আপডেট : ২৫ জানুয়ারী, ২০১৬ ১৭:৫৭

সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ’কেও হার মানালো ‘মাহফুজ’

বিডিটাইমস ডেস্ক
সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ’কেও হার মানালো ‘মাহফুজ’

অন্ধ বিশ্বাস থেকে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই ভয়ঙ্কর খুনিতে পরিণত হয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিরাণ্ডা বারবারা। শয়তানের কালো জাদুকে বিশ্বাস করে একে একে সে খুন করে ২৩ জন মানুষকে। 'সিরিয়াল কিলার' রসু খাঁ’র কথাও আমরা প্রায় সবাই জানি। ভালোবাসার প্রলোভন দেখিয়ে যে একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণ ও পরে হত্যা করে সারাদেশে কু্খ্যতি অর্জন করেছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে এমনি অনেক ভয়ঙ্কর ও সিরিয়াল কিলারের কথা আমরা শুনেছি। তবে নিষ্ঠুরতার সবমাত্রা হয়ত অতিক্রম করে গেছেন নারায়নগঞ্জের পাঁচ খুনের হোতা মাহফুজ। 

বয়স মাত্র ২০ বছর। একাই চাঁর ঘণ্টায় খুন করেছে পাঁচজন নিকটাত্মীয়কে! তাও আবার তাদের কাউকে অচেতন না করেই। পাঁচজনের তিনজনই ছিল প্রাপ্তবয়স্ক, দু'জন শিশু। হত্যার জন্য অস্ত্র হিসেবে সে বেছে নিয়েছে শীল-পাটার পুতাকে!  

নারায়ণগঞ্জের মানুষ যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না অবিশ্বাস্য এই খুনের গল্প। মাত্র ২০ বছর বয়সী এক যুবক কীভাবে একাই একে একে নিজেরই পাঁচ আত্মীয়কে খুন করে!

আবার মাহফুজ মাদকাসক্তও ছিল না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে একে একে পাঁচজনকে খুন করা পেশাদার খুনি ছাড়া কিভাবে সম্ভব?  ঘটনাটি যেন কল্পনাকেও হার মানায়।

নারায়ণগঞ্জবাসীর একটাই প্রশ্ন, আসলেই কি পাঁচজনকে একাই  খুন করেছে মাহফুজ? এ ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান শরীফের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে ঘাতক মাহফুজ।

পুলিশের ভাষ্য, অপেশাদার হলেও মাহফুজের মনোবল ছিল অনেক। তা না হলে প্রথম খুনের পরেই সে দরজা খুলে পালিয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা না করে দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ খুনটিও করে মাহফুজ। এর পর বাসায় ফিরে এলে মামাতো ভাই ছোট্ট শান্তকেও খুনের পর পালিয়ে যায় সে।

পালিয়ে যাওয়ার আগে রক্তমাখা পুতা এবং নিজের শার্ট ও প্যান্টে লাগা রক্ত ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে। এর পর প্যান্ট পাল্টে লুঙ্গি পরে বাসা তালাবদ্ধ করে পাশেই যে হোসিয়ারিতে সে কাজ করত, সেই হোসিয়ারিতে গিয়ে গোসল করে ঘুমিয়ে পড়ে মাহফুজ।

ওই হোসিয়ারিটির মালিক পাঁচ খুনের ঘটনার মামলার বাদী ও ঘাতক মাহফুজের বড় মামা শফিকুল ইসলামের শ্যালক নিহত মোশাররফ ওরফে মোর্শেদুলের।

চাঞ্চল্যকর এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আবুল খায়ের বলেন, মাহফুজ একাই এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা পুলিশ এবং আদালতের কাছে সে স্বীকার করেছে। কীভাবে ঘটিয়েছে, তা সে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পুলিশকে দেখিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পুতা মাহফুজের দেখানো মতো পুলিশ জব্দ করেছে। যে পোশাক পরে সে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটিয়েছে তাও জব্দ করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, যেহেতু লামিয়াসহ পরিবারটির পাঁচজনই খুন হয়েছে, তাই মাহফুজের দাবিকেই সঠিক বলে মেনে নিতে হবে। কারণ লামিয়ার সঙ্গে একটি বিশেষ সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেছে মাহফুজ। ওই পরিবারের যে দুই সদস্য বেঁচে আছে তাদের বক্তব্যের সঙ্গে মাহফুজের বক্তব্যে গরমিল রয়েছে।

মাহফুজের দাবি, ছোট মামি লামিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। আর বাদী শফিক এবং তার ছোট ভাই শরিফের দাবি, মাহফুজ জোর করে ওই সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছিল। যে কারণে তাকে জুতাপেটা করা হয়েছিল ঘটনার ১৫ দিন আগে।

ঘটনার রাতে ১৫ জানুয়ারি (শুক্রবার) কী উদ্দেশ্যে মাহফুজ ওই বাড়িতে প্রবেশ করে খাটের নিচে অবস্থান নেয়, এ প্রশ্নের জবাবে তদন্তকারী কর্মকর্তা আবুল খায়ের বলেন, তার এই খুনের সিদ্ধান্ত ছিল তাৎক্ষণিক।

আবুল খায়ের বলেন, যেহেতু লামিয়া তার কক্ষে ঘুমাতে আসেনি, ওই কক্ষে মোশাররফ ঘুমাতে আসে। আর মাহফুজ যে খাটের নিচে লুকিয়ে রয়েছে, তা গভীর রাতে টের পেয়ে যায় মোশাররফ। মোশাররফ ঘটনাটি তার বড় বোন মাহফুজের বড় মামি তাছলিমাকে জানায়, সে জন্য ক্ষুব্ধ ছিল মাহফুজ।

একদিকে নিজের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া এবং অন্যদিকে খাটের নিচে লুকিয়ে থেকেও ধরা পড়ে যাওয়ায় তার সে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে পেশাদার না হয়েও একের পর এক খুনগুলো করে বসে মাহফুজ।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ঘটনার পর প্রাথমিকভাবে পুলিশেরও ধারণা ছিল, এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত। কিন্তু মাহফুজের বক্তব্যে সে রকম কিছু উঠে আসেনি। মাহফুজের বক্তব্যে খোদ পুলিশই হতবাক।

গত ১৬ জানুয়ারি রাতে নগরীর ১৩২/১১ নম্বর হোল্ডিংয়ের ছয়তলা বাড়ির নিচতলার ফ্ল্যাট থেকে পুলিশ একই পরিবারের ওই পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। নিহতরা হলেন তাছলিমা বেগম, তার ছেলে শান্ত, মেয়ে সুমাইয়া, ছোট ভাই মোশাররফ ওরফে মোর্শেদুল এবং ছোট জা লামিয়া বেগম।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

 

উপরে