আপডেট : ৩১ আগস্ট, ২০১৮ ১৫:৪৭

নতুন বউয়ের খরচ চালাতে শিশু অপহরণ, অতঃপর...

অনলাইন ডেস্ক
নতুন বউয়ের খরচ চালাতে শিশু অপহরণ, অতঃপর...

নতুন বউয়ের খরচ চালাতে প্রতিবেশীর শিশুকে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল রোমান নামের এক যুবক। তবে পুলিশি তৎপরতায় তার সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। স্ত্রী ও চার সহযোগীসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন রোমান।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২৮আগস্ট রাত ৮টার দিকে অপহৃত হয় তেজাগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পূর্ব নাখালপাড়ার ৩/৪১/১ বাসার ভাড়াটিয়া মো. সাইফুল ইসলাম ও সাথী আক্তার দম্পতির চার বছরের শিশু সন্তান তোয়াসিন ইসলাম সিমন। এ সময় শিশুটির মা রান্নাঘরে এবং বাবা বাসার বাইরে ছিলেন। ঘুমন্ত শিশুটিকে অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে যায়। বাবা-মা তাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তারা ওই রাতেই বিষয়টি পুলিশ ও স্বজনদের জানান। শিশুটির বাবা সাইফুল ইসলাম রাতেই তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর পুলিশ ২৮ ঘণ্টার চেষ্টায় শিশু সিমনকে উদ্ধার করে।

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বৃহস্পতিবার তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের জানান, প্রযুক্তির সহযোগিতায় অপহরণকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপহরণকারী রোমান শিশুটির পরিবারের প্রতিবেশী। সে মুক্তিপণ আদায় করতে নিজের প্রতিবেশির সন্তানকে অপহরণ করেছিল।

এদিকে, শিশুটিকে খুঁজতে তার বাবা সাইফুল ২৮ আগস্ট রাতে এবং পরদিন (২৯ আগস্ট) সকালে পূর্ব নাখালপাড়ায় মাইকিং করেন। এ সময় অপহরণকারী রোমানও তার সঙ্গে ছিল। শিশুটিকে খুঁজে পেতে রোমান ও তার স্ত্রী প্রথম থেকেই সহযোগিতা করে আসছিল। এ কারণে সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিল রোমান ও তার স্ত্রী।

পরে ২৯ আগস্ট বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে সাইফুলের মোবাইলে একটি ফোন আসে। ফোনদাতা জানান, সিমন তাদের কাছে আছে। তাকে ফেরত নিতে হলে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। তখন শিশুটির বাবা তাকে জানান, তিনি টাকা দেবেন। এরপর পুলিশ বিষয়টি জানতে পেরে ওই মোবাইল নম্বরটি ট্র্যাকিং করে। তবে সিমটি মোবাইল থেকে খুলে রাখা হয়। যে মোবাইলে সিমটি ঢুকিয়ে ফোন দেয়া হয়েছিল, সেটির আইএমই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর পেয়ে যায় পুলিশ। সিম পরিবর্তন করে ওই মোবাইলটিতে অন্য সিম ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ নম্বর ট্র্যাকিং করে সাইফুলের প্রতিবেশি রোমানকে আটক করে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিজয় সরণীর পীর মাজার মসজিদ গলির একটি বাসা থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় শহীদুল ইসলাম মিয়া ও জিসান মিয়া নামে দুজনকে আটক করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী মহাখালী ও রামপুরা থেকে সাইফুল ইসলাম ইমন ও আলী আহম্মেদকেও আটক করা হয়।

অপহরণকারী রোমানের কণ্ঠ শিশুটির পরিবারের কাছে পরিচিত। তাই মোবাইলে ম্যাজিক অ্যাপ ডাউনলোড করে অপহরণকারীরা। যাতে তাদের কণ্ঠ চেনা না যায়। এরপর শিশুটির বাবার কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বলেন, ‘অপহরণের বিষয়ে রোমান নিজেই সিমনের বাবা সাইফুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছে। এক্ষেত্রে ম্যাজিক ভয়েস নামে টুলস ব্যবহার করেছে অপহরণকারী। এতে করে কণ্ঠ বিকৃত হওয়ায় রোমানের কণ্ঠ শুনে তাকে চেনার উপায় ছিল না। তবে মুক্তিপণ চাইতে ব্যবহৃত ওই মোবাইলই কাল হয় রোমানের।’

উদ্ধারের প্রায় ১২ ঘণ্টা পর এখনও শিশু সিমন অচেতন রয়েছে। সে চোখ খুলতে পারছে না। ঘুমিয়ে আছে। তাকে তেজগাঁওয়ের শমরিতা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। অপহরণকারীরা শিশু সিমনকে অপহরণের পর ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়, এরপর থেকে শিশুটি ঘুমাচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে সিমনকে তার বাবা সাইফুল ইসলামের কাঁধে অচেতন অবস্থায় দেখা গেছে। পুলিশ তাকে শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যায়।

রোমান পুলিশকে জানিয়েছে, টাকার জন্যই সে সিমনকে অপহরণ করে। অপহরণের পর শিশুটিকে বিজয় সরণী এলাকায় রেখে এসে সাইফুল ইসলামের সঙ্গে ছিল সে। এমনকি সে শিশুটির বাবাকে সান্ত্বনাও দিয়েছে।

ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে এটা প্রতীয়মান যে, আর্থিক কারণেই ওই শিশুকে অপহরণ করা হয়েছিল।’

পুলিশ জানিয়েছে, অপহরণকারীদের সবার বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরে মধ্যে। তারা সংঘবদ্ধ হিসেবে এর আগেও কোনও অপহরণের কাজে জড়িত ছিল কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিশুটিকে যে বাসায় রাখা হয়েছিল, ওই বাসার নারীকে পাওয়া যায়নি। সে পলাতক রয়েছে। অপহরণের সঙ্গে জড়িত চক্রটির বয়স কম হলেও তারা কেউ লেখাপড়া করে না। বখাটে প্রকৃতির বলে জানিয়েছেন বিপ্লব কুমার।

তিনি বলেন, ‘আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সিমনের বাবা সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নং৪০)। ওই মামলায় সবাইকে গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমাণ্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে। আর অপহরণে সহযোগিতা করায় আরেক নারী সহযোগী পলাতক রয়েছে। তাকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

ঘটনা সূত্রে জানা যায়, বাবা-মায়ের অমতে বিয়ে করায় বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় হবিগঞ্জের তরুণ মো. রোমানকে। এরপর ঢাকায় থাকা বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতায় তেজগাঁওয়ের পূর্ব নাখাল পাড়ার একটি ভাড়া বাসায় ওঠে নবদম্পতি রোমান ও মীম আক্তার রিয়া। কিন্তু তাদের অর্থকষ্ট চলছিল।

এক পর্যায়ে তাদের ঘরে কোনও বাজার সদায় না থাকায় শিশুটির মা সাথী আক্তারের কাছ থেকে কাঁচাবাজারের জন্য ১০০ টাকা ধার নেয় রোমানের স্ত্রী মীম আক্তার রিয়া। এরপর রাতেই তার ছেলেকে অপহরণ করা হয় বলে জানান শিশুটির মা সাথী।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী সাইফুল একটি পত্রিকা অফিসে কাজ করেন। তিনি বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকেন। আমরা পূর্ব নাখালপাড়ার ওই বাসায় তিনদিন আগে ভাড়ায় এসেছি। রোমান ও মীমের কয়েকমাস আগে বিয়ে হয়েছে। তারা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে এখানে ভাড়া থাকে। ২৮ আগস্ট দুপুরে মীম আমার কাছ থেকে ১০০ টাকা ধার নেয়। এরপর রাতে তার স্বামী আমার ছেলেটাকে অপহরণ করে।’

শিশুটির বাবা সাইফুল ইসলাম জানান, তাদের বাড়ি নরসিংদী জেলার ছগরিয়া পাড়া এলাকায়। তার একমাত্র সন্তান সিমন। তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে এই প্রথম পুলিশের কাছে আসছি। গত ২৮ ঘণ্টা আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম। প্রতিবেশি এমন হতে পারে, তা কখনও ভাবিনি।’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে