আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১০:৪৬

দুই পঞ্চায়েতের দ্বন্দ্বের বলি চার শিশু

বিডিটাইমস ডেস্ক
দুই পঞ্চায়েতের দ্বন্দ্বের বলি চার শিশু

গত ১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বাড়ির পাশের খেলার মাঠ থেকে নিখোঁজ হয় সুন্দ্রাদীঘি গ্রামের চার শিশু। ১৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার সকালে বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে কামাইছড়া নদীর ইছাবিলে বালুর নিচ থেকে এ চার শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

চার শিশু খুন হওয়ার পেছনে পঞ্চায়েতের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে দায়ী করছেন গ্রামবাসী। হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার সুন্দ্রাদিঘী গ্রামে আটটি পঞ্চায়েত রয়েছে। মাসখানেক আগে একটি বড়ই গাছ কাটা নিয়ে বাঘাল পঞ্চায়েত ও তালুকদার পঞ্চায়েতের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে দুই পঞ্চায়েতের মধ্যে কয়েকবার ঝগড়াও হয়। তালুকদার পঞ্চায়েতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাজি মাস্টার আব্দুল খালেক। অপরদিকে বাঘাল পঞ্চায়েতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুল আলী বাঘাল চৌকিদার। এ ঘটনার পর থেকে বাঘাল পঞ্চায়েতের নেতৃত্বদানকারী আব্দুল আলী বাঘাল চৌকিদারসহ তার লোকেরা গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।

নিহতের চাচাতো বোন আসফিয়া আক্তার বিলাপ করে বলেন, ‘ওরা আমার ভাইদের মেরে পালিয়ে গেছে। তাদের ধরে নিয়ে আসুন। বিচার করুন। আমরা র‌্যাবের কাছে তাদের ব্যাপারে বলেছি।’ এ সময় নিহতদের বাড়ির আশপাশে সিআইডি, ডিবি, র‌্যাব সদস্যরা অবস্থান করছিল।

হত্যাকারীদের ধরিয়ে দিলে লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে পুলিশের সিলেট বিভাগের ডিআইজি মিজানুর রহমান বলেন, প্রকৃত ঘটনা বের করতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। অবশ্যই হত্যাকারীদের বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।

বাহুবল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ  (ওসি) মোশারফ হোসেন জানান, মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নিহত মনিরের বাবা আবদাল মিয়া জানান, মাসখানেক আগে বড়ই গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী আব্দুল হাই বাঘালের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এর জের ধরে শুক্রবার তার ছেলেসহ ওই চার শিশুকে বাচ্চু মিয়া নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তুলে নিয়ে যান আব্দুল আলী বাঘাল। টের পেয়ে তিনি ওই দিনই বিষয়টি পুলিশকে জানান। কিন্তু পুলিশ তাদের উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অবশেষে বাড়ির প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বালুগর্তে চার শিশুর মৃতদেহ পাওয়া গেল। নিহতদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

যারাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের গ্রেফতার করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে জোর দাবি জানান ভাদেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মদ্দছির মিয়া।

গ্রামবাসী জানায়, ইছাবিলে বুধবার সকালে এক শ্রমিক বালুর গর্তের মধ্যে পড়ে থাকা অবস্থায় লাশগুলো প্রথমে দেখতে পান। এ খবরে মুহূর্তের মধ্যে শত শত গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে ছুটে যান। পরে বাহুবল থানা পুলিশ খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে এসে গর্ত থেকে লাশগুলো উত্তোলন করে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন সিলেটের পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান, হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র, সিআইডি, ডিবি ও র‌্যাব সদস্যরা।

এদিকে চার শিশু হত্যাকারীদের সম্পর্কে তথ্যদানকারীকে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মো. মিজানুর রহমান। চার শিশুর লাশ উদ্ধারের পরপরই ডিআইজি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এ ঘোষণা দেন।

সুন্দ্রাটিকি স্কুলে শোকের ছায়া : নিখোঁজ চার শিশুর মধ্যে তিনজনই স্থানীয় সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। এর মধ্যে মনির মিয়া প্রথম শ্রেণিতে, জাকারিয়া আহমেদ শুভ দ্বিতীয় এবং তাজেল মিয়া চতুর্থ শ্রেণিতে লেখাপড়া করত। শুভ ছিল ক্লাসের সেকেন্ড বয়। তিন ছাত্রের মৃত্যুতে স্কুলে নেমে আসে শোকের ছায়া।

স্কুলের সহকারী শিক্ষিকা নুরে জান্নাত শেফা জানান, শুভ ও তাজেল ভালো ছাত্র ছিল। তারা দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হলেও লেখাপড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ ছিল বেশি।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক সাজিদুল ইসলাম জানান, চার শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই স্কুলে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অনেক কমে যায়। আজ (গতকাল) লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের স্কুল থেকে নিয়ে যান। স্কুলের তিন ছাত্রের হত্যার ঘটনায় শোকসভা আয়োজন করা হবে বলেও তিনি জানান।

তাজেল মিয়ার সহপাঠী রুবেল মিয়া বলে, তারা একসঙ্গে খেলাধুলা করত। এখন তাজেল আর স্কুলে আসবে না শুনে সে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। স্কুলের আরেক শিক্ষার্থী মজুন মিয়া তার সহপাঠীর মৃত্যুর বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।

ছেলেসহ বাগাল গ্রেপ্তার : চার শিশুকে হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়ার ঘটনায় যাদের নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই বাগাল পঞ্চায়েতের সর্দার আব্দুল আলী বাগাল (৫৫) ও তার ছেলে জুয়েল মিয়াকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে বাহুবল থানার পুলিশ। গতকাল রাত ৯টার দিকে বাহুবল উপজেলার রশিদপুর চা বাগান এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

বাহুবল মডেল থানার ওসি মোশারফ হোসেন জানান, পুলিশ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। আব্দুল আলী ও জুয়েল মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনের সম্ভাবনা রয়েছে।

 

 

উপরে