আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১৪:৪০

আসলে নকলে মিলিয়ে হিজড়ারা হয়ে উঠছেন ভয়ংকর বেপরোয়া

বিডিটাইমস ডেস্ক
আসলে নকলে মিলিয়ে হিজড়ারা হয়ে উঠছেন ভয়ংকর বেপরোয়া

এক বছর হলো বিয়ে হয়েছে মৌসুমির। থাকেন ঢাকার উত্তরায়। এরই মধ্যে হয়েছেন সন্তানসম্ভবা। হঠাৎ একদিন কোথা থেকে যেন তার বাসায় হাজির একদল হিজরা। তারা জানতে এসেছে কবে সন্তান ভূমিষ্ট হবে মৌসুমির, সেই সাথে দিয়ে গেছে আগাম হুমকি- ‘আমরা আসবো, টাকা রেডি রাখিস।দশ হাজারের কম হবে না কিন্তু।’ কারো ঘরে সন্তান আসলেই দিতে হবে চাঁদা। এই চিত্র এখন ঢাকা শহরের সর্বত্র।কারো সন্তান ভুমিষ্ট হলে আর রেহাই নেই। হিজরাদের জন্য একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা রাখতেই হবে। নয়তো আপনার জীবন তছনছ করে দিবে বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের তকমা পাওয়া হিজরা সম্প্রদায়।ঢাকা শহরের বড় বড় শপিংমল থেকে শুরু করে গলির চায়ের দোকানিও রেহাই পায় না তাদের হাত থেকে। ঢাকাসহ সারাদেশ জুড়েই চলছে তাদের দৌরাত্ম।

অথচ আমাদের সমাজে এই কিছুদিন আগেও হিজরাদের প্রতি মানুষের এক ধরনের সহানুভূতিও ছিল। যে যেভাবে পারতেন সাহায্য করতেন। তাদের সংখ্যাটাও ছিল খুব নগণ্য। কিন্তু দিনকে দিন ঢাকা শহর যেন হিজরাদের শহরে পরিণত হচ্ছে। এমন জায়গা নেই যেখানে হিজরা পাওয়া যাবে না।

বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি থেকে হিজড়াদের টাকা তোলা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে হিজড়াদের টাকা তোলার এই রীতি চলে আসছে। মানুষও সাধ্যমতো তাদের টাকা ও বিভিন্ন মালামাল দিয়ে সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে হিজড়াদের আচরণ বদলে গেছে। পাল্টে গেছে তাদের টাকা চাওয়ার ধরনও। আগের দিনের সেই টাকা তোলা এখন চাঁদা আদায়ে পরিণত হয়েছে। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, দোকানপাট যেখানে-সেখানে মানুষকে টাকার জন্য নাজেহাল করছে। চাঁদার জন্য মানুষকে জিম্মি করে ফেলা হচ্ছে। হিজড়াদের কাজে কেউ বাধা দিলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। প্রকাশ্যেই কাপড়-চোপড় খুলে ফেলছে। বিশেষ ভঙ্গিতে হাততালি দিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। নগ্ন হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করে। সঙ্গে অশ্লীল সব খিস্তি।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এবং অন্যান্য উৎস থেকে জানা যায় এদের অনেকেই নাকি আসল হিজরা নয়। কেউ হয় ছেলে ছিল কিংবা মেয়ে। কিন্তু হিজরাদের বর্তমান ব্যবসা দেখে অনেকেই এখন নিজেকে তৃতীয় লিঙ্গে পরিণত করছেন। হয়তো তৃতীয় লিঙ্গ না হয়েও মিথ্যা বলে কাটাচ্ছেন বিন্দাস জীবন। তাদের তো এখন টাকার অভাব নেই। আর আসল না নকল আপনি বুঝবেনই বা কিভাবে? কেউ তো আর দেখতে যায় না!অনেকেই নাকি হিজরাদের নিয়ে তৈরি করছেন নানা চক্র। তাদেরকে ব্যবহার করছেন চাঁদাবাজির হাতিয়ার হিসেবে।

বিভিন্ন বেসরকারী বানিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্যও হিজরাদের ব্যাবহার করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণদাতাদের অনেকেরই বাসার সামনে হিজরাদের ল্যাংটা নাচ আর অশ্রাব্য গালি সুরসুর করে ঋণগৃহীতাদের বাধ্য করছে টাকা শোধ দিতে।

শুধু ঢাকা শহর নয় দেশজুড়ে তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট সারা দেশের মানুষ।

কেসস্টাডি-১

১১ জানুয়ারি চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কামাল হোসেনকে পিটিয়ে আহত করেছে হিজড়ারা। ওই শিক্ষককে আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) ভর্তি করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক জানান, বিভাগের শিক্ষক কামাল হোসেনের দুই বছরের সন্তান আছে দেখে তার বাসায় গিয়ে কয়েকজন হিজড়া ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। কথা বলার এক পর্যায়ে ওই শিক্ষক তাদেরকে কিছু টাকা দিতে চান। কিন্তু হিজড়া সদস্যরা পুরো ১০ হাজার টাকাই চান। ওই শিক্ষক দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করায় তাকে রাস্তার ওপর ফেলে কিল, ঘুষি মারে হিজড়ারা। এসময় ওই শিক্ষকের বাম হাত ভেঙ্গে দেয় তারা।

কামাল হোসেনের স্ত্রী নীলা খাতুন জানান, ‘হিজরারা টাকা চাইলে আমি তাদের ১শ টাকা দিই। তারপরও তারা আমার বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। পরে আমার স্বামী বাধা দিলে তারা তাকে গুরুতর আহত করেছে।’

 

কেসস্টাডি-২

১১ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার শ্রীমঙ্গলে হিজড়ার কামড়ে আহত হয়েছে এক রিকশাচালক।

রিকশা চালক শিপন মিয়া (৩৮) রিকশায় যাত্রী নিয়ে হবিগঞ্জ রোডে মানিকচাঁদ মিষ্টান্ন ভান্ডারের কাছে আসার পর যাত্রী মিষ্টি কেনার জন্য দোকানের ভেতর গেলে বাইরে অপেক্ষা করতে থাকে শিপন মিয়া। এ সময় কয়েকজন হিজড়া রিকশায় উঠে বসে তাকে স্টেশন যাওয়ার জন্য বলে। রিকশাচালকের যাত্রী থাকায় সে যেতে পারবেনা বলে জানালে এক হিজড়া রিকশা চালকের পকেটে হাত দিয়ে টাকা নিয়ে যায়। বাঁধা দেওয়ার চেষ্টা করলে রিকশা চালকের চোখের উপর কামড় দিয়ে বসে এক হিজরা।

রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় রিকশা চালককে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে তার চোখের উপর ৪ টি সেলাই দেয়া হয়েছে।

কেসস্টাডি-৩

১০ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাজধানীর উত্তরায় দু’দল হিজড়ার মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। এ সময় এক হিজড়া গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ হিজড়ার নাম সেজুদ্দিন (২৮)।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তরার সাত নম্বর সেক্টরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও গুলি বিনিময়ের এ ঘটনা ঘটে।

সেজুদ্দিনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।  পরে পুলিশি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রতিদিনই সারা দেশে ঘটছে এমন ঘটনা। তৃতীয় লিঙ্গ বা থার্ড জেন্ডার হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হিজড়া সম্প্রদায় বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে এক মূর্তিমান আতংক ও ভয়ঙ্কর চরিত্র হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাজধানী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হিজড়া বাহিনী। চাঁদা আদায়ে নগরীর অলিগলি চষে বেড়াচ্ছে তারা। হিজড়াদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা। চাঁদা নেয়ার তালিকা থেকে বাদ পড়ছে না ফেরিওয়ালারাও। এমনকি বাসাবাড়িতেও হানা দিচ্ছে তারা। এ ক্ষেত্রে পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কোনো সদস্যকেই পাত্তা দিচ্ছে না। কেউ বাধা দিলে তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে। যে কারণে সামর্থ্য না থাকলেও অনেকে তাদের চাহিদামাফিক টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নামে বিভক্ত হয়ে অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে সর্বত্র চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছে তারা। এ ছাড়া শিশু নাচানোর নাম করে পরিবারের কাছ থেকে জোর করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। ইদানীং তাদের মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন রাজধানীবাসী। হিজড়াদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, যে কারণে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পক্ষান্তরে, বিপদে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

দে- টাকা  দে- দিবিনা-। এভাবেই সংঘবদ্ধ হিজড়া দল দোকানপাটে, কাঁচা বাজারে, রিক্সা, ভ্যান, এমনকি যানবাহনে দলবেধে হুংকার দিয়ে চাঁদাবাজি করেছে। চাহিদামত টাকা না দিয়ে তাদের হাতে অনেকেই নাজেহাল হয়েছেন। হিজড়াদের আচার আচরণ যেন সাধারন মানুষের ইজ্জত কেড়ে নেওয়ার মত। বাচাঁর উপায় নেই। ক্ষুব্ধ হয়েছেন অনেকেই। কিন্তু অসহায় অবস্থায় দিতে হচ্ছে হিজড়াদের চাহিদার চাঁদা। কিন্তু সবাই নির্বিকার।

হিজড়াদের প্রকাশ্য চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ রাজধানীর সব শ্রেণি পেশার মানুষ। কোনো ভিত্তি না থাকলেও এদের ভয় পায় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। অফিস-আদালত, বিপনি বিতান, বাসা-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, পরিবহন সর্বত্র এদের উপস্থিতি জনমনে রীতিমত আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। একবার কাউকে ধরে বসলে চাঁদা না দিয়ে তার রক্ষা নেই। না দিলে পরনের কাপড় খুলে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলা হয় পরিবেশকে। এভাবে অবিরাম চলছে হিজড়াদের প্রকাশ্য নগ্ন ব্ল্যাকমেইলিং। পুলিশ সদস্যরাও পর্যন্ত হিজড়াদের ভয় পায়। আক্রান্তের ভয়ে অনেক ক্ষেত্রে হিজড়াদের প্রকাশ্য ব্ল্যাকমেইলিং দেখেও নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। হিজড়াদের আইন আদালত বুঝিয়ে লাভ নেই। এরা বেপরোয়া জীবন যাপনে অভ্যস্ত। পাঁচ দশ টাকার জন্য ছোট বাচ্চা কিংবা মেয়ে লোকের সামনে কাপড় খুলতে দ্বিধা করে না হিজড়ারা।

একেবারে ফ্রি স্টাইলে হিজড়ারা ফুটপাত থেকে আরম্ভ করে ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী সকল সাধারণ মানুষের ঘাড়ের উপর ঝেকে বসেছে। তাদের তৎপরতা এতটাই অস্বাভাবিক আকার ধারণ করেছে যে তারা মানুষের কোন সমস্যা ও অসুবিধার ধার ধারে না। পরে আসতে বললেও শুনে না। শুধু নিজেরটা বুঝে ১৬ আনা। তাই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সাধারণ মানুষের শুধু একটাই কথা সরকার থেকে জরুরী এদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। একমাত্র সরকারই পারে বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে এদের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবন-ধারায় নিয়ে আসতে। সাধারণ মানুষের করুণ আকুতি হিজড়াদের কবল থেকে আমাদের রক্ষা করুন, বাঁচান। আমরা আর বিব্রতকর পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে চাই না।

হিজড়াদের ঠাই দেয় না পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। তাদের বাসায় কাজে রাখে না কেউ। কেউ দেয় না চাকুরী। পেটের দায়েই তারা এই ধরণের কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে মন্তব্য করলেন উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক মো. নান্নু মিয়া। তার মতে হিজড়াদের আয় উপর্জনে ভাগ বসাতেই অনেক অপরাধী নিজেদের মেয়ে সাজিয়ে হিজড়াদের দলে যোগ দিয়েছে। আর ভাবমূর্তি নষ্ট করছে আসল হিজড়াদের। সরকারি ভাবে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করলে এ অবস্থার উত্তরণ হবে বলে জানান তিনি।

উপরে