুদকে হাজিরা দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে এরা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পিএস হারিছ চৌধুরী কিছুদিন সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছিলেন। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের এপিএস হায়দার সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। টাকার বস্তা নিয়ে এপিএস ওমর ফারুক ধরা পড়ায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মন্ত্রিত্ব চলে যায়। বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ও তার ঘনিষ্ঠজন শিক্ষা বিভাগের কর্মচারী নাসিরউদ্দিন গ্রেপ্তার হন। এমন অনেক তথ্য দুদকের কাছে রয়েছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে