আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০১৬ ১১:৫২

সাকিব-মুশফিকদের গুরু যাঁরা

স্পোর্টস ডেস্ক
সাকিব-মুশফিকদের গুরু যাঁরা

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) ক্রিকেটারদের সূতিকাগার। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই বেরিয়েছেন বর্তমান জাতীয় ক্রিকেট দলের সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম থেকে শুরু করে সৌম্য সরকারদের মতো ক্রিকেটাররা। কেমন ছিল তাঁদের শিক্ষাজীবনের দিনগুলো? পুরোনো দিনের সেসব গল্প করলেন ক্রিকেটারদের সেই গুরুদের কয়েকজন। লিখেছেন মাহফুজ রহমান

সাকিবেরমুড়ি পার্টি

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) অ্যাসেম্বলি চলছে। সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কিশোর ক্রিকেটারের দল। কোচ হিসেবে মাসুদ হাসান ভীষণ কড়া। তাঁর সামনে কথা বলা মানেই বিপদ! তার মধ্যেই একজন মাথা নিচু করে এক সতীর্থকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘স্যার, কালকে ওর জন্মদিন। রাতে মুড়ি পার্টি হবে।’ স্বভাবতই খেপে গেলেন মাসুদ হাসান। মুড়ি পার্টি মানেই তো দোকানে যাওয়া। আর যে সময়ের কথা হচ্ছে, সে সময় বিকেএসপির ছাত্রদের দোকানে যাওয়া পুরোপুরি বারণ। তবে মাসুদ হাসানের মনে কৌতূহল—এই মুড়ি পার্টিটা আবার কী? প্রায় হুংকার দিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন কিশোরের দিকে, ‘কার মুড়ি পার্টি? কিসের মুড়ি পার্টি?’ কিশোর মাটির দিকে তাকিয়ে প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে উচ্চারণ করল, ‘আজকে রাতে আমাদের রুমে আসেন, স্যার। বুঝতে পারবেন।’

নিয়মের লঙ্ঘন হয়, তারপরও ওই মুড়ি পার্টি-বিষয়ক কৌতূহলের অবসান করতেই শিষ্যদের হোস্টেল কক্ষে হানা দিলেন মাসুদ হাসান। গিয়ে দেখেন, লাল রঙের একটা বালতি ঘষে-মেজে পরিষ্কার করা হয়েছে। সেখানে মাখানো হয়েছে মুড়ি। মুখে প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্য বজায় রেখে মুড়ি মুখে দিলেন মাসুদ হাসান। ১৫ মার্চ কথা হচ্ছিল বিকেএসপির এই প্রধান কোচের (ক্রিকেট) সঙ্গে। প্রায় ১৩ বছর আগে সেই রাতে শিষ্যদের হাতে মাখানো মুড়ির স্বাদের কথা বলতে গিয়ে একটা কথাই বেরোলো তাঁর মুখ থেকে, ‘অমৃত!’ খানিক বিরতি দিয়ে বললেন, ‘এত চমৎকার মুড়িমাখা আমি আর খাইনি! আর ওই মুড়ি পার্টির নেতা ছিল সাকিব আল হাসান।’

গণিতের খাতায় নাসিরেরডাক
একরামুল হক লোকটার চেহারা খুব সাধারণ। পাট করে আঁচড়ানো চুল, ইন করে শার্ট পরেছেন। মুখে একটা হাসি লেগেই আছে। দেখে কে বলবে যে এই মানুষটাই সাকিব-মুশফিক-সৌম্যদের কাছে ছিলেন ত্রাস! বিকেএসপির গণিতের এই শিক্ষক সম্ভবত সবচেয়ে বড় ত্রাস ছিলেন ক্রিকেটার নাসির হোসেনের কাছে! তাঁর ভাষায়, ‘আমার শিক্ষকজীবনে দেখা সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছাত্রদের মধ্যে নাসির অন্যতম। পরীক্ষার খাতায় ও যে কতবার ডাক মেরেছে, তার হিসাব নেই।’ ক্রিকেটে ডাক মারলে বিপদ, ক্লাসে কী হতো? একরামুল হক মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘কী আর হবে, খেপে যেতাম! তবে ও ছিল ভীষণ পিছলা প্রকৃতির। শাস্তি দিতে গেলেই জড়িয়ে ধরে “স্যার, স্যার, মাফ করে দেন, স্যার!” বলে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলত, মারার কথা ভুলে হেসে ফেলতাম!’
কেবল ক্লাসেই নয়, মাঠেও নাসিরকে নিয়ে কত অভিযোগ! ক্রিকেট কোচ মতিউর রহমানের অভিজ্ঞতাও একরামুল হকের মতো, ‘ও ক্লাস করে না, এটা করে সেটা করে—এসব অভিযোগ প্রায়ই কানে আসত। ফলে ওকে শাসন করতেই হতো। কিন্তু ও এমন একটা কিছু বলে বসত, যেটা শুনলে না হেসে উপায় থাকত না।’

মুশফিক যখন আঁকিয়ে

তবে মুশফিকুর রহিম আবার মুদ্রার উল্টা পিঠ। মতিউর রহমানের মতে, ‘ওর মতো মনোযোগী ছাত্র খুব কম পেয়েছি। একেবারে আদর্শ ছাত্র যাকে বলে। ক্রিকেট মাঠে যা শেখাতাম, তা-ই শিখে ফেলত। ক্লাসেও একই রকম মনোযোগী ছিল ও।’

বিকেএসপিতে বাংলা পড়ান মো. শামীমুজ্জামান। মুশফিকের গুণকীর্তন করলেন মন খুলে, ‘ওর হাতের লেখা মুক্তার মতো। ও তো ছাত্র হিসেবেও দুর্দান্ত। এইচএসসিতে ও এ‍+ পেয়েছিল। কেবল পড়াশোনা, খেলাধুলাতেই ও অলরাউন্ডার ছিল না; সবকিছুতেই ওর অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দেয়ালিকা বের হবে, মুশফিক আছে। রচনা প্রতিযোগিতা, উপস্থিত বক্তৃতা, বিতর্ক—কোথায় নেই ও! হাতের লেখা ভালো, তাই দেয়ালিকার লেখাগুলো ও-ই লিখত। আঁকাআঁকি করতে হবে? মুশফিক আছে। ওর আঁকার হাতও দারুণ। ওর বন্ধুদের কাছে শুনেছি, সময় কম থাকলে ও নাকি দুই হাতে রং করত!’ 

তাঁকে নিয়ে রঙ্গ-তামাশাও করতেন গুরুরা। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কটা এভাবেই আরও দৃঢ় হয়েছে বলেই বিশ্বাস ক্রিকেট কোচ মাসুদ হাসানের। সেই ২০০০ সালে ফিরে গিয়ে বললেন, ‘ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছে ছেলেটা। চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। গড়নে ছোটখাটো। এ কারণে ওকে আমি ডাকতাম “গিট” বলে! এটাতে ও মোটেও মন খারাপ করত না, উল্টা আমার সঙ্গে এটা-সেটা নিয়ে মজা করত। বিকেএসপিতে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক খুব মজবুত। পাশাপাশি কঠোর নিয়মতান্ত্রিকতার কারণে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় থাকে। তবে মুশফিকের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল খুব সহজ-সুন্দর।’

শান্ত সৌম্য
সৌম্য সরকারের বেলায়ও একই কথা খাটে। ‘ক্লাসে সৌম্য একেবারে চুপচাপ থাকত। বসত তিন-চার নম্বর বেঞ্চে।’ বলছিলেন বাংলার শিক্ষক মো. শামীমুজ্জামান, ‘সৌম্য বলতে যা বোঝায়, ও তা-ই। কোনো রকম দুষ্টুমির অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে কখনো কেউ করেনি। ভীষণ বিনয়ী। একই কথা খাটে সাকিব আল হাসানের বেলায়ও। একবার উইজডেনে আগামীর তারকার তালিকায় ওর নাম উঠল। ওকে আমি সেটার “কাটিং” দিলাম। ও সেটা হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকল। কিচ্ছু না বলে দিল এক দৌড় রুমের দিকে। ক্লাসেও দেখেছি, বাইরে থেকে হয়তো খুব ভালো খেলে এসেছে, ক্লাসে সেটা নিয়ে ওর কোনো মাথাব্যথাই নেই। বন্ধুরা ওকে নিয়ে উচ্ছ্বাস করুক, সেটা ও চাইত না। আমার মনে হতো, ও ওসব অর্জনে মোটেও তুষ্ট হতো না। আরও বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ওর ছোটবেলা থেকেই। মোটকথা সাকিব দারুণ বিনয়ী।’

ফাহিম স্যারের পরিবার
সাকিব-মুশফিক-সৌম্য-নাসির—সবার গুরু নাজমুল আবেদীন। সবার কাছে ফাহিম স্যার নামেই যাঁর খ্যাতি। বিকেএসপির শুরু থেকেই ক্রিকেটের প্রধান কোচ হিসেবে যাঁর কাঁধে দায়িত্ব বর্তেছিল; এখন তিনি পালন করছেন বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজারের গুরুদায়িত্ব। এত এত তারকার গুরু হিসেবে ভীষণ গর্বিত এই কোচ বললেন, ‘ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক একটু অন্য রকম। যখন বিকেএসপিতে কোচ ছিলাম, তখন কিছুটা দূরত্ব থাকত। আমরা কেবল ওদের খেলাধুলার দিকটাই দেখতাম না। ওদের পড়াশোনা, খাবারদাবার, নিয়ম-শৃঙ্খলা—সবকিছুরই দেখভাল করতে হতো। ফলে সবাই খানিকটা ভয়ই পেত। তবে ওদেরকে নিয়ে যখন দেশে ও দেশের বাইরে ট্যুরে যেতাম, তখন অনেকটা কাছাকাছি আসার সুযোগ হতো। আমি একটা নিয়ম করে দিয়েছিলাম। দেশের বাইরে গেলে দিন শেষে প্রতিদিন একেকজনের রুমে পার্টি হতো। আহামরি পার্টি নয়, কোক-পেপসি, আপেল, বিস্কুট, চানাচুর—এসবের আয়োজন করত রুমের বাসিন্দারা। দারুণ আড্ডা হতো। খেলা, খেলার বাইরের বিষয়-আশয় নিয়ে কথা হতো। তাতে করে সম্পর্কটা আরও সহজ হতো। এখনো ওদের সঙ্গে আমার একই রকম সম্পর্ক। ঠিক পরিবারের মতো। এটা খুব গর্বের বিষয় যে এতগুলো তারকা বের হয়েছে আমাদের বিকেএসপি থেকে। কেবল ক্রিকেটারই তো নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেট অগ্রযাত্রায় বিকেএসপির ভূমিকা অনেক গভীর। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য কিছু করতে পেরেছি ভেবে ভালো লাগে।’  

(সূত্র: প্রথম আলো)

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আইএম

 

উপরে